ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে এক নতুন বাস্তবতা—অভিবাসী বংশোদ্ভূত তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। লন্ডন, নিউইয়র্ক কিংবা টরন্টোর মতো শহরে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক উপস্থিতি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্যারিস ও তার পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতেও বাংলাদেশি তরুণদের দৃঢ় পদচারণা নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের পৌর নির্বাচনে চারজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। বহু বছরের সংগ্রাম, প্রান্তিকতা, বৈধতার লড়াই এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির চেষ্টার ফলস্বরূপ আজকের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। ফাহিম মোহাম্মদ, নাহিদুল মোহাম্মদ, কৌশিক রাব্বানী এবং জুবায়েদ আহমেদের বিজয় প্রমাণ করে—অভিবাসী পরিচয় আর সীমাবদ্ধতার প্রতীক নয়, বরং সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।
ফাহিম মোহাম্মদের গল্প বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। মাত্র আট বছর বয়সে বাবার সঙ্গে ফ্রান্সে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে একসময় তাকে অনিয়মিত অবস্থায় দিন কাটাতে হয়। অনেকের জন্য এটি হতে পারত স্থবিরতার গল্প, কিন্তু ফাহিম সেটিকে পরিণত করেছেন সংগ্রামের শক্তিতে। দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি সমাজে পরিচিতি পান এবং সেই সূত্রে বৈধতা অর্জনের পথ উন্মুক্ত হয়। পরবর্তীতে তিনি ফরাসি নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং বর্তমানে একজন ফাইনান্সিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত। তার নির্বাচনী বিজয় শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি এক সামাজিক পুনর্জন্মের গল্প।
অন্যদিকে নাহিদুল মোহাম্মদ নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত অভিবাসীদের প্রতীক। প্যারিসের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই তরুণ সরাসরি ফরাসি মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। অতি বামপন্থি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি দেখিয়েছেন—রাজনীতি আর কেবল পুরনো প্রজন্মের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, এই বিজয় কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন।
কৌশিক রাব্বানী খান ইতোমধ্যেই একটি পরিচিত নাম। তৃতীয়বারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তার প্রমাণ। তিনি দেখিয়েছেন ধারাবাহিকতা এবং স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তার নেতৃত্বে দল বিপুল ভোটে জয়লাভ করে যে বার্তা দিয়েছে, তা হলো—বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিকরা এখন আর প্রান্তিক নয়, বরং মূলধারার অংশ।
জুবায়েদ আহমেদের বিজয় আরেকটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। পেশায় একজন ক্রিকেটার হওয়া সত্ত্বেও তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার বিজয় প্রমাণ করে—রাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পেশাগত ছাঁচ নেই; প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্বগুণ এবং মানুষের আস্থা।
এই চারজনের সাফল্যকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটি গত কয়েক দশকে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান তৈরি করেছে, তার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের এই রাজনৈতিক উত্থান সম্ভব হয়েছে। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা যেখানে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করেছেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম সেখানে শিক্ষা, দক্ষতা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, এই তরুণরা কেবল নিজেদের পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং ফরাসি সমাজের বৃহত্তর ইস্যুগুলোর সঙ্গেও সংযুক্ত। তারা স্থানীয় উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, অভিবাসী অধিকার এবং সমতা প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসছেন। ফলে তাদের রাজনীতি কোনো গেটো-ভিত্তিক রাজনীতি নয়; বরং এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক চর্চা।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক কাঠামো অভিবাসীদের জন্য সহজ ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি, আইনি জটিলতা এবং সামাজিক বৈষম্য—সবকিছুই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই তরুণ প্রজন্ম সেই বাধাগুলোকে অতিক্রম করেছে। তারা ফরাসি সমাজের অংশ হয়েও নিজেদের শিকড়কে অস্বীকার করেনি। বরং এই দ্বৈত পরিচয়কেই তারা শক্তিতে রূপান্তর করেছে।
এই অর্জনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতীকী প্রভাব। প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি তরুণদের জন্য এটি একটি শক্তিশালী বার্তা—তারা চাইলে যেকোনো ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিতে পারে। এটি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, স্বপ্ন দেখার সাহস দেয় এবং সামাজিক অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে।
তবে এই সাফল্যের মধ্যেও কিছু প্রশ্ন রয়ে যায়। এই প্রতিনিধিত্ব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে? তারা কি বৃহত্তর নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারবে? নাকি স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎই দেবে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—এই শুরুটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশি প্রবাসী সমাজের জন্য এটি গর্বের মুহূর্ত। কিন্তু এর সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। এই প্রতিনিধিদের কাজ, সততা ও দক্ষতা আগামী প্রজন্মের জন্য পথ নির্ধারণ করবে। তারা যদি সফল হয়, তাহলে আরও অনেক বাংলাদেশি তরুণ রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত হবে।
সবশেষে বলা যায়, প্যারিস ও তার আশপাশে বাংলাদেশি তরুণদের এই রাজনৈতিক উত্থান কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়; এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা। এটি প্রমাণ করে—পরিচয়, সংগ্রাম এবং সম্ভাবনার সমন্বয়ে গড়ে উঠতে পারে নতুন ইতিহাস। আজকের এই চারজন কাউন্সিলর সেই ইতিহাসের পথিকৃৎ। তাদের হাত ধরেই হয়তো আগামী দিনে ফ্রান্সের রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতি আরও শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে উঠবে।
লেখক: নিয়াজ মাহমুদ, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট