Image description

সকাল সোয়া ৭টা। তখনও খোলেনি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ফটক। এরই মধ্যে গেটের সামনে দীর্ঘ লাইন। নওগাঁর জয়পুর ডাঙাপাড়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. মাজেদুর রহমানও দাঁড়িয়ে আছেন সে লাইনে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সাড়ে ৮টার দিকে গেট খুললেও অপেক্ষার শেষ হয়নি। শেষ পর্যন্ত সাড়ে ১০টার দিকে গিয়ে তাঁর হাতে আসে জমা দেওয়ার সুযোগ।

 

নিজের জন্য নয়, প্রতিষ্ঠানের জীববিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক আইরিন সুলতানার বদলির আবেদন জমা দিতে ঢাকায় এসেছেন তিনি। নওগাঁয় কর্মরত আইরিনের বাড়ি নাটোরে। দীর্ঘদিন পর বদলির সুযোগ পাওয়ায় নিজের এলাকায় ফিরতে চান তিনি। নারী শিক্ষককে এত দূর এসে আবেদন জমা দিতে যেন না হয়, সে কারণেই প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিজেই ঢাকায় ছুটে এসেছেন।

 

মো. মাজেদুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে আবেদন জমা নিলেও তো হতো। কিন্তু এত কষ্ট করে এত দূর আসতে হলো।’

 

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) বেসরকারি মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি আবেদন শেষ হচ্ছে। এ দিনে আবেদন জমা দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে ছুটে এসেছেন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা। সকাল থেকেই অধিদপ্তর প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় দেখা গেছে দীর্ঘ সারি। 

 

কারও হাতে আবেদনপত্র, কারও হাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ফাইল। সবার লক্ষ্য এক, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন জমা দেওয়া। শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে বদলির মতো একটি কার্যক্রমে অনলাইনে আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের অতিরিক্ত সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে। 

 

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুধু একটি আবেদন জমা দিতে ঢাকায় আসতে হচ্ছে তাদের। শিক্ষকদের প্রশ্ন, অনলাইনে আবেদন নেওয়া হলে যাচাই-বাছাইও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে করা সম্ভব ছিল। এতে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ঢাকায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হতো না।

 

ভোগান্তির আরেকটি চিত্র দেখা গেছে ভোলা থেকে আসা এক নারী শিক্ষকের ক্ষেত্রে। পাবনায় শ্বশুরবাড়ি এই শিক্ষকের। তিনি বর্তমানে ভোলায় চাকরি করেন। বদলির সুযোগ পেয়ে নিজের জেলা পাবনায় ফিরতে চান তিনি। সেই আবেদন জমা দিতে রাতভর লঞ্চে ভ্রমণ করে ঢাকায় এসেছেন।

 

ঢাকায় এসে আরও এক সমস্যার মুখোমুখি হন। তাঁর প্রতিষ্ঠানপ্রধান অগ্রায়নপত্র দেননি। এমনকি আবেদন জমা দেওয়ার জন্য ছুটিও দেওয়া হয়নি তাকে। অধিদপ্তরের সামনে এসে নিজের পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই শিক্ষক।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অনলাইনে আবেদন নিলে এত কষ্ট হতো না। ঘরে দুই বছরের মেয়েকে রেখে আসছি। ছুটিও দেয়নি। এখন গিয়ে ক্লাস নিতে হবে।’

 

শিক্ষকদের জন্য দীর্ঘদিন পর বদলির সুযোগ এলেও আবেদন প্রক্রিয়ায় হার্ডকপি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তাঁদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। বিশেষ করে দূরবর্তী জেলার শিক্ষক এবং নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি পড়ছে।

 

আরও পড়ুন: মাদ্রাসা শিক্ষক বদলি আবেদনের সময় বাড়ানো নিয়ে যা বললেন ডিজি

 

একটি আবেদন জমা দিতে কেউ ভোরে বাড়ি থেকে রওনা হয়েছেন, কেউ রাতভর নৌপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসেছেন। এরপরও নির্ধারিত সময়ে আবেদন জমা দিতে দীর্ঘক্ষণ লাইনে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

 

শিক্ষকদের মতে, বদলির আবেদন যদি অনলাইনে গ্রহণ করা হতো এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এই অতিরিক্ত ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব ছিল। তাঁদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে বদলি কার্যক্রম সফটওয়্যারভিত্তিক হলে এমন ভোগান্তির অবসান হবে।

 

আজই আবেদন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আবেদনের চাপ বিবেচনায় সময় বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর আজ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আজকের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।