Image description

ইদানীং ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ বলে একটা শব্দবন্ধ আলোচনায় এসেছে, শুদ্ধ বাংলায় বলতে গেলে যা ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ’। তবে আমাদের বাংলাদেশে ইংরেজিটাই বেশি চলে, বেশি বলা হয়। হয়তো তাতে ফ্যাসিবাদের প্রকট ভাব বোঝানোও সহজ হয়। অবশ্য এটা আবার এক সময়কার ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকার ফলও হতে পারে!

 

সে যাক। আমাদের মূল আলোচনা ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ নিয়েই শুধু। বর্তমানে এ দেশে বহুল প্রচলিত এই ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ আসলে কী–সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অতীব প্রয়োজন। কারণ, এর আগে যেমন গণহারে ‘ফ্যাসিস্ট’ অভিধা দেওয়ার চল চালু হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এখন বেশি শোনা যাচ্ছে ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ বা ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’ অভিধাগুলো। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম–সবই সরগরম। তাই কালচারাল ফ্যাসিজমের শিকড় খোঁজার পাশাপাশি বোঝা দরকার, এ বৈশিষ্ট্য বিশ্বের কোথায় কোথায় দেখা গেছে? কখন দেখা গেছে? দেখা দেয়ই বা কীভাবে?

 

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কালচারাল ফ্যাসিজম বা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ হলো সংস্কৃতির কোনো উপাদানকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদের প্রচার ও প্রসার করা। অর্থাৎ, সংস্কৃতির সেই উপাদানটি তখন ফ্যাসিবাদের একটি অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। সাংস্কৃতিক মোড়কে প্রচার করে যায় ফ্যাসিবাদের আদর্শ। এটি মানুষকে ফ্যাসিবাদী ধারণায় আকৃষ্ট করতে একটি ‘গুপ্ত’ উপায় হিসেবে কাজ করে। কারণ সংস্কৃতির আওতার মধ্যে আসলে অনেক কিছুই পড়ে। একটি গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের পুরো জীবনযাপনটাই সংস্কৃতির অংশ হিসেবে কাজ করে। তাই কথা, ভাষা, গান, সাহিত্য, বক্তৃতা, লেখা–সবকিছুই সমষ্টিগতভাবে সাংস্কৃতিক রূপে দেখা দেয়। এখন এসব উপাদানের যে কোনোটিকে ব্যবহার করেই ফ্যাসিবাদের প্রচার চালানো সম্ভব, এমনকি ফ্যাসিবাদের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করাও সম্ভব।

ফ্যাসিজমের কথা বলতে গেলেই গত শতকের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ইতালি ও জার্মানির কথা আসে। কারণ, ওই বিন্দু থেকেই ফ্যাসিবাদের আনুষ্ঠানিক আলাপের শুরু। যদিও ওই কাল তিরোহিত হয়েছে বেশ আগে। কিন্তু রেশ থেকে গেছে। ফ্যাসিবাদের ধরন এখন বদলেও গেছে বেশ। ফলে এই একুশ শতকে এসে ফ্যাসিবাদ খুঁজতে ও চিহ্নিত করতে বেশ গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। ঠিক যেভাবে ‘গুপ্ত’ রাজনৈতিক ধারাকে চিহ্নিত করতে ঘাম ছুটে যায়, ঠিক সেরকমই। কারণ ফ্যাসিবাদীরা এখন বহিরাবরণে ছদ্মবেশী বা বহুরূপী সাজতে বেশি ভালোবাসে। আর এতে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোই।

 

