
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচনের (ডাকসু) তারিখ যতই এগিয়ে আসছে প্রার্থীর ততই দেখিয়ে যাচ্ছেন নানা চমক। বিশেষ করে প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রার্থীরা দেখাচ্ছেন নানা সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ। যা ভোটাররাও গ্রাহন করছেন সাদরে। তেমনি ১০টি অভিনব প্রচারণার বিস্তারিত থাকছে এই সংবাদে।
ব্যালট নম্বর ৩২ এর সঙ্গে ধানমন্ডি ৩২ এর মিল রেখে অভিনব প্রচারণা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে অভিনব প্রচারণা ও সাবলীল বাচনভঙ্গির জন্য আলোচনায় উঠে এসেছেন উম্মা উসওয়াতুন রাফিয়া। যিনি ঢাবির আইন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পেয়েছেন ব্যালট নম্বর ৩২। প্রচারণায় নতুনত্ব আনার জন্য রাফিয়া ব্যবহার করছেন এই নম্বরটিকে।
গত বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে ছবি, ব্যালট নম্বর ও পদের নামসহ একটি ফটোকার্ড শেয়ার দিয়ে ভোট চেয়েছেন রাফিয়া। ছবি ক্যাপশনে রাফিয়া লিখেছেন, ‘ধানমন্ডি ৩২ মন্দ হলেও ডাকসু সদস্যপদের ৩২নং ব্যালট কিন্তু একেবারেই উলটো। কাজে কাজেই সুতরাং- ৯ তারিখ সারাদিন, ৩২-এ ভোট দিন!’ এই সৃজনশীল প্রচারণার মাধ্যমে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।
জারি গানে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছেন প্রার্থী নিজেই
হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল সংসদে সমাজসেবা সম্পাদক পদপ্রার্থী মো. সাইফুল্লাহ। নিজেই জারি গানের মাধ্যমে হলের সমস্যা ও তার নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেন যা সামাজিক মাধ্যমে বেশ সাড়া জাগিয়েছে।
মো: সাইফুল্লাহ বলেন, জারি গানের মাধ্যমে আমি হলের সমস্যা এবং কিছু ইশতেহার তুলে ধরেছি। গানে গানে হলের সমস্যা এবং সমাধানের আশ্বাস দিয়েছি। আমি সবসময় চাই অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম কিছু করতে। তাই নির্বাচনী প্রচারণাতেও আমি ব্যতিক্রমী এই পন্থা বেছে নিয়েছি। আমার ব্যালট নাম্বার ১, আমি মুহসীন হল সংসদে সমাজসেবা সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছি। আমি নির্বাচিত হলে যা ইশতেহার দিয়েছি তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ।
এর আগেও দুই সন্তান নিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন তিনি যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময় সন্তানদের সঙ্গে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ডাকসু বন্ধ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে আমরা ডাকসু পেয়েছি এটা আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো। আমার বড় মেয়ে এবং ছোট ছেলেকে নিয়ে ফর্ম নিয়েছি এটা স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমার ছেলে-মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ডাকসুর ফর্ম নিয়েছি, কারণ পরবর্তী কয়েক প্রজন্মও যেন ডাকসুর গুরুত্ব অনুভব করতে পারে। আমি চাই ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়মিত ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হোক, যাতে আমার ছেলে-মেয়ের প্রজন্মও বিনা বাধায় ছাত্রসংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।
কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে প্রচারণা
কবি আবৃত্তির মাধ্যমে অভিনব কায়দায় প্রচারণা চালাচ্ছেন মো: পারভেজ মাহমুদ নিলয় যা ভোটারদের কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তিনি ‘সংস্কৃতি আমাদের লড়াই, সংস্কৃতি আমাদের স্বাধীনতা’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তিনি বলেন, কবিতা আমাদের প্রতিটি আন্দোলনের, আমাদের লড়াই এর ভাষা। আমাদের স্বাধীনতার দামামা। কবিতার মাঝেই আমার অঙ্গীকার নিয়ে আপনাদের কাছে আমার পৌঁছানোর চেষ্টা। আপনাদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে চাই আপনাদের নির্বাচিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হয়ে। ১৪ নম্বর ব্যালটে ভোট দিয়ে আমাকে সুযোগ দিন সাহিত্য ও সংস্কৃতি র মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা আর লড়াই এর পথিকৃৎ বানানোর।
