বনানীর সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন আইসিইউ ও হাসপাতালের বিছানায় থাকতে হয়েছে চিত্রনায়িকা মেঘলা মুক্তাকে। দুর্ঘটনার পর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ায় হতাশ এই অভিনেত্রী। একান্ত আলাপে দুর্ঘটনার পরবর্তী অভিজ্ঞতা থানায় হয়রানির অভিযোগ এবং বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার কথা তুলে ধরেছেন এই অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইব্রাহীম জাহিদ।
ঢাকা পোস্ট: আপনার দুর্ঘটনার পর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো বিচার পাননি। বিষয়টি নিয়ে আপনার বর্তমান অবস্থান কী?
মেঘলা মুক্তা: আমি খুবই হতাশ। একজন মিডিয়াকর্মী ও অভিনেত্রী হয়েও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছি, সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছি, এ নিয়ে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত হয়তো বিচার পাব না। বিষয়টি এখন আদালতে গেছে। কত মাস কিংবা কত বছর লাগবে, জানি না। এত দিন ধরে এই মামলা চালানোর মতো ধৈর্য ও সামর্থ্য আমার থাকবে কি না, সেটাও ভাবতে হচ্ছে। কারণ, আদালতে দুই পক্ষকেই উপস্থিত থাকতে হয়।
আমার মনে হয়, এ ধরনের ঘটনায় বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা করাটাই যেন ভুল। মানুষকে অন্তত জানানো হয়েছে, আজ আমার সঙ্গে এমন হয়েছে, কাল অন্য কারও সঙ্গে হতে পারে। বনানী থানার আওতাধীন এলাকায় ছিনতাইসহ বিভিন্ন ঘটনায়ও মানুষ সহজে প্রতিকার পায় না বলে আমার ধারণা। আমার দুর্ঘটনাটিও ওই থানার এলাকায় ঘটেছে। বনানী থানার ওপর আমার আর আস্থা নেই। পুলিশের কিছু সদস্যের ভূমিকা নিয়ে আমার গুরুতর প্রশ্ন আছে।
ঢাকা পোস্ট: বনানী থানার পুলিশের প্রতি আপনার এতটা ক্ষোভ তৈরি হলো কেন?
মেঘলা মুক্তা: একই মাসে আমার দুটি দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা হয়েছে। একটি আমার গাড়ির সঙ্গে, অন্যটি আমার নিজের। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল আমার বনানীর দুর্ঘটনার দুই-তিন সপ্তাহ আগে। আরএফএলের একটি পিকআপ আমার গাড়িতে ধাক্কা দিয়েছিল। তখন আমি নিজেই ৯৯৯-এ ফোন করি। ঘটনাস্থল ছিল ৩০০ ফিটের মস্তুল ব্রিজের কাছে। ৯৯৯ থেকে আমাকে জানানো হয়, জায়গাটি খিলক্ষেত থানার আওতাধীন এবং সেখান থেকে পুলিশ পাঠানো হবে।
পুলিশ এসেছিল, কিন্তু আমাকে প্রায় তিন ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আমি পিকআপটিকে থামিয়ে রেখেছিলাম। কোনো ভিডিও করিনি, কোনো বাড়তি কিছু করিনি। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছিলাম।
কিন্তু দায়িত্বে থাকা এসআই পিকআপের চালককে আটকানোর পরও তার পরিচয়, মালিকের তথ্য কিংবা মোবাইল নম্বর সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান। অথচ গাড়িতে প্রাণ-আরএফএলের নাম লেখা ছিল। কিছুক্ষণ পর ওই এসআই দূরে গিয়ে কয়েকটি ফোন করেন। এরপর ফিরে এসে আমাকে বলেন, আমি নাকি অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলাম।
আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, কোনো ক্যামেরা বা তদন্তের মাধ্যমে কি তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন? আমি ৯৯৯-এ ফোন করে তাকে ডেকে এনেছি, অথচ তিনি তদন্ত না করেই উল্টো আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন কেন? আমি তাকে ক্ষমা চাইতে বলেছিলাম।
ঢাকা পোস্ট: এরপর কী হয়েছিল?
