Image description

গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে ভিসি নিয়োগের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকাসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি নিয়োগও দিয়েছে সরকার। তবে এখনো ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়নি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি)। শীর্ষ এ পদটিতে কে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে ক্যাম্পাসে চলছে নানা আলোচনা।

তবে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির পরবর্তী ভিসি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কেননা নানা অভিযোগ—নিয়োগে অনিয়ম, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, গবেষণায় অসদাচরণ এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি ঘিরে গুঞ্জন উঠেছে অধ্যাপক হেমায়েত জাহানকে নিয়ে। 

নিয়োগের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সময় নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেননি ড. হেমায়েত জাহান। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কৃষি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি আবশ্যক থাকলেও তিনি প্রাণীবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে কৃষি বনায়ন (এগ্রোফরেস্ট্রি) বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। বিষয়গত অসামঞ্জস্য নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম আব্দুল হান্নান ভূঁইয়ার সময়ে তাকে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে মৌখিক পরীক্ষায় আপত্তির কারণে সাক্ষাৎকার ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাকে কীটতত্ত্ব বিভাগে স্থায়ী করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ড. হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে দ্বৈত রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ উঠেছে। একদিকে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে জামায়াত ও বিএনপিপন্থী শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বিএনপিপন্থী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)’-এর সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

গবেষণায় ‘সাইটেশন’ কেলেঙ্কারি
তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি গবেষণায় সাইটেশন সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানো। একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তার গুগল স্কলার প্রোফাইলে প্রায় ১,৯৬০ সাইটেশন থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩২৬-এ নেমে এসেছে। অভিযোগ, বিদেশি গবেষকদের প্রবন্ধ নিজের নামে যুক্ত করে সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল।

তবে ড. হেমায়েত জাহানের দাবি, এটি গুগল স্কলারের স্বয়ংক্রিয় সংযোজনের ফল।

টেন্ডার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে টেন্ডার-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলাম ও প্রো-ভিসির বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কয়েকজন ঠিকাদারকে কমিশনের ভিত্তিতে কাজ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘনিষ্ঠ এক কর্মকর্তার মাধ্যমে তার আত্মীয়ের নামে প্রায় ৭ কোটি টাকার কাজ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা
উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের দ্বন্দ্ব প্রশাসনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত, পদোন্নতি ও নিয়োগ নিয়ে বিরোধ প্রকট হয়েছে। এমনকি উপ-উপাচার্যপন্থীদের পক্ষ থেকে উপাচার্যের বাসভবনে তালা দেওয়ার হুমকির ঘটনাও শোনা গেছে।

প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্লাসরুম সংকট, আবাসন সমস্যা, নিম্নমানের খাবারসহ বিভিন্ন সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে সমাধানহীন রয়েছে।

মানববন্ধন ও তদন্তের দাবি
সম্প্রতি রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন থেকে সংশ্লিষ্টদের অপসারণ এবং দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়। শিক্ষকদের একাংশও এসব অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত চান।

অভিযোগ অস্বীকার
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ড. হেমায়েত জাহান বলেন, “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে পড়াশোনা করে শিক্ষক বা ভিসি হওয়ায় কোনো বাধা নেই। আমি নিয়ম মেনেই নিয়োগ পেয়েছি।”

টেন্ডার ও সাইটেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ভিসি হওয়ার আলোচনায় থাকায় একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বিস্তারিত জানতে জনসংযোগ (পিআরও) শাখায় যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে ইউজিসির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।