টাকার আদলে লিফলেট বানিয়ে প্রচারণা
টাকার আদলে তৈরি লিফলেট ডাকসু নির্বাচনে ভোটারদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। প্রার্থীরা সেই টাকায় তাদের নাম, পদ ও ব্যালট নাম্বার উল্লেখ করে হুবহু টাকার আদলে তৈরি করছেন এসব লিফলেট। যার ফলে ভোটারাও এসব অভিনবত্বকে সাদরে গ্রাহণ করছে।
কেন্দ্রীয় সংসদে কার্যনির্বাহী সদস্য পদপ্রার্থী আরাফাত হোসেন এমন অভিনব কায়দায় চালাচ্ছেন তার প্রচারণা। আরাফাত হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, প্রচারণার প্রথম দুই দিন তিনি কোনো লিফলেট ব্যবহার করেননি। তবে পরে তিনি এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেন—টাকার আদলে লিফলেট বানিয়ে সেটি ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘অনেকে লিফলেট মনে রাখতে পারছিলেন না, তাই নতুন কিছু করার চিন্তা করলাম। লিফলেট হিসেবে নোটটি স্যুভেনির হিসেবে গ্রহণ করছেন অনেকেই। এটি রেখে দিচ্ছেন বা মানিব্যাগে রাখছেন।’
এছাড়াও, স্যার এফ রহমান হল সংসদ এর ভিপি প্রার্থী নাঈমুর রহমানও এমনই একটি প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে তার লিফলেটটি মার্কিন ডলারের আদলে বানানো। নোটের মধ্যে তিনি জর্জ ওয়াশিংটনের ছবি পরিবর্তন করে নিজের ছবি বসিয়েছেন এবং মার্কিন সিলমোহরগুলো পরিবর্তন করে নিজের প্রচারণা বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘এটা একজন সিনিয়রের পরামর্শে করেছি। শুরুতে আমি বাংলাদেশি টাকার ভাবনা ছিলাম, কিন্তু তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম সাদা-কালো ডলার বানাবো।’
এই ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছেন আরমান হোসেন (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের বহিরাঙ্গন ক্রীড়া সম্পাদক), সাদেকুর রহমান সানি, আবু ছালে মো. হুমায়ুন হেলাল এবং ওয়ালিইউল ইয়ামিন নাবিলসহ আরো অনেক প্রার্থী। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দিনে আরো প্রার্থী এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করবেন।
গান গেয়ে নির্বাচনী প্রচারণা
‘একখান ভোট দিয়েন ভাই , একখান ভোট দিয়েন ভাই’ গান গেয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাওয়ার এই অভিনব কৌশল সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। 'প্রতিরোধ পর্ষদ' প্যানেলের মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক পদপ্রার্থী আকাশ আলী গান গেয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাচ্ছেন।
তিনি জানান, ক্যাম্পাসের যে বিদ্যমান সমস্যাগুলো রয়েছে সেগুলো নিয়ে কাজ করে যেতে চাই। আমরা নির্বাচনে জয়ী হই বা না হই ক্যাম্পাসের সমস্যা নিয়ে আমাদের যে সংগ্ৰাম ছিল তা জারি রাখবো। আর নির্বাচনে জয় লাভ করলে সেই কাজের ব্যাপাকতা আরো তীব্রতর হবে।
১ বছর ফ্রি ইংরেজি পড়ানোর ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা
ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হলে ঢাবি শিক্ষার্থীদের ১ বছর ফ্রি ইংরেজি পড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম হোসেন। এই ঘোষণার পর পরই আলোচনায় আসেন তিনি ।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার নিজের ইংরেজি প্লাটফর্ম রয়েছে shameeminsight, যেখানে আমি বিগত বছরে প্রায় ১৪ হাজার ছাত্র ছাত্রী পড়িয়েছি। আগে আমি সাইফুরস-এর কোর্স সমন্বয়ক ছিলাম। আমি একটি উচ্চতর ইংরেজি লেখার কোর্স পড়াই, যেখান থেকে বহু শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল এবং পিএইচডি করছে। প্রায় প্রতি ব্যাচে আমাদের ১০-১৫ লাখ টাকাও আসে। সেই জায়গা থেকে ঢাবিতে যারা ইংরেজি ভাষা শিখতে চায় স্কিল হিসেবে আমি তাদের বিনামূল্যে পড়ানোর ঘোষণা দিয়েছি।
