Image description

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ প্রশাসনের সহযোগিতায় জুলাইযোদ্ধা এবং স্বৈরাচার সরকারের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন সময় হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাদের ক্যাম্পাসে ফেরানোর অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেছেন, অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়েও বহু শিক্ষার্থীকে নানাভাবে নির্যাতনে জড়িত ছিলেন এসব ছাত্রলীগ নেতা। তারা হলেন এসএস ১১তম ব্যাচের আল আসিফ খান দিহান, ১৪তম ব্যাচের সৌভিক ভৌমিক জয় ও আহসানুল দীপ্ত।

জানা গেছে, শিক্ষক ও পুলিশি প্রহরায় চলমান ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তারা।

এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগ নেতাদের হামলার শিকার শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, এতো অল্প সময়ে ক্যাম্পাসে ফেরার সুযোগ পাওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ আবারও রক্তাক্ত করবে নিষিদ্ধ সংগঠনের এসব নেতা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপস্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক দিহান এবং আলাদা সম্পাদকীয় পদধারী সৌভিক ও দীপ্ত জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছিলেন। এ ছাড়াও গেস্ট রুম ও র‌্যাগিংয়ের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে মারাত্মক আহত করেছেন তারা। ঠুনকো কারণে একাধিক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সময় করেছেন শারীরিক নির্যাতন।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনে যাওয়া ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় তারা জড়িত। ফলে হামলাকারীরা ক্যাম্পাসে ফেরার খবরে নির্যাতনের শিকার এসব শিক্ষার্থী সীমাহীন ক্ষুব্ধ।

শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় পরীক্ষার সুযোগ?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক আজ বৃহস্পতিবার (২১মে) দুপুরে মেডিভয়েসকে বলেন, পাঁচ আগস্ট পরবর্তী সময়ে একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। এখন যারা পরীক্ষা দিচ্ছে, তখন তাদের সবার বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়েছে। অভ্যুত্থানের পক্ষের সকল অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতেই এ শাস্তি দেওয়া হয়। গত কিছু দিনের মধ্যে অনেকের শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর পর অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাদেরকে পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়। যেখানে একাডেমিক কাউন্সিলের সকল বিভাগীয় প্রধানরা থাকেন। এখানে কারও একক সিদ্ধান্তের কোনো প্রাধান্য নেই।

তিনি বলেন, ‘অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে যেহেতু পরীক্ষার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেজন্য তারা পরীক্ষা দিচ্ছে। তবে পরীক্ষার পর তাদেরকে ক্যাম্পাসে অ্যালাউ করা হবে না। তারা পাস বা ফেল, যাই করুক। চলমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হলে তাদের এখানে সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এখানে নতুন করে কোনো গোলমাল কাম্য না।

শাস্তির আওতামুক্ত দিহান

হামলায় জড়িত সকল ছাত্রলীগ নেতা শাস্তির আওতায় আসেনি বলে জানিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক ফাহাদ (১৫তম ব্যাচ)। তিনি বলেন, ‘যাদের শাস্তি হয়েছে, তাদের মধ্যে দিহান অন্তর্ভুক্ত নন। তার কোনো বিচার হয়নি। অথচ দিহান এমন কোনো খারাপ কাজ নেই, যা সে ক্যাম্পাসে করেনি। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, শিক্ষার্থীদের দিয়ে কুলির কাজ করানো, তাদের দিয়ে তার বাইক চালানো, পিয়নের মতো পরিবারের সদস্যদের কাজ করিয়ে নেওয়া, যে কোনো মিছিল-মিটিংসহ যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করানো—এসব ছিল তার নিয়মিত কাজ।’

ফাহাদ আরও বলেন, ‘ক্যাম্পাসে যাকে তার পছন্দ হতো না, তার গায়ে কথায় কথায় হাত দিত। শিক্ষার্থীকে পেছন থেকে লাথি দেওয়া, স্ট্যাম্প-রড দিয়ে পেটানো, গাছের ডাল ভেঙে পেটানো, কানে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা, জামা-কাপড় খুলে রেখে দেওয়া—এগুলো ছিল তার তাছে নৈমিত্তিক ব্যাপার।’

‘এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের রুমে তালাবদ্ধ করে রাতের পর রাত অভুক্ত রাখা, নারী শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা, উন্নয়নসহ হাসপাতালের যে কোনো কাজে ভাগ বসানো, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও মেডিকেলের সামনের দোকান থেকে টাকা আদায় করাও ছিল তার কাজ’—যোগ করেন এই ইন্টার্ন চিকিৎসক।

ফাহাদ বলেন, ‘আল আসিফ খান দিহানের মূল অপরাধ হলো, জুলাই আন্দোলন চলার সময় সে নেপথ্যে থেকে সকল নিপীড়নে কলকাঠি নাড়া। তখন সে ছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপস্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক।’

দেখে নেওয়ার হুমকি

সৌভিক ও দীপ্তর শাস্তি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিন্তু ইতিপূর্বে তারা যেহেতু এ রকম নিপীড়নমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং তারা আন্দোলনের সময় বারবার শিক্ষার্থীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল। সুতরাং তাদেরকে ক্যাম্পাসে ফেরানো হলে শিক্ষার্থীদের জীবন অনিরাপদ হবে।’

ফাহাদ বলেন, দিহানের পরীক্ষা দিতে আসা নিয়ে যখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা হচ্ছিল, তখন সে তার বন্ধুদেরকে দিয়ে জুনিয়রদের হুমকি দেওয়াচ্ছে যে, সময় এলে দেখে নেবে। এই হুমকি দিচ্ছে দিহানের ব্যাচ মেট সামিউল ইসলাম, যে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ। এ রকম হুমকির মধ্যে তাদের ক্যাম্পাসে ফেরানো হলে কেউ নিরাপদ বোধ করবে?

