দেশের স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী কমে মাদরাসায় বাড়ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)। সংস্থাটির তথ্যমতে, মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই কমছে, বিপরীতে মাদরাসায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে সংস্থাটির এসব তথ্যের সঙ্গে একমত নন মাদরাসা পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্তরা। অন্যদিকে শিক্ষাবিদরা জানান, মূলধারা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থাহীনতায় এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্য সচিব ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন আমার দেশকে বলেন, ২০১২ সালের পর থেকে মূলধারা শিক্ষাব্যবস্থায় তথা স্কুল-কলেজের কারিকুলাম যুগোপযোগী না হওয়ায় আবেদন হারাচ্ছে। এছাড়া বিগত সময়ে বেশকিছু বিষয়ে যেমন পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষা গ্রহণ ও পরে বাতিল, নোটগাইড বুক নিষিদ্ধ করে পরে আবার চালু করা, সৃজনশীল পদ্ধতির নামে শিক্ষার্থীদের জন্য বিরক্তির কিছু এক্সপেরিমেন্ট শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তাতে মূলধারা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তাদের এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ফলে তারা মাদরাসা শিক্ষা কিংবা ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি ঝুঁকেছে। তিনি বলেন, কারিকুলাম যুগোপযোগী না হওয়া পর্যন্ত মূলধারা শিক্ষাব্যবস্থায় তথা স্কুল-কলেজে এ পরিস্থিতি চলতেই থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস প্রকাশিত শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৪ প্রতিবেদনে আগের চার বছরে স্কুল-কলেজে ১২ লাখ শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যানেও স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী কমে মাদরাসায় বেড়ে যাওয়ার তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। সংস্থাটির পরিচালক প্রফেসর মো. গোলাম ফিরোজ গতকাল শনিবার আমার দেশকে বলেন, ২০২৫ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যানেও স্কুল-কলেজের চেয়ে মাদরাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে তিনি হজের জন্য রওনা হওয়ায় বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।
এ প্রসঙ্গে পরিসংখ্যান কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ আমার দেশকে বলেন, এখনো ২০২৫ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি; আগামী জুন মাস নাগাদ প্রকাশিত হতে পারে। তবে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের চেয়েও মাদরাসার শিক্ষা কিছুটা বেড়েছে; তবে তিনিও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানাতে পারেননি। এদিকে সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে স্কুল ও কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে কয়েক লাখ, যেখানে একই সময়ে মাদরাসার শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় আড়াই লাখ।
জানা যায়, ২০২৪ সালে স্কুল স্তরে শিক্ষার্থী ছিল ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ জন, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ১২ লাখ কম। অন্যদিকে মাদরাসায় শিক্ষার্থী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৯৬ হাজারে। শিক্ষাবিদরা জানান, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, উচ্চ শিক্ষার ব্যয়, শিশুশ্রমÑএসবই এই পরিবর্তনের মূল কারণ। এছাড়া মাদরাসায় শিক্ষার্থী বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ক্যাডেট সিস্টেমের কথা জানিয়েছেন অনেকে। বর্তমানে মাদরাসাগুলোই একই সঙ্গে বাংলা, ইংরেজি এবং আরবি শিখানো হচ্ছে। যেখানে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী দুটি ভাষা শিখছেন; সেখানে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা তিনটি ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। ফলে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাতে উৎসাহ বোধ করছেন।
শিক্ষাবিদদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা এখন অনেক ব্যয়বহুল। ফলে অনেক পরিবার সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাচ্ছে, যেখানে খরচ কম। এছাড়া ২০২০ সালে করোনা মহামারির পর থেকেই মাদরাসায় শিক্ষার্থী ভর্তি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলেও মনে করেন তারা।
শিক্ষাবিদরা জানান, মহামারি চলাকালীন স্কুল বন্ধ থাকালেও কিছু মাদরাসা খোলা থাকার কারণে অভিভাবকদের একটি অংশ সন্তানদের বাড়িতে রাখার পরিবর্তে মাদরাসায় পাঠিয়েছিলেন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক সাত শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক চার শতাংশে। ২০২৫ সালে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ গরিব হয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের তথ্যেও দেখা যায়, ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা জানান, অর্থনৈতিক সংকট ও শিক্ষা ব্যয়ের বোঝা অনেক পরিবারকে সাধারণ শিক্ষা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, কেউ সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাচ্ছেন, কেউ আবার কাজ শেখাচ্ছেন জীবিকা নির্বাহের জন্য।
তবে এ পরিসংখ্যানের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন। তিনি এ পরিসংখ্যানের কোথাও ভুল থাকার কথা বলে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, আমি নিজে বেশ কয়েকটি মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে যুক্ত আছি; সেখানে দেখতে পাচ্ছি মাদরাসায় আশঙ্কাজনক হারে শিক্ষার্থী কমছে। শিক্ষার বিশ্বায়নের এ ট্রেন্ড অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীর দিক থেকে মাদরাসাগুলোর অবস্থা আরো নাজুক হতে পারে।