গত ১০ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিলের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ জন শিক্ষার্থীর ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন আত্মহত্যা করেছেন, নয়জন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এবং বাকি চারজন অসুস্থতাজনিত কারণে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং অন্যরা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) একদিনেই। এছাড়া পদ্মায় বাসডুবির ঘটনা একই দিন মারা যান চার শিক্ষার্থী।
গত মাসের ১০ তারিখ (মঙ্গলবার) সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন রাজশাহীর বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী আনিসা শারমিলা নাফিসা। গত ৩ মার্চ মেডিকেল কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে নগরীর লিলি হল সংলগ্ন এলাকায় মিনি ট্রাকের সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে প্রথমে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও পরে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নাফিসা।
শুক্রবার শিক্ষকের রোষানলে পড়ে এক বিষয়ে পাঁচ বার ফেল করে অভিমানে ১০৯ টি ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করেন কুমিল্লার বেসরকারি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিন।
বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের ২১তম ব্যাচের মেধাবী শিক্ষার্থী আসিফ আসমাত নিবিড় মারা যান গত মাসের ১৩ তারিখ (শুক্রবার)। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শেষে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। আসিফ আসমাত নিবিড়ের গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। তিনি চুয়াডাঙ্গার ভিক্টোরিয়া জুবিলি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে অধ্যয়নের পর প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। করতেন অনুবাদও।
গত ১৬ মার্চ (সোমবার) সকালে ময়মনসিংহ নগরীর কেওয়াটখালি এলাকায় বাসার ছাদ থেকে পড়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা রিজু মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার একটি ছেলে ও মেয়ে সন্তান রেখে গেছেন।
একই দিন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) শিক্ষার্থী দীপা দাস দাম্পত্য কলহের জেরে তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেন। জানা গেছে, আগেরদিন বিকেলে স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয় দীপার। পরে তিনি তার স্বামীকে একটি ঘরে আটকে রেখে পাশের ঘরে গিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেন।
সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার কর্মকারপাড়ায় গত ১৮ মার্চ সজীব দত্ত (২৭) নামে এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। সদর থানার এসআই মহাসিন আলীর ভাষ্য, সজীব শৈশব থেকেই নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন বলে পরিবারের দাবি। সকালে ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়।
পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় একই দিন চার শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। এর মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জোহরা অন্তি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থী সাইফ আহমেদ
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান ইমন গত ২২ মার্চ (রবিবার) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত যান। সেদিন সন্ধ্যায় গাজীপুরের কালীগঞ্জ এলাকায় যাওয়ার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহত ইমন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২৩২ ব্যাচের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
গত ২৫ মার্চ পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় একই দিন চার শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। এর মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জোহরা অন্তি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থী সাইফ আহমেদ ও সিআরপির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএইচপিআইয়ের ফিজিওথেরাপি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সোমা (অকুপেশনাল থেরাপি, ১৭তম ব্যাচ)।
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস ডুবির এ ঘটনায় অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) তড়িৎ ও প্রকৌশল বিভাগের ২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম খায়রুল গত ২৭ মার্চ (শুক্রবার) আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। আবদুর রহিম খাইরুলের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চায়না বাজার এলাকায়। তিনি রংপুরের কাউনিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০২৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীতে হাবিপ্রবির তড়িৎ ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের ঘড়িয়ালডাংগা ইউনিয়ন সাবেক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