১৯৭০–এর দশকে মার্কস-লেনিনবাদে দীক্ষিত একটি প্রকাশনা ছিল, যার নাম–ওয়ার্কারস ভিউপয়েন্ট। প্রথমে জার্নাল হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরে এটি ক্রমে পত্রিকায় রূপ নেয়। এর ১৯৭৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত সংখ্যার দ্বিতীয় ভলিউমে ‘স্ট্রাগল অ্যাগেইনস্ট ফ্যাসিস্ট আইডিওলজি’ শিরোনামে একটি লেখা ছিল। তাতে বলা হয়েছে, দুটি শ্রেণি ও দুটি মতাদর্শের মধ্যকার সংগ্রামের একটি অংশ হলো সব ধরনের শিল্প ও সংস্কৃতি। অর্থাৎ, যে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণের সঞ্চার করে, সেটিরও শ্রেণি চরিত্র আছে এবং সেগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষারই চেষ্টা চালিয়ে যায়।

 

একই ধরনের মত দিয়েছেন ট্রটস্কি ও লিউ শাও-চি। এই সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিকেরা মনে করেন, শুধুই শিল্প বা সংস্কৃতির স্বার্থে কোনো শিল্প বা সংস্কৃতির সৃষ্টি হয় না। একেকটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে শিল্প ও সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে থাকে। এটি যেমন নিজেদের শ্রেণিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে, ওই নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য ‘মর্যাদাপূর্ণ ভাবমূর্তি’ তৈরি করে তুলতে চায়, তেমনি বিদ্যমান শত্রুপক্ষ বা শত্রুপক্ষীয় শ্রেণিকে অপমান করতে এবং ঘৃণা ছড়াতেও ব্যবহৃত হয়। এসবের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো, ওই নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে শাসনক্ষমতাকে সুসংহত করা। এজন্য শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান যেমন ‘এসকেপ রিয়েলিটি’ তৈরিতে কাজ করে, তেমনি প্রয়োজন হলে নির্মাণ করে ‘ফলস রিয়েলিটি’। আর শিল্প ও সংস্কৃতি রাজনীতির ছায়ায় থাকলেও এটি রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে প্রচণ্ডভাবে।

প্রশ্ন হলো, সেই গত শতকের সত্তরের দশকেই যদি কালচারাল ফ্যাসিজমের বৈশিষ্ট্য এতটা বৈচিত্র্যময় হয়ে থাকে বলে বোধ হয়, তাহলে একুশ শতকে এআই যুগে অবস্থাটা কী? এক কথায় উত্তর–অবস্থা সঙিন। কারণ, ফ্যাসিবাদ যে রূপে গত শতকে আবির্ভূত হয়েছিল, সেই রূপ বিবর্তিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। এতটাই যে, গণতন্ত্রের উৎকর্ষে থাকার দাবি করা এবং অন্যান্য দেশকে গণতন্ত্রের ছবক দেওয়া দেশগুলোর শাসনব্যবস্থা ও আচরণেও ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে। এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় আসা গোষ্ঠীগুলোই সেসব ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপে হাওয়া দিচ্ছে। ফলে ফ্যাসিবাদ এখন আক্ষরিক অর্থেই বহুরূপী চরিত্রে সার্থক ভূমিকা রাখতে সমর্থ হচ্ছে।

 

কালচারাল ফ্যাসিজমের শুরু কোথায়?

বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যাবে, পুরো শতকেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সুনির্দিষ্ট সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফ্যাসিবাদের উত্থানের পথ তৈরি করে দিয়েছে। প্রধানত, বিশ শতকজুড়ে বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংকট চরম হয়ে ওঠার কারণে ফ্যাসিবাদী শাসন শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে।

 

বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালি ও জার্মানিতে জাতীয় সংকট (অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক) ঘনীভূত হওয়ায় সাধারণ জনতা বিকল্প খুঁজতে থাকে। আর সেই সুযোগেই আবির্ভূত হয় ফ্যাসিবাদী আদর্শ। জনগণকে স্বপ্ন দেখায় গৌরবের রাষ্ট্র নির্মাণের। আর তাতে আকৃষ্ট হয়ে দেশের ভবিষ্যৎ ফ্যাসিবাদীদের হাতে তুলে দেয় জনতা। আর ক্ষমতা কাঠামোতে খানিক স্থান পেয়েই তা সুসংহত করতে উঠেপড়ে লাগে ফ্যাসিবাদীরা। এমন এক নাগপাশ রচনা করা হয়, যা থেকে সবার মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