মেঘলা মুক্তা: ওই রাতেই আমি গাড়ি নিয়ে খিলক্ষেত থানায় যাই। থানার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলি। পরদিন সকালে বাবাকে নিয়ে থানার প্রধান কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা বলি। সাধারণত দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্তের জন্য দুই গাড়িই থানায় নেওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে আমাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
পরদিন থানার প্রধান কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আম্মা, রাগ করো না। ওর দ্বারা ভুল হয়ে গেছে।’ অর্থাৎ, একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে তিন-চার ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। আমি বারবার বলেছি, দুটি গাড়িই থানায় নিয়ে যান। আমার গাড়ির পেছনে ধাক্কা লেগেছিল। আমি যদি অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাতাম, তাহলে দুর্ঘটনার ধরন দেখে সেটি তদন্ত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু কোনো তদন্ত ছাড়াই আমাকে দায়ী করা হয়েছিল বলে আমার অভিযোগ।
পরে বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে লিখেছিলাম। এসআই রাজুর নাম ও ছবি দিয়েও পোস্ট করেছিলাম। ঘটনাটি ওপরের পর্যায়ে যাওয়ার পর দুটি গাড়িই থানায় নেওয়া হয়। পরে আরএফএলের একজন প্রতিনিধিকে ডেকে এনে থানায় বসে বিষয়টি মীমাংসা করা হয় এবং আমি ক্ষতিপূরণ পাই।

আমার প্রশ্ন, একজন সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে এমন আচরণ কেন করা হবে? আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, পুলিশের কিছু সদস্য দায়িত্ব পালনের চেয়ে অন্য বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতার পর তদন্ত পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে আমার মনে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা পোস্ট: এরপর বনানীতে আপনার দুর্ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনার তদন্তে কী ধরনের অনিয়ম দেখেছেন?
মেঘলা মুক্তা: বনানীর দুর্ঘটনার পর আমি আইসিইউতে ছিলাম। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। তখন আমার পক্ষে থানায় কী হচ্ছে, তা খোঁজ নেওয়া সম্ভব ছিল না। পরে জানতে পারি, বনানী থানায় আমার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে একজন দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু তিনি আমার বক্তব্য নেননি, আমার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও নেননি।
আমার দুর্ঘটনা ঘটে ২৮ জুলাই। ১ সেপ্টেম্বর সাবেক গুলশান বিভাগের উপকমিশনার তানভীর আহমেদের সঙ্গে আমার বাবা দেখা করেন। আপনারা সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে অনেক খবর প্রকাশ করেছিলেন। তখন আমার বাবা দুর্ঘটনার তদন্তের বিষয়ে খোঁজ নিতে যান।
২৮ জুলাই দুর্ঘটনার পর আমার বন্ধু ও সহকর্মীরা থানায় গিয়েছিলেন। অভিনেতা ইমতিয়াজ বর্ষণ আমার ভালো বন্ধু। তিনিই বাদী হয়ে অভিযোগ করেছিলেন। কারণ, দুর্ঘটনার পর আমাকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে গিয়ে অভিযোগের কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়েছিল। তখন আমার পরিবার আমাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমার জীবন বাঁচানোই ছিল তাদের প্রধান চিন্তা।
ইমতিয়াজ অভিযোগ করার পর তদন্ত কর্মকর্তা তাকে দুই-তিনবার ফোন করেছিলেন। আমার বক্তব্য নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তখন আমি আইসিইউতে থাকায় ইমতিয়াজ তাকে বলেছিলেন, আমাকে সাধারণ বেডে স্থানান্তর করা হলে জানানো হবে। পরে আমাকে বেডে নেওয়ার পর তিনি বেশ কয়েকবার ফোনও করেছিলেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা আর আসেননি। আমার বক্তব্য নেওয়া হয়নি, পরিবারের কারও বক্তব্যও নেওয়া হয়নি।
ঢাকা পোস্ট: আপনার বাবা ১ সেপ্টেম্বর থানায় গিয়ে কী জানতে পারেন?