পোস্টারে অভিনবত্ব
ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থীরা পোস্টারের এনেছে ভিন্নতা। একেক প্রার্থী একেক রকম আকর্ষণীয় পোস্টার তৈরি করে দিয়েছেন তাদের সৃজনশীলতার পরিচয়। অনেক প্রার্থীই পোস্টারে যুক্ত করেছেন কিউআর স্ক্যানার যার মাধ্যমে একজন প্রার্থী স্ক্যান করেই দেখতে পারবে প্রার্থীর বিস্তারিত তথ্য ও ইশতেহার। কবি জসীম উদদীন হল সংসদে এজিএস পদপ্রার্থী তার পোস্টার তৈরি করেছেন বুকমার্কের আদলে। সঙ্গে যুক্ত করেছেন কিউআর স্ক্যানার।
তিনি বলেন, এই পোস্টটি একজন শিক্ষার্থী পড়ার কাজেও ব্যবহার করতে পারবে। একটি বইয়ের নির্দিষ্ট অংশ পড়ার পর এই বুকমার্ক ব্যবহার করে সেই জায়গাটি সহজেই খুঁজে পেতে পারে। তাছাড়া বুকমার্কের পেছনে কিউআর স্ক্যানার যুক্ত আছে যেটি স্ক্যান করে শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই আমার ইশতেহার দেখতে পারবে।
ভিডিও তৈরি করে প্রচারণা
অধিকার প্রার্থীরাই তাদের নিজেদের প্রচারণা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও তৈরি করছে । ভিডিওতে কেউ যুক্ত করছে তাদের ব্যালট নাম্বার মনে রাখার কৌশল, কেউ যুক্ত করছে তাদের ইশতেহার আবার কেউ বা যুক্ত করছে শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও সমাধানের বিভিন্ন পদ্ধতি। ডাকসু প্রচারণার ক্ষেত্রে অভিনব কায়দায় মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে এই ভিডিও। যেমন: 'স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য' প্যানেলের সদস্য পদপ্রার্থী হাসান জুবায়ের তুফান। তিনি নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে তুফান মুভির আদলে তৈরি করেছেন ভিডিও। তিনি জানান, ডাকসু প্রচারণা হবে তুফানের গতিতে।
পোস্টার লিফলেট ব্যতীত পরিবেশবান্ধব প্রচারণা
ডাকসু নির্বাচনে এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছেন মাস্টারদা’ সূর্যসেন হল সংসদের স্বতন্ত্র সদস্য পদপ্রার্থী জাকির হাসান (সাগর মিয়া)। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, প্রচারণায় কোনো পোস্টার বা লিফলেট ব্যবহার করবেন না। সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণা চালাবেন।

তিনি বলেন, প্রচলিত প্রচারণা পদ্ধতি থেকে সৃষ্ট কাগজের অপচয় এবং মিথেন গ্যাস নিঃসরণের মতো পরিবেশগত ক্ষতি কমাতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তার ভাষায়, প্রতি বছর শুধু কাগজ তৈরির জন্য প্রায় ৪০ কোটি গাছ কাটা হয়। আমি চাই, যে কাগজ দিয়ে লিফলেট ছাপানো হতো, তা যেন বই বা গবেষণাপত্র ছাপাতে ব্যবহার হয়।
অভিযোগ-পরামর্শ বাক্স নিয়ে প্রচারণা
বিজয় একাত্তর হল সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ অভিযোগ বা পরামর্শ বাক্স নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে বেশ সাড়া ফেলেছেন। একজন ভোটারের কি প্রত্যাশা তার প্রতি কিংবা কোন অভিযোগ থাকলেও সেগুলো কাগজে লিখে বাক্সে রাখতে পারেন ভোটাররা।

আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ বলেন, আমি চাই আমার যে ভোটার আছে তারা আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলুক, কথা বলে জানুক আমি হলের জন্য কী করেছি এবং কী করতে পারবো। সেই সঙ্গে তারা আমার কাছে কী চায় এটা জানার জন্য হল গেটের সামনে টেবিল নিয়ে বসেছি। আমি চাই ভোটাররা এখানে এসে তাদের মন্তব্য, পরামর্শ, অভিযোগ জানাক।
তিনি আরো বলেন, তারা আমার কাছে কী চাচ্ছে তা আমি একটি বক্সে সংরক্ষণ করছি। প্রার্থীর নাম ও রুম নাম্বার তথ্য আমার কাছে রয়েছে। যেন আমি নির্বাচিত হলে বলতে পারি আপনি আমার কাছে এই দাবি করেছিলেন, এটা চেয়েছিলেন। আসেন আপনার প্রত্যাশা নিয়ে কতটুকু কাজ করেছি তা দেখে যান।