নায়ক রাজ রাজ্জাক ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার উত্তাল সময়ে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় পা রাখেন। তখন তার সম্বল বলতে ছিল পীযূষ বসুর দেওয়া একটি চিঠি আর নির্মাতা আবদুল জব্বার খান ও শব্দগ্রাহক মণি বোসের ঠিকানা। অনিশ্চিত সেই সময়েই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে তার জীবনের গতিপথ। পরিচালক আবদুল জব্বার খানের হাত ধরেই চলচ্চিত্রজগতে তার যাত্রা শুরু- সহকারী পরিচালক হিসেবে। সেখান থেকেই রূপালি পর্দায় রাজ্জাকের উত্থান। এক সময়ের টালিগঞ্জের এই তরুণই পরিণত হন বাংলাদেশের নায়করাজ রাজ্জাকে। আজ (২৩ জানুয়ারি) সবার প্রিয় নায়করাজ রাজ্জাকের জন্মদিন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়- ভারতের টালিগঞ্জের ছেলে হয়েও কীভাবে তিনি বাংলাদেশের মানুষের ‘জনতার নায়ক’ হয়ে উঠলেন? কেন এ দেশের আপামর জনসাধারণ তাকে আপন করে নিল?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার চরিত্র নির্বাচন আর অভিনয়ের গভীরতায়। রাজ্জাক এমন সব চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন, যেখানে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন আর সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছে। সেই কারণেই ধীরে ধীরে দর্শকের চোখে তিনি শুধুই একজন অভিনেতা নন, হয়ে ওঠেন ‘নায়ক’।

রোমান্টিক নায়ক হিসেবে রাজ্জাকের আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘নীল আকাশের নিচে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। সুদর্শন রাজ্জাক ও কবরীর রসায়ন দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ‘নীল আকাশের নিচে আমি’ গান গেয়ে মামুন চরিত্রে প্রেমে বিভোর রাজ্জাক তখন দর্শকের মানসপটে গেঁথে যান নিখাদ প্রেমের নায়ক হিসেবে।
এরপর ১৯৬৬ সালে পরিচালক জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে লখিন্দর চরিত্রে অভিনয় করে যেন বাঙালির শিকড়ের গল্পই পর্দায় জীবন্ত করে তোলেন তিনি। যুগ যুগ ধরে শোনা লোককাহিনির লখিন্দরকে রাজ্জাকের অভিনয়ে প্রথমবারের মতো চোখের সামনে দেখতে পান দর্শক। একই পরিচালকের ‘আনোয়ারা’ চলচ্চিত্রে ক্ল্যাসিক উপন্যাসের নূর ইসলাম চরিত্রেও তিনি দর্শকের মন জয় করেন। সাহিত্যনির্ভর চরিত্রে তার সংযত ও গভীর অভিনয় রাজ্জাককে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত দর্শকের কাছে রাজ্জাক বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেন জহির রায়হানের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র মাধ্যমে। গণ-অভ্যুত্থান ও আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্যসমৃদ্ধ এই ছবিতে তিনি পরাধীন দেশের সচেতন নাগরিক ফারুক চরিত্রে অভিনয় করেন। বিশিষ্ট নির্মাতা আলমগীর কবির এই চলচ্চিত্রকে ‘বাংলাদেশের প্রথম জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী চলচ্চিত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্র রাজ্জাকের ক্যারিয়ারে যোগ করে আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
রাজ্জাক সিনেমার পর্দায় সেই সব কাজই করে দেখিয়েছেন, যা বাস্তবে সাধারণ মানুষ করতে চেয়েও পারে না। নিপীড়িত মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন শক্তির প্রতীক। রোমান্টিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক-সব ধরনের চলচ্চিত্রেই নিজেকে উজাড় করে দিয়ে চরিত্রকে জীবন্ত করেছেন তিনি। টানা কয়েক দশক ধরে তাই রাজ্জাক দাপটের সঙ্গেই শাসন করেছেন রূপালি পর্দা।
আজও নায়করাজ রাজ্জাক বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই চিরচেনা নায়কোচিত অভিব্যক্তি। বাংলাদেশের মানুষের মনে তিনি এখনো এমন এক নাম, এমন এক মুখ-যা সহজে ম্লান হওয়ার নয়। জনগণকে তৃপ্ত করতে পেরেছিলেন বলেই মানুষ তার কপালে পরিয়ে দিয়েছিল ‘নায়ক’র রাজটিকা।