জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে হামলা ও সমিতি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাশ ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত সাংবাদিক সমিতির কক্ষে ঢুকে হামলা চালান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের দিকে ছাত্রদলের শতাধিক নেতাকর্মী দলবলে গিয়ে সাংবাদিক সমিতির কক্ষে ঢুকে পড়েন। এ সময় সেখানে থাকা সদস্যদের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে তারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালান। এতে কালের কন্ঠ, যুগান্তর, বাংলাদেশের খবর, সময়ের আলোসহ জাতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জবিতে কর্মরত অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন।
এরমধ্যে রয়েছে সাংবাদিক সমিতির সহ-সভাপতি ও আমাদের বার্তার প্রতিনিধি আসাদ, কালের কন্ঠের জুনায়েদ শেখ, সমায়ের আলোর ইমন প্রমুখ। আহতদের ন্যাশনাল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আহতের মধ্যে ৩ জন অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, এ হামলার নেতৃত্ব দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল, সদস্য সচিব সামসিল আরেফিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন সরদার ও জাফর আহমেদ।
জানা যায়, জবি সাংবাদিক সমিতির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় গত ২ মার্চ। তফশিল অনুযায়ী আজ মনোনয়ন সংগ্রহ ও প্রত্যাহার এবং আগামী ৮ মাচ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এই নির্বাচনের একক নেতৃত্ব নিতে বিভিন্ন মাধ্যমে সাংবাদিকদের চাপ প্রদান করে ছাত্রদল। পরবর্তীতে ছাত্রদলের প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতে আজ জোরপূর্বক সমিতি দখল করতে আসেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ইমরান হুসাইন বলেন, আজকে সাংবাদিক সমিতির নির্বাচনের মনোনয়ন ফর্ম নেওয়ার দিন ছিল। গতকালকে রাত থেকে জানতে পারি ছাত্রদল নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। আজ দুপুরে ছাত্রদল সুপার ফাইভ নিচে দাঁড়িয়ে থেকে এ হামলার নেতৃত্ব দেন।
হামলার বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, আমরা কেউ সমিতির অফিসে যাইনি। জুনিয়র কেউ কেউ যেতে পারে। তবে হামলার বিষয় জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, আমরা কেউ হামলার সাথে জড়িত না।
ঘটনার বিষয়ে জানতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. রেজাউল করিমকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
জকসু-শিবির ও ছাত্রদল একে অপরকে দোষারোপ
এ ঘটনার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও শাখা ছাত্রশিবির এবং ছাত্রদল একে অপরকে দোষারোপ করছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ও শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে লিখছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাশ ভবনের তৃতীয় তলায় হঠাৎ করে সাংবাদিক সমিতির কক্ষে মারামারি শুরু হয়। সাংবাদিক সমিতির কক্ষ এবং জকসু কার্যালয় ওপর-নিচ তলায় হওয়ায় এক জায়গার সমস্যা অন্য জায়গা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।
‘‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী সমস্যায় পড়লে তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জকসুর প্রধান দায়িত্ব। সাংবাদিক সমিতিতে বিশৃঙ্খলার খবর পেয়ে জকসুর জিএস শিক্ষার্থীদের উদ্ধার ও পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য উপরে যান। সেখানে জকসু জিএস উপস্থিত হয়ে সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন এবং জিএস-এর ওপর হামলা চালান। বর্তমানে জকসু জিএস এবং বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন।’’
তিনি আরও লেখেন, আমরা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাই—অতি দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন নামে পরিচালিত কিছু পেজ, যারা জকসু নির্বাচনের আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে সমর্থন দিতে ক্যাম্পাসে নানাবিধ গুজব ছড়াত, তারা নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই জকসুকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।
‘‘বর্তমানে তারা জকসুর বিপক্ষে তাদের নেতাকর্মীদের নিয়ে 'মব' তৈরির উসকানি দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবশ্যই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে এই ধরনের উসকানিমূলক পেজগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেই সাথে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ সকল নিবন্ধিত সংগঠন তাদের নিজস্ব নিয়মনীতি অনুযায়ী চলবে—এটাই স্বাভাবিক।’’
জকসু ভিপি লেখেন, ইতিপূর্বে বিভিন্ন সংগঠনকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যবহারের অপচেষ্টা করা হয়েছে। এখন জকসু নির্বাচন হয়েছে; আমরা চাই ক্যাম্পাসের সকল সংগঠন তাদের নিজস্ব বিধি মোতাবেক চলুক এবং এখানে কোনো প্রকার দলীয় প্রভাব মেনে নেওয়া হবে না। এই ক্যাম্পাসে দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে জকসুর সংগ্রাম ইনশাআল্লাহ চলমান থাকবে।’’
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন একই স্ট্যাটাস দিয়ে তারা লেখেন, জকসুর জিএস এর নেতৃত্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি দখলের চেষ্টা। হামলায় বেশ কিছু সাংবাদিক আহত। জবি সাংবাদিক সমিতি ভবনে শিবিরের নেতা-কর্মীদের কাজ কি?
‘‘৫টি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-শিবিরের নিজ দলীয় ভিসি, প্রক্টর, নির্বাচন কমিশন এর প্রকাশ্য অনৈতিক সহযোগিতায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বেশ কিছু সাংবাদিক সমিতি তথা বেশ কিছু ভুঁইফোঁড় সাংবাদিকদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। আজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি ভবনে জকসুর জিএস এবং শিবিরের নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে সাংবাদিক সমিতি দখলের চেষ্টা ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অভিযোগ প্রমাণিত হল। সব দালালদের মুখোশ উন্মোচিত হবে এবং জবাব দেওয়া হবে।’’