 

ফ্যাসিজমের পাশাপাশি কালচারাল ফ্যাসিজমের উদাহরণ দিতে গেলেও ফিরে যেতে হয় সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েই। ইতালি ও জার্মানিও আসে। কারণ, ফ্যাসিবাদের শাসনে থাকার সময়টায় এই দুই দেশেই কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রসার লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ইতালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী শাসনের অনুরাগী একটি বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী মহলও গড়ে উঠেছিল। ফলে শিল্প, সাহিত্য, সিনেমায় একটি ফ্যাসিস্ট চিন্তাধারার সৃষ্টি হয়েছিল।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি ও জার্মানির পরাজয়ের পর সংস্কৃতি খাতে ফ্যাসিবাদী ধারণা দূর করতে কিছু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে। যেমন: জার্মানি দুই ভাগ হওয়ার পর ইস্ট জার্মানির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর ওয়েস্ট জার্মানির নিয়ন্ত্রণে ছিল মূলত আমেরিকা। তো দুই অংশেই শুরু হয়েছিল ‘রিএডুকেট’ কার্যক্রম। এটি করা হয়েছিল কালচারাল ফ্যাসিজমকে ঠেকাতেই। তবে জার্মানির দুই অংশে উদ্দেশ্য দুই রকম ছিল।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জার্মানির কালচারাল ফ্যাসিজম মোকাবিলা বিষয়ে একটি নিবন্ধ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে। মায়া ফিলিপসের লেখা ‘ফেইলিওর টু রিএডুকেট: পারপেচুয়েশনস অব কালচারাল ফ্যাসিজম ইন পোস্ট-ওয়ার জার্মানি’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইস্ট জার্মানিতে মূলত নাৎসিবাদ ও নব্যফ্যাসিবাদের মোড়ক হিসেবে ধরে পশ্চিমা পুঁজিবাদকে ঠেকানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল সরকারিভাবে। কারণ, ওই অংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। অন্যদিকে ওয়েস্ট জার্মানিতে যেহেতু নিয়ন্ত্রণে ছিল আমেরিকা, তাই ফ্যাসিজমের সাথে সাথে কমিউনিজমকে ঠেকানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছিল। অর্থাৎ, স্নায়ুযুদ্ধের একটি রেশ বেশ ভালোভাবেই ছিল দুই জার্মানিতে। যদিও এ ধরনের কার্যক্রমে সফলতা পুরোপুরি আসেনি কখনো। ফলে জার্মানিতে কালচারাল ফ্যাসিজম রয়েই যায়। শুধু টিকে থাকাই নয়, বরং কালচারাল ফ্যাসিস্ট হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা জার্মান সংস্কৃতির নেতৃত্বেও এসে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই। এতে জার্মান সংস্কৃতি আর ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি কখনো। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রাজনীতিবিদেরা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে পুরো পশ্চিমেই নব্যফ্যাসিবাদের উত্থান তীব্র হয়ে উঠছে এবং এই বাস্তবতায় জার্মানির ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিও নতুন রঙে রঙিন হয়ে উঠছে

 