মেঘলা মুক্তা: আমার বাবা যখন থানার প্রধান কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন, তখন তিনি দুর্ঘটনার বিষয়ে জানেন না বলে জানান। তার নাম ছিল মোস্তাফিজ। পরে আমার বাবা অভিযোগের কাগজ দেখান। তখন দেখা যায়, অভিযোগটি থানার কম্পিউটার সিস্টেমে নিবন্ধিত হয়নি। অর্থাৎ, অভিযোগ দেওয়ার পরও সেটি ডিজিটালভাবে নিবন্ধন করা হয়নি বলে আমরা জানতে পারি।
আমার প্রশ্ন, অভিযোগ নিবন্ধিত না হলে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলো কীভাবে? একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে, অথচ থানার প্রধান কর্মকর্তা ঘটনাটি সম্পর্কে জানেন নাএটা কীভাবে সম্ভব? আমার দুর্ঘটনার সময় পেছনে থাকা আরেকটি গাড়ির চালক পুরো ঘটনা ভিডিও করেছিলেন। তিনি দুর্ঘটনা ঘটানো গাড়ির নম্বরও সংগ্রহ করেছিলেন। ৯৯৯-এ ফোন করার পর তাকে থানায় যেতে বলা হয়। তিনি বনানী থানায় গিয়ে ভিডিও, গাড়ির নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য পুলিশের কাছে জমা দেন। তার নাম নেহাল।
অর্থাৎ, কোন গাড়ি আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল, সেই তথ্য পুলিশের কাছে ছিল। এরপরও ১ সেপ্টেম্বর আমার বাবা থানায় গিয়ে জানতে পারেন, অভিযোগটি নিবন্ধিত হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলেও কার্যকর তদন্তের অগ্রগতি ছিল না বলে আমাদের মনে হয়েছে।
ঢাকা পোস্ট: তদন্ত কর্মকর্তা কি আপনার বক্তব্য নেওয়ার জন্য পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি?
মেঘলা মুক্তা: তিনি দাবি করেছিলেন, আমার পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ফোন দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমাদের কাছে ফোন করার প্রমাণ, এমনকি কলের স্ক্রিনশটও ছিল। দুই-তিনবার ফোন করা হয়েছিল। তিনি আসেননি। পরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ডিউটিতে ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেননি।
আমার প্রশ্ন, একজন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বের মধ্যে কি ভুক্তভোগীর বক্তব্য নেওয়া পড়ে না? ২৯ দিনেও কি তিনি সময় পাননি? আমি তখন আইসিইউতে ছিলাম, পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। আমার পরিবারের সদস্যরা বারবার যোগাযোগ করেছেন। তারপরও কেন আমার বক্তব্য নেওয়া হয়নি?
ঢাকা পোস্ট: এরপর মামলার অগ্রগতি কীভাবে হলো?
মেঘলা মুক্তা: ১ সেপ্টেম্বর আমার বাবা আবার অভিযোগ করেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে মামলাটি নিবন্ধন করান। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তদন্ত কর্মকর্তা বিকরণ আমার বাবাকে ফোন করে জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত গাড়ি ও চালককে আটক করা হয়েছে।
আমার বাবা তখন বরিশালে ছিলেন। আমাদের এক আত্মীয় মারা গিয়েছিলেন। তিনি জানান, রাতে আসা সম্ভব নয়, সকালে আসবেন। কিন্তু তাকে রাত ১২টা পর্যন্ত বারবার ফোন করা হয় এবং দ্রুত আসতে বলা হয়। অথচ তিনি তখন দূরে ছিলেন।
আমার বাবা রাতে আসতে পারবেন না জানালেও পুলিশ অপেক্ষা করেনি। পরদিন সকালে গাড়ি ও চালককে আদালতে পাঠানো হয় বলে আমরা জানতে পারি। এখানেই আমার প্রশ্ন। ১ সেপ্টেম্বর অভিযোগ করার পর যদি ৩ সেপ্টেম্বর গাড়ি আটক করা সম্ভব হয়, তাহলে ২৮ জুলাইয়ের অভিযোগের পরপরই কেন তা করা হলো না? ওই ৩৪ দিনে কী হয়েছে, তা নিয়ে আমার সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, শুরু থেকেই আন্তরিকভাবে তদন্ত করা হলে এত দেরি হতো না।
আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, পুলিশের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগগুলো আমার অভিজ্ঞতা ও ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে। আমি চাই, এসব বিষয় যথাযথভাবে তদন্ত করা হোক এবং প্রকৃত সত্য সামনে আসুক।
ঢাকা পোস্ট: আপনার অভিযোগ, তদন্তে গাফিলতির কারণে আপনাকে বারবার আদালতে যেতে হচ্ছে। এখন কী অবস্থায় আছেন?
