Image description

প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪-এর তথ্যেও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের চিত্র পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, ২০২০ সালে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার ছিল ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ।

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় প্রকৃত শিক্ষার্থী কত, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। প্রতিষ্ঠানের নথিতে যত নাম, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সে সংখ্যক শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। কোথাও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে একই শিক্ষার্থীকে ভর্তি দেখানো হচ্ছে একাধিক প্রতিষ্ঠানে। আবার কোথাও বিদ্যালয় একীভূতকরণ এড়াতে বাড়িয়ে লেখা হচ্ছে সংখ্যা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এমন চিত্র। আট বিভাগের ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তার মতে, প্রায়শই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর ঘটনা ঘটছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয়।

দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭, যা প্রাথমিক স্তরের মোট প্রতিষ্ঠানের ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদ্যালয়গুলোয় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২। অর্থাৎ এ স্তরের মোট শিক্ষার্থীর ৫২ দশমিক ৬ শতাংশই সরকারিতে পড়ে। তবে এ পরিসংখ্যানের যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ। দেশের আটটি বিভাগে গত সাত মাসে বিদ্যালয় পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর তৈরি করা হয় ‘ন্যাশনাল স্টেকহোল্ডার ব্রিফিং’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন। তাতেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোকে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আট বিভাগে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ২ হাজার ৩৫০টি আলোচনা সভা বা সেশনে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার পাঁচটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যালয়গুলোয় প্রায়ই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর ঘটনা ঘটে। তাদের ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ এটিকে গুরুতর এবং ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মাঝেমধ্যে ঘটে এমন সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা নতুন নয়। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ, বিদ্যালয় একীভূতকরণ বা সংযুক্তি এড়ানো এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ এর অন্যতম।

 

জেলা পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলে অনেক সময় হাজিরা খাতায় থাকা শিক্ষার্থীর সঙ্গে বাস্তব উপস্থিতি ও প্রকৃত সংখ্যার অসংগতি দেখা যায়। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এসব সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে হয়তো কেউ কেউ শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাতে পারেন। তবে সব ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। অনেক অভিভাবক সন্তানকে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে রাখার পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেন বা মাদরাসায়ও পড়ান। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্তি এড়াতেও এমনটি করে।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের মার্চে ঘোষণা দিয়েছিল, যেসব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-এর কম, সেগুলো পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত করা হবে। এ সিদ্ধান্তের পর প্রাথমিকভাবে ৩০০টি বিদ্যালয় চিহ্নিত করে সংযুক্তির নির্দেশনা দেয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সিদ্ধান্তের পর কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪-এর তথ্যেও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের চিত্র পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, ২০২০ সালে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার ছিল ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের ৩৫ হাজার ৮৯৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০ বা তার কম। এসব বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৭ জন।

lead-inside.jpg

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষকরা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ বা অর্থ আত্মসাতের জন্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখান, এমন ধারণা সঠিক নয়। যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-এর কম, সেগুলো পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্ত এড়াতে কোথাও কোথাও হয়তো শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। বিদ্যালয় সংযুক্ত হলে শিক্ষকদের চাকরি হারানো বা বেতন কমে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় জমিদাতা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা করেন। জন্মহার হ্রাস এবং করোনাকালে অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কারণে স্বাভাবিকভাবেও শিক্ষার্থী বাড়ছে না। এসব কারণে স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও জমিদাতাদের চাপের মুখে শিক্ষকরা অনেক সময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাতে বাধ্য হন।’

একীভূতকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের চাকরিতে কোনো সমস্যা তৈরি না করে ৫০ জনের কম শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়গুলোকে পার্শ্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্তের উদ্যোগকে আমরা নেতিবাচকভাবে দেখছি না। তবে এ ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক সচেতনতা ও মতবিনিময়ের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।’

শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় আরো চারটি বড় সমস্যার কথা উঠে এসেছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে। এগুলো হলো সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত তদারকির চাপ, একই তথ্য একাধিকবার সরবরাহের বাধ্যবাধকতা, বিদ্যালয়ে নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৮৬ দশমিক ৩ শতাংশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মাসে ১০টির বেশি বিদ্যালয় পরিদর্শনের সক্ষমতা তাদের নেই। অথচ ৫৮ শতাংশ কর্মকর্তার ওপর ৫০টির বেশি বিদ্যালয় তদারকির দায়িত্ব রয়েছে। ফলে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি ব্যাহত হচ্ছে।

এছাড়া ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান ব্যবস্থায় একই তথ্য একাধিকবার দিতে হয়। এতে কাজের চাপ বাড়ার পাশাপাশি সময়ের অপচয় হচ্ছে। ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মকর্তা বিদ্যালয়গুলোয় নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার ঘাটতির কথা জানিয়েছেন। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয় খোলা, ক্লাস শুরু ও নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায়। অন্যদিকে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ কর্মকর্তা ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোকে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর চর্চা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। কিন্তু এটি বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কখনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর পেছনে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রবণতা রয়েছে। সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। আবার অনেক সময় ভর্তি হার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। সে লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়েও কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখান। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র জানতে এবং এর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এ ধরনের চর্চা বন্ধ করা জরুরি।’

এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন শিক্ষাবিদরা। বর্তমানে প্রত্যেক শিশুর জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক। ফলে এ তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি শিশুর জন্য একটি ইউনিক আইডি তৈরি করা গেলে একাধিক প্রতিষ্ঠানে একই শিক্ষার্থীকে ভর্তি দেখানোর মতো ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হবে বলেও তারা মনে করেন।

জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি নিজেও এমন কিছু জায়গা দেখেছি, যেখানে নথিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য হয়তো কেউ কেউ সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ নিতে পারে। এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে আমাদের তথ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তদারকি বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে মনিটরিং টিমকে আরো উন্নত, সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাগুলোও সমন্বিতভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সারা দেশে বিদ্যালয়ের চাহিদা নতুন করে জরিপের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। এর মাধ্যমে কোথায় শিক্ষার্থীর চাহিদা বাড়ছে আর কোথায় কমছে, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। সে অনুযায়ী বিদ্যালয় ও প্রয়োজনীয় সম্পদ পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়া যাবে।’