রাজধানীর ভাটারার একটি বাড়ির ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাট থেকে গত ২৯ মার্চ (রবিবার) আনিপা নিন্দিয়া (২৫) নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত আনিপা লালমাটিয়া মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর থানার একলাসপুর গ্রামে। তার বাবার নাম আশফাক ভূঁইয়া। তিনি ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ভাটারা এলাকায় ভাড়া থাকতেন।
গত ৩০ মার্চ (সোমবার) প্রাইভেটকারের ধাক্কায় নিহত হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) আইন ডিসিপ্লিনের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মৌমিতা হালদার। খুলনা মহানগরীর জেলা পরিষদ ভবনের সামনে এ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত মৌমিতা হালদার নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার গ্রামের বাড়ি পাটকেলঘাটা।
দুর্ঘটনার পরপরই স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সদর হাসপাতালে এবং পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত আটটার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাজধানীর হাজারীবাগের মনেস্বর রোডের ভাড়া বাসায় গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সীমান্ত ‘বিষাক্ত দ্রব্য পানে’ আত্মহত্যা করেন। হাজারীবাগ থানার এসআই জাহিদ হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, রাত দেড়টার দিকে আমরা খবর পেয়ে ঢামেক হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রাথমিকভাবে চিকিৎসক জানিয়েছেন, নিহত শিক্ষার্থী ছারপোকা মারার ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইংরেজি বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের সাবেক শিক্ষার্থী সাবিত মাহমুদ শাওনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তুরাগ থানার ডিউটিরত অফিসার এসআই ইখলাস মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রাথমিক আলামতের ভিত্তিতে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে একই বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের আরেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ কাজল মিয়া জানান, সাবিত কয়েকদিন ধরেই মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কিছু অস্বাভাবিক পোস্টও দিয়েছিলেন। গতকাল রাত আনুমানিক ৩টার দিকে জানা যায়, তিনি নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেছেন।
একই দিন (শুক্রবার) শিক্ষকের রোষানলে পড়ে এক বিষয়ে পাঁচ বার ফেল করে অভিমানে ১০৯ টি ঘুমের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করেন কুমিল্লার বেসরকারি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিন।
নাম প্রকাশ করলে শিক্ষকের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা থাকায় উহ্য রাখার অনুরোধ জানিয়ে অর্পিতা নওশিনের বন্ধুরা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন, প্রথম বর্ষেই কলেজের এনাটমি বিভাগের প্রধান ডা. মনিরা জহিরের রোষানলে পড়েন নওশিন। প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় সকল বিষয়ে উত্তীর্ণ হলেও এনাটমিতে অকৃতকার্য হতে হয় তাকে। গত তিন বছরে নওশিন আরও চারবার এনাটমির পরীক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই পরীক্ষায় ফেল হয়েছেন। তার এই অসফলতার সুনির্দিষ্ট কারণ কেউ জানে না। তবে বন্ধুরা বলছেন, প্রথম বর্ষে থাকা অবস্থায় মনিরা শারমিন প্রকাশ্যেই নওশিনকে ফেল করার হুমকি দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ নাফিজ শুক্রবার সকাল ১০টায় গৌরনদীর নিজ বাড়িতে মারা যান। গত ১৬ মার্চ অসুস্থতার কারণে তাকে ঢাকা নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিছুটা সুস্থ বোধ করায় চিকিৎসকের পরামর্শে গত ১ এপ্রিল পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
শুক্রবার রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের (এসএইচএসএমসি) পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সাবরী মাহি (২৩) মারা যান ডায়রিয়াজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে। সহপাঠীরা জানিয়েছেন, মাহি এসএইচএসএমসির ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ছিলেন শান্ত স্বভাবের, ভদ্র এবং ভালো মনের একজন মানুষ।
এসব শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় সহপাঠীদের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মৃতিচারণ করে গভীর বেদনা প্রকাশ করছেন। কারও কাছে তারা ছিলেন প্রিয় বন্ধু, কারও কাছে সহযোদ্ধা কিংবা স্বপ্ন ভাগাভাগির সঙ্গী—হঠাৎ করেই তাদের অনুপস্থিতি তৈরি করেছে এক অপুরণীয় শূন্যতা। অনেকেই লিখছেন, হাসিখুশি মুখগুলো এত দ্রুত হারিয়ে যাবে, তা কখনো ভাবেননি। এই ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগও বাড়ছে, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামগ্রিক ক্যাম্পাস পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থী মাহির বন্ধু শ্রেয়া বসু ফেসবুকে শোক প্রকাশ করে লেখেন, ‘মুগদা মেডিকেল কলেজে ভর্তির পর আমার প্রথম বন্ধু ছিল মাহি। মেয়েটা ছিল ভীষণ শান্ত, ভদ্র আর অসাধারণ ভালো একজন মানুষ। আমাদের রোল কাছাকাছি ছিল, তাই প্রায় সবসময়ই আমরা একসাথেই থাকতাম। কিছুদিন পর মাইগ্রেশনে মাহি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে চলে যায়। সেদিন ওকে জড়িয়ে ধরে আমি অনেক কেঁদেছিলাম… কারণ জানতাম, আর প্রতিদিন দেখা হবে না, একসাথে ঘোরা হবে না। তারপর থেকে আমাদের কথা হতো মেসেজে… কিন্তু দূরত্ব কখনো আমাদের বন্ধুত্বকে কমাতে পারেনি।’