ইতালিতে কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন ছিল। যুক্তরাজ্যের সোয়ানজি ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদেরা এ নিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক নিবন্ধ লিখেছেন। ‘হোয়াট ওয়াজ দ্য ইমপ্যাক্ট অব ফ্যাসিস্ট রুল আপন ইতালি ফ্রম নাইন্টিনটুয়েন্টিটু টু নাইন্টিনফোরটিফাইভ?’ শীর্ষক এই নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইতালিতে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো সংবাদ ও প্রোপাগান্ডায় মনযোগ দিয়েছিল বেশি। ফ্যাসিবাদের সমালোচনা নিষিদ্ধ করেছিল। এগুলো হিটলারের জার্মানিও করেছিল বটে। তবে জার্মানির মতো সাহিত্যিক লেখা, থিয়েটার বা বাণিজ্যিক সিনেমার কনটেন্টেও ফ্যাসিবাদী চিহ্ন ঢোকানোর মরিয়া চেষ্টা করেনি ইতালি, অন্তত ১৯৩০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত। জনসাধারণের জন্য ওই সময় কিছু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, প্যারেড ইত্যাদির আয়োজন করা হতো। এবং এসবের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদী চেতনা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতো। অবশ্য সিনেমা হলগুলোতে ফ্যাসিবাদী ভাবধারার সংবাদমূলক ভিডিও বা প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হতো। হয়তো ইতালির সমৃদ্ধ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী সরকারের এমন কিছুটা ঢিলেঢালা কর্মকাণ্ডের কারণ হতে পারে। ফলে ইতালিতে কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রভাবের গভীরতার মাত্রা নিয়ে কিছুটা সংশয় থেকে গেছে।

 

ইতালি ও জার্মানি–দুই দেশেই কালচারাল ফ্যাসিজমের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রোপাগান্ডাকে। আর প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্যই সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানকে ব্যবহার করা হতো। সেক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক মোড়ককে খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যবহারের প্রবণতা কিছুটা কম ছিল। বরং খানিকটা স্থূলভাবে শুধু প্রপাগান্ডা চালানোর দিকেই আগ্রহ ছিল বেশি। সাংস্কৃতিক উপাদানকে ফ্যাসিবাদের প্রসারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের দিক থেকে ইতালির তুলনায় জার্মানি এগিয়েও ছিল বেশ। এতটাই যে, এখনো সেই প্রভাব রয়ে গেছে।

 

এক্ষণে, দুই দেশের পুরনো দিনের কালচারাল ফ্যাসিজমের উদাহরণ আমাদের জানা হলো। এখন না-হয় ফেরা যাক একুশ শতকে।

 

কালচারাল ফ্যাসিজমের চেহারা এখন কেমন?

সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে স্প্রিঙ্গার নেচারে। শিরোনাম হলো–‘ফ্যাসিস্ট কালচারাল প্র্যাকটিসেস ইন দ্য টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’। গবেষণাটি করেছেন ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব পারা-এর ইমানুয়েল জাগুরি তোরিনো, ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের আইএসইউ বরবা ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটির ট্রেসি এম সিহান। এই তিন গবেষক মিলে একুশ শতকের কালচারাল ফ্যাসিজমের প্রকৃতি এবং এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন।

 

এই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ফ্যাসিবাদ বলতে এমন রাজনৈতিক আচরণকে বোঝানো হয়, যেটি প্রধানত গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রত্যাখানের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ফ্যাসিবাদের অন্যতম কাজ হলো কোনো জাতীয় সংকটকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা, শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে সহিংস দমননীতি ব্যবহার করা এবং সাধারণভাবে বিজ্ঞান ও যৌক্তিকতাকে প্রত্যাখান করা। এর বৈশিষ্ট্যগুলোর আওতা অনেক বিস্তৃত এবং এখনকার একুশ শতকের সমাজগুলোয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী আচরণের দৃশ্যমানতা অনেক বেড়েছে।

 

গবেষকেরা বলছেন, এই ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক আচরণ নানা ধরনের হয়। এগুলোর মধ্যে কিছু থাকে ম্যাক্রোবিহেভিয়ার। মূলত এসব আচরণের ভিত্তিতেই নির্মাণ হয় একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, যা ফ্যাসিবাদের পক্ষে কাজ করে।

 