মেঘলা মুক্তা: আমার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, মেডিকেল রিপোর্টসহ সবকিছু তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে। এখন বনানী থানায় নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দায়িত্বে এসেছেন। তার কাছে আমার অনুরোধ, তিনি যেন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন এবং যত দ্রুত সম্ভব আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
অভিযোগপত্র জমা না হওয়া পর্যন্ত আদালতে তারিখের পর তারিখ পড়ছে। অভিযুক্ত পক্ষ জামিনের আবেদন করছে, আর আমরা তা ঠেকানোর চেষ্টা করছি। আমার বাবা বাদী হওয়ায় তাকেই বারবার আদালতে যেতে হচ্ছে। তার বয়স হয়েছে। আমার শরীরও এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ফলে এই প্রক্রিয়া আমাদের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

দুর্ঘটনার পর আমি দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলাম। এখন দাঁড়াতে ও হাঁটতে পারি, কিন্তু মুখের ক্ষত ও শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য আরও সময় প্রয়োজন। আমাকে বেশির ভাগ সময় বাসায় থাকতে হচ্ছে। হাসপাতাল আর বাসা এর বাইরে কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। এই অবস্থায় আদালতে বারবার যাওয়া ও মামলার পেছনে সময় দেওয়া আমার জন্য আরও কঠিন।
ঢাকা পোস্ট: বনানী থানার সামনে আপনি অবস্থান কর্মসূচি করেছিলেন। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে কী বলা হয়েছে?
মেঘলা মুক্তা: আমি যখন মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠলাম, তখন দেখলাম, আমার বাবা নিয়মিত আদালতে যাচ্ছেন। অভিযুক্ত পক্ষ জামিন চাইছে, আর তিনি জামিন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। আমি নিজে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আদালতে যেতে পারছিলাম না। বাবার কষ্টটাও আমার কাছে খুব বড় হয়ে উঠেছিল।
যে গাড়ি আমাকে ধাক্কা দিয়েছে, সেই গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিই। এক রাতে জানতে পারি, পরদিন আবার গাড়ি ও চালকের জামিনের আবেদন করা হবে। তখন রাত সাড়ে ১২টার দিকে সিদ্ধান্ত নিই, পরদিন বনানী থানার সামনে যাব। আমি থানার ভেতরে না গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আমার বক্তব্য তুলে ধরি।
সাংবাদিকেরা তখন থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে শুনেছেন, তবে কাগজপত্র তখনো হাতে পাননি। তিনি বলেন, কাগজপত্র পেলে আদালতে জমা দেওয়ার মতো খুব বেশি কাজ বাকি থাকবে না।
আমি তাকে জানিয়েছি, আমাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগেই জমা দেওয়া হয়েছে। আরও কিছু প্রয়োজন হলে দিতে প্রস্তুত আছি। আমি চাই, তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুন এবং দ্রুত অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। এতে অন্তত আমাদের হয়রানি কমবে।
ঢাকা পোস্ট: আপনি কি মনে করেন, শুরু থেকেই পুলিশ আন্তরিক হলে এত দূর গড়াত না?