ছাত্রলীগ নেতাদের নিরাপদ পরীক্ষা নিশ্চিতে কমিটি

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষা দিতে আসা ছাত্রলীগ নেতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখাশোনার করার জন্য শিক্ষকদের নিয়ে দশ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যেখানে কলেজের সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে এ রকম সিদ্ধান্ত ভুল হয়েছে বলে মনে করেন কলেজ প্রশাসনের কেউ কেউ। তারা বলেন, এই ক্যাম্পাসে না করে ভার্সিটির কাছে হস্তান্তর করে অন্য কোনো জায়গায় ছাত্রলীগ নেতাদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেও হতো। বিশ্ববিদ্যালয় এটা করতে পারে।

ছাত্রলীগ নেতাদের ক্যাম্পাসে যাওয়া-আসা নিয়ে গঠিত সমন্বয় কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেডিভয়েসকে বলেন, তারা চান না ক্যাম্পাসে কোনো অনাকাঙিক্ষত কোনো ঘটনা ঘটুক। কারও কোনো অভিযোগ থাকলে সে ব্যক্তিগতভাবে আইনের আশ্রয় নিতে পারে। দেশের প্রচলিত আইন আছে, থানা আছে, পুলিশ আছে। শিক্ষকদের চাওয়া—এই ক্যাম্পাসের পরিবেশ আর নষ্ট না হোক। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা এসেছে, তাদের অভিভাবকরা আসছেন। ক্যাম্পাস পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে চলবে—এটাই সবার প্রত্যাশা।

‘প্রশাসন দায়িত্ব দিয়েছে তাই দায়িত্ব পালন করা। তবে আমরা বলেছি, শিক্ষার্থীরা সবাই পরিণত। তাদের সামনে দিয়ে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে তিন শিক্ষার্থীকে নিয়ে আসা, নিয়ে যাওয়া—এভাবে এতোগুলো পরীক্ষা, ভাইভা, অসপির সুযোগ দেওয়া, এতো দায় নেওয়া সম্ভব না। তারা অতীতে ক্যাম্পাসে অনেক অন্যায় করেছে। তবে এখন আমরা চাই, এখানে গন্ডগোল না হোক। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ঠিক না’—যোগ করেন তিনি। 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করছি, তারা একটু নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, সেজন্য তাদেরকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করছি। যেন কোনো নিগ্রহ না হয়। এক্ষেত্রে কারও দ্বিমত থাকলে দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নেওয়া ভালো।’

যা বলছেন শিক্ষার্থীরা 

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা জানান, কমিটির এসব সদস্যের তত্ত্বাবধানে এক সময় ক্যাম্পাসে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া এসব নেতা নিরাপদে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত ১৭ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় দিহানের আশপাশে অবস্থান করে অঘোষিত একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন একাধিক শিক্ষক। এ ছাড়াও পরীক্ষার হলের বাইরে মোতায়েন করা হয় পুলিশ। তবে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিহান নিজে করেছেন, নাকি কলেজ প্রশাসন নিশ্চিত করেছে—এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা নিশ্চিত নন।

ছাত্রলীগের হামলার শিকার শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এতো অল্প সময়ের ব্যবধানে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতারা ফিরতে পারলে অচিরেই ক্যাম্পাস আবারও রক্তাক্ত করবে তারা।

ক্যাম্পাসে আর সাংঘর্ষিক পরিবেশ ফিরে না আসুক—এমন দাবি করে শিক্ষার্থীরা বলেন, ছাত্রলীগ নেতাদের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীর সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। 

তাদের অভিযোগ, জুলাই ঘাতকদেরকে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ক্যাম্পাসে ফেরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যারা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে ভীতির রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল। তারা গেস্ট রুম, গণরুম, র‌্যাগিংয়ের সংস্কৃতির মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গন জাহান্নাম বানিয়ে রেখেছিল।

মেলেনি সোহরাওয়ার্দীর অধ্যক্ষের বক্তব্য

সামগ্রিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে ক্যাম্পাসে গেলে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আঈনুল ইসলাম খানকে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তিনি কোনো একটি মিটিংয়ে যোগ দিতে ডিজি কিংবা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে থাকতে পারেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।

এদিকে কলেজ ক্যাম্পাসের তিনতলায় ফাইনাল প্রফ পরীক্ষার চিত্র দেখতে গিয়ে পুলিশ সদস্যকে কেন্দ্রের সামনে অবস্থান করতে দেখা গেছে।