আবারো ফিরে এসেছে বিপ্লবের স্মৃতিময় জুলাই। জুলাই এলেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাসজুড়ে ফিরে আসে জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি। এই স্মৃতি শুধু শোকের নয়; এটি সাহস, আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক অনন্য প্রতীক।
গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের দুই বছর পার হলেও তাকে ভুলতে পারেননি তার বন্ধু, সহপাঠী, সহযোদ্ধা ও শিক্ষকরা। ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া ও দেবদারু সড়ক, ইংরেজি বিভাগের করিডোর, পরিচিত আড্ডার স্থান, মিডিয়া চত্বর, স্বাধীনতা স্মারক এবং আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিটি কোণ আজও যেন তার উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। সময়ের ব্যবধানে ক্ষত কিছুটা শুকালেও স্মৃতির গভীরতা এতটুকুও কমেনি। বরং প্রতি জুলাইয়ে ফিরে আসে শোক, গর্ব ও আত্মত্যাগের নতুন উপলব্ধি।
বন্ধুদের কাছে আবু সাঈদ শুধু একজন সহপাঠী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাহসের আরেক নাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের প্রতীক এবং এমন এক অনুপ্রেরণা, যার উপস্থিতি আজও তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণে অনুভব করেন।
বন্ধুরা জানান, আবু সাঈদ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, মিশুক ও সহানুভূতিশীল। সবার সঙ্গে সহজেই মিশে যেতেন এবং বিপদ-আপদে সবসময় বন্ধুদের পাশে দাঁড়াতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজ ও দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছিলেন সচেতন। তাই তার চলে যাওয়া শুধু একজন শিক্ষার্থীকে হারানোর বেদনা নয়, বরং একজন প্রিয় বন্ধু ও সহযোদ্ধাকে হারানোর অপূরণীয় শূন্যতা। জুলাই মাস এলেই সেই স্মৃতিগুলো আবারো জীবন্ত হয়ে ওঠে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ যেন তার আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী।
আবু সাঈদের বন্ধু শাকিল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আবু সাঈদ সবসময় বিপদ-আপদে সবার পাশে থাকতেন। যে কোনো প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রায় দুই বছর হতে চললেও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সেই দৃশ্য আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হৃদয়টা হাহাকার করে ওঠে। ক্যাম্পাসের যে কোনো সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন অগ্রণী। কারো রক্তের প্রয়োজন হলে নিজে রক্ত দিতেন, না হলে অন্যভাবে রক্তের ব্যবস্থা করতেন। নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতেন, আর অবসরে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসে আড্ডা দিতেন।’
আবু সাঈদের সহযোদ্ধা মো. শামসুর রহমান সুমন বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরুতেই আবু সাঈদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। শুরু থেকেই আবু সাঈদ আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সিনিয়র হিসেবে তার দৃঢ় উপস্থিতি জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।
তিনি জানান, ৩ জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা হলে আবু সাঈদ নিজেই সামনে এসে দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আবার ১২ জুলাই হামলার পর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘কারা আন্দোলনের সামনের সারিতে থেকে মরতে প্রস্তুত আছ? এদিকে আসো। যারা সামনে ব্যারিকেড দিয়ে আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা দেবে।’ প্রতিদিনের কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তিনি সবাইকে সাহস দিয়ে বলতেন, ‘ভয় পেও না, প্রোগ্রাম দাও। আমরা প্রোগ্রাম করব, যা হবে হবে।’ তার এই অদম্য সাহস আজও আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহ্সীনা আহ্সান বলেন, আবু সাঈদের ফাইনাল পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সময় তিনি টেলিভিশনে দেখেন, তার ছাত্র পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরপরই তিনি জানতে পারেন, আবু সাঈদ শহীদ হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারিনি।’
তিনি স্মরণ করেন, আবু সাঈদ ছিলেন নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত, মেধাবী, বিনয়ী, নম্র ও মার্জিত স্বভাবের একজন শিক্ষার্থী। শেষ বেঞ্চে চুপচাপ বসে ক্লাস করলেও কখনো কোনো অসদাচরণ করেননি। শিক্ষকদের প্রতি তার ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ, তবে কখনো অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি। আর্থিক সংকট থাকলেও আত্মমর্যাদাবোধের কারণে কারো কাছে সহযোগিতা চাননি।
তিনি আরো বলেন, আবু সাঈদের স্বপ্ন ছিল মেধার ভিত্তিতে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। তাই মেধার ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখে তিনি প্রতিবাদে নেমেছিলেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। আবু সাঈদ শুধু বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের গৌরব ও অহংকার। এমন একজন বীর শহীদের শিক্ষক হতে পেরে আমি গর্বিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, আবু সাঈদকে দেশের প্রতিটি মানুষ গভীর আবেগের সঙ্গে স্মরণ করে। আমরা চাই, তার হত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা আর কখনো এই ক্যাম্পাস বা দেশের অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না ঘটুক। আবু সাঈদের ক্যাম্পাসে শান্তি, শৃঙ্খলা, গবেষণা ও উন্নয়নের পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা কাজ করছি।
তিনি আরো বলেন, ‘আবু সাঈদের পরিবার ও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে তার নামে একটি আবাসিক হল, ‘আবু সাঈদ তোরণ’, স্মৃতিস্তম্ভ, আবু সাঈদ জাদুঘর এবং ‘আবু সাঈদ গেট’ নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু হবে ।
শিক্ষার্থীদের দাবি, আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। তার নামে আবাসিক হল, আবু সাঈদ তোরণ, স্মৃতিস্তম্ভ, জাদুঘর ও গেট নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু হওয়া উচিত। তাদের ভাষায়, আবু সাঈদ শুধু আমাদের স্মৃতিতে নন, আমাদের চেতনায়ও চিরজাগরুক হয়ে আছেন।