মেঘলা মুক্তা: অবশ্যই। আমি আইসিইউতে থাকা অবস্থায়ও চাইলে গাড়িটি আটক করা সম্ভব ছিল। ১ সেপ্টেম্বর অভিযোগ করার পর ৩ সেপ্টেম্বর গাড়ি আটক করা গেলে ২৮ জুলাইয়ের অভিযোগের পরও তা করা যেত। আমার পরিবারকে জানানো যেত, গাড়ি আটক করা হয়েছে, তদন্ত চলছে। এতে আমাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি মিলত।
ইমতিয়াজসহ আমার বন্ধু ও সহকর্মীরা দুর্ঘটনার পরপরই থানায় গিয়েছিলেন। তিনি বাদী হয়ে অভিযোগও করেছিলেন। তখন তদন্ত কর্মকর্তা ফোন করে আমার বক্তব্য নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আমরা ভেবেছিলাম, পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। কেউ তখন ভাবেনি, পরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
কিন্তু যখন দেখলাম, দিনের পর দিন পার হচ্ছে, আমার বক্তব্য নেওয়া হচ্ছে না, অভিযোগ নিবন্ধিত হয়নি, তখন সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ২৮ জুলাইয়ের অভিযোগের পর যদি যথাযথভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হতো, তাহলে এত দিন লাগার কথা নয়।
৩৪ দিন পর গাড়ি ও চালক আটক করার বিষয়টিও আমার কাছে প্রশ্ন তৈরি করেছে। আটক ব্যক্তিই প্রকৃত চালক কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া দরকার। এত দেরির কারণ কী, কেন শুরুতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা চাই।
ঢাকা পোস্ট: পুরো ঘটনায় দেশের আইনব্যবস্থা নিয়ে আপনার কী উপলব্ধি হয়েছে?
মেঘলা মুক্তা: আমার মনে হয়েছে, বিচার পেতে পেতে মানুষ মরে যাবে। বেঁচে থাকলে বিচার পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর লড়াই করতে হবে। আমাদের দেশে বিচারব্যবস্থা অনেক ধীরগতির। একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এর মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন পেয়ে যেতে পারেন। আপনি কতবার জামিন ঠেকাবেন? একসময় হয়তো জামিন হয়ে যাবে, গাড়ি ছাড়া পাবে। পরে সেই গাড়ি অন্য কারও দুর্ঘটনার কারণও হতে পারে।
কখনো কখনো মনে হয়, আমি যদি মারা যেতাম, তাহলে হয়তো বিচারটা দ্রুত হতো! আমি বেঁচে আছি বলেই নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু এই লড়াইও যেন মৃত্যুর মতো কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
আমি শুধু নিজের কথা বলছি না। আমার মতো অন্য কেউ যেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হন, সেটাও চাই। একজন মানুষ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তার পরিবারকে চিকিৎসা, মানসিক চাপ ও মামলার দীর্ঘ প্রক্রিয়া সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। তার ওপর যদি তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে ভুক্তভোগী আরও অসহায় হয়ে পড়েন।
ঢাকা পোস্ট: এত কিছুর পরও কি আপনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন?
মেঘলা মুক্তা: আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে গেলে আরও অনেক সময় দিতে হবে। প্রয়োজনে উচ্চ আদালতেও যেতে হতে পারে। কিন্তু আমার নিজের শরীরের অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে। আমি এখনো সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। মুখের ক্ষত সারানো, স্বাভাবিক জীবনে ফেরা এবং কাজে ফিরে আসার প্রস্তুতি নেওয়া এসবও আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আমি যদি শুধু এই মামলা নিয়ে লড়াই করতে থাকি, তাহলে নিজের জীবন ও সুস্থতার জন্য সময় পাব না। অথচ এই দুর্ঘটনার কারণে আমার জীবনের অনেক কিছু থেমে গেছে। আমি চাই, দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে যাক, যাতে আমাকে আর এতটা হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
আমার ক্ষোভটা মূলত এই জায়গায় ২৮ জুলাইয়ের অভিযোগের পর যে কাজগুলো দ্রুত করা সম্ভব ছিল, সেগুলো কেন করা হলো না? ১ সেপ্টেম্বর নতুন করে অভিযোগ করার পর যে গতিতে গাড়ি আটক করা হলো, সেই উদ্যোগ শুরু থেকেই নেওয়া হলে হয়তো আমাকে আজ এতটা ভুগতে হতো না।
হয়তো আমাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে লিখতে হতো না, থানার সামনে দাঁড়াতে হতো না, দেশের আইনব্যবস্থা নিয়ে এতটা হতাশা প্রকাশ করতে হতো না। আমি চাই, আমার অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা হোক এবং আমি ন্যায়বিচার পাই।