দুনিয়ার অনেক সমাজেই এখন ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক কার্যাবলী পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি মাঝে মাঝে এসব প্রতিষ্ঠানের কালচারাল ফ্যাসিজম চালানোর বিষয়টি চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে যায়। যখন একটি সমাজের একজন ব্যক্তিও ফ্যাসিবাদী আচরণ শুরু করে, তখন এই ফ্যাসিস্ট ট্যাগ সাধারণত অনেকের বিরুদ্ধেই ব্যবহার হতে থাকে। সেই সাথে বাড়তে থাকে ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। এই কালচারাল ফ্যাসিজম তখন আর্থিকভাবে অভিজাত লোকজন এবং যারা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন, সেইসব মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং, সাধারণত যেটিকে ফ্যাসিবাদ বলা হয়ে থাকে, সেটি তখন এক ধরনের যূথবদ্ধ আচরণ হিসেবে সমাজে দেখা দেয়। এবং এটি এক ধরনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবেও আবির্ভূত হয়। কখনো কখনো এসব ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক আচরণগুলো প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্মকেও নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। সব মিলিয়ে কালচারাল ফ্যাসিজমে অনেক মানুষের জীবন আক্রান্ত হতে থাকে। এসময় ধীরে ধীরে কালচারাল ফ্যাসিস্টরা সহিংসতায় সংশ্লিষ্ট হতে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে। এভাবেই দমনমূলক নীতির ব্যবহার বাড়তে থাকে ক্রমে।

 

গবেষকেরা বলছেন, ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক চর্চার ঢেউ বর্তমান বিশ্বে বেশ পরিচিত একটি ধারা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু দেশকে এক্ষেত্রে হয়তো সরাসরি চিহ্নিত করা যাচ্ছে এখন পর্যন্ত, যেমন: যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল বা তুরস্ক। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার বিষয়ে প্রবল আলোচনা বিদ্যমান। কারণ ট্রাম্প এমন কিছু কাজ করেছেন, যাতে একটি নির্দিষ্ট বিপক্ষ শ্রেণিকে একেবারেই আলাদা ও কোণঠাসা করে ফেলার প্রবণতা আছে। যেমন: একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘শত্রু’ ঘোষণা করা, বিভিন্ন বিপরীত ঘরানার আদর্শের শিক্ষাবিদ ও সংবাদমাধ্যমগুলোকে গণহারে ‘ফেক নিউজ’ বলা, নারীবিরোধী বক্তব্য দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। একই বৈশিষ্ট্য দেখা যাবে তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বোলসোনারোর শাসনব্যবস্থায়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে ভারতে যেসব বৈশিষ্ট্য স্বাভাবিক হয়ে উঠছে ক্রমে, সেগুলোও ফ্যাসিবাদী ঘরানার। ভারত ক্রমে কেবলই হিন্দুদের হয়ে উঠছে বলে বারবারই সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা। এভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যদি কোনো দেশে মানসিকভাবেই নিজেদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ হিসেবে ভাবতে শুরু করে, তাহলে বুঝতেই হয় যে, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে সেখানে। তবে এসব কিছু হাতেগোণা দেশ বাদে অন্যান্য দেশেও ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক আচরণের কোনো কোনোটি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। হয়তো সব আচরণ একসাথে দেখা দিচ্ছে না। কিন্তু কোনো কোনো বৈশিষ্ট্য প্রবল হয়ে উঠছে।

 

ফলে এটুকু বলাই যায় যে, একবিংশ শতাব্দীতে পুরো বিশ্বে কালচারাল ফ্যাসিজমের নানামাত্রিক বিস্তার পরিলক্ষিত হচ্ছে। কোথাও এক, কোথাও একাধিক, আবার কোথাও বহু ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য আবির্ভূত হচ্ছে। এসবকে সরাসরি চিহ্নিত করাও ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। তাই বর্তমানের বৈশ্বিক বাস্তবতায় কালচারাল ফ্যাসিজম যে এক ধরনের প্রবল ধোঁয়াশার সৃষ্টি করছে, সেটি একপ্রকার নিশ্চিতই।

 

লেখক:

অর্ণব সান্যাল

বার্তা সম্পাদক, চরচা