চলতি অর্থবছরের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া অনুদান ঘিরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জন্ম নিয়েছে তীব্র অসন্তোষ। আছে নানা প্রশ্নও। এবার দেশের অন্যতম পথিকৃৎ নাট্যদল আরণ্যককে মাত্র ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা অনুদান দেওয়ার ঘটনা সৃষ্টি করেছে বিস্ময়ের। একইভাবে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক চলমান থাকলেও সংগঠনটিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা অনুদান।
সংস্কৃতিকর্মীরা জানতে চান— কোন নীতিমালা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে এই অনুদান বণ্টন করা হলো? কারা তৈরি করেছেন এই তালিকা? রাষ্ট্রীয় অনুদান বণ্টনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের দাবি তাদের।
এ বিষয়ে তাদের কাছে বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছেন বলে আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আগের ধারাবাহিকতা থেকে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। কিছু ত্রুটি রয়েছে, আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করব। আগামী অর্থবছরে যেন আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য উপায়ে অনুদান বরাদ্দ নিশ্চিত করা যায়, সে চেষ্টা থাকবে। এ বিষয়ে দেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের পরামর্শও নেওয়া হবে।’
কারা কত পেলেন
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা মহানগর ও জেলার ১৯৪টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে মোট ১ কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা অনুদান বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা পেয়েছে ১২ লাখ ৩৫ হাজার। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার পেয়েছে ৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা।
এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ (আইটিআই) পেয়েছে দেড় লাখ টাকা। আরণ্যকসহ ৬২টি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৩৬ হাজার টাকা করে। বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসহ ১৫টি সংগঠন পেয়েছে ৪০ হাজার টাকা করে। দেশনাটক, স্বপ্নদল, বাংলাদেশ থিয়েটার ও নাট্যতীর্থসহ ৯টি নাট্যদল পেয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা করে। ঢাকা পদাতিকসহ ৯টি সংগঠন পেয়েছে ৫৯ হাজার টাকা করে। থিয়েটার আর্ট ইউনিট, জাগো আর্ট সেন্টারসহ ৩৭টি সংগঠন পেয়েছে ৬৯ হাজার টাকা করে। এছাড়া দুটি দলকে ৯৯ হাজার, পাঁচটি দলকে ৯৪ হাজার, পাঁচটি দলকে ৮০ হাজার, সাতটি দলকে ৭৯ হাজার এবং ১০টি দলকে ৮৯ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে।
তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ
বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের অভিযোগ, সংগঠনটিসহ দেশের অন্তত ১৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে এ বছর সরকারি অনুদান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কোনো কারণ জানানো হয়নি। অথচ এসব সংগঠন নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট ক্ষোভ প্রকাশ করে আগামীর সময়কে জানাচ্ছিলেন, ‘এবার অনুদান তালিকা থেকে বহু সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’ তার ধারণা, সারাদেশে অন্তত শতাধিক সংগঠন এবার অনুদান পায়নি। এর কোনো লিখিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি।
গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ প্রকাশিত প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী, অনুদান না পাওয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে— বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, মিরপুর সাংস্কৃতিক একাডেমি, বর্ষা উৎসব উদযাপন পরিষদ, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, উজান, পঞ্চভাস্কর, মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়, উঠোন, ভোরের পাখি নৃত্যকলা কেন্দ্র, নৃত্যাঙ্গন, দৃশ্যকাব্য, ঝংকার ললিতকলা একাডেমি, আদি ঢাকা সাংস্কৃতিক জোট, রংধনু শিল্পী সংঘ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, স্বাত্বিক নাট্য সম্প্রদায় এবং কাব্য বর্ষণ।
হতাশ নাট্যকর্মীরা
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে নিয়মিত নাট্যচর্চা করে আসছে আরণ্যক নাট্যদল। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ‘সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে অনুদান’ কর্মসূচির আওতায় দীর্ঘদিন ধরেই তারা সরকারি অনুদান পেয়ে এসেছে।
নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার মন্তব্য করেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদানের তালিকা দেখে বিস্মিত হয়েছি। আরণ্যকের মতো একটি দল পেয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার টাকা। অথচ অনেক কার্যক্রমহীন দল পেয়েছে লাখ টাকার বেশি। আমাদের দল বটতলার অনুদানও গত বছরের তুলনায় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন, তা জানি না। আমাদের কার্যক্রম কি কম? গত এক বছরে কোনো কার্যক্রম নেই— এমন অনেক দলও অনুদান পেয়েছে। তারা কীভাবে অনুদান পায়, সেটিই প্রশ্ন।’
নাট্যদল ‘অনুস্বর’-এর প্রধান মোহাম্মদ বারীর ভাষ্য, ‘অনুস্বর প্রতিষ্ঠার পর গত ৬ বছরে ১২টি নাটক মঞ্চে এনেছে। প্রতিষ্ঠা করেছে একটি স্টুডিও। এটি গড়ে প্রতিবছর সর্বাধিক নাটক মঞ্চস্থ করা একটি দল। অথচ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক অনুদানের বরাদ্দ তালিকায় অনুস্বরের নাম নেই। কোন বিবেচনায় বরাদ্দ তালিকা থেকে দল বাদ পড়ল জানতে চাই।’ এই অন্যায্য বরাদ্দ তালিকা বাতিল করে সঠিক নীতিমালা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার করার জোর দাবি জানান তিনি।
এবার অনুদান পায়নি নাট্যদল থিয়েটার ফ্যাক্টরি। দলটির প্রধান অলোক বসু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এই বৈষম্যের অবসান চেয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘ভুল হতে পারে। কিন্তু ভুল আঁকড়ে থাকা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করা কখনোই মঙ্গল বয়ে আনে না।’
অন্যদিকে থিয়েটার আর্টিস্টস এসোসিয়েশন অব ঢাকাকেও (টাড) এ বছরের বার্ষিক অনুদান দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনটি বরাদ্দ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে টাড বলেছে, ‘ঢাকার থিয়েটার শিল্পীদের কল্যাণে নিবেদিত সংগঠন হিসেবে আমরা নিয়ম অনুযায়ী অনুদানের আবেদন করেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো বরাদ্দ পাইনি।’
২০২৪ সালের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করে টাড। সংগঠনটির দাবি, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকার থিয়েটার শিল্পীদের অধিকার রক্ষা, কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং সদস্যদের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমন একটি সংগঠনকে অনুদান তালিকার বাইরে রাখা শুধু হতাশাজনক নয়, বরং থিয়েটার শিল্পীদের অবদানকেও অবমূল্যায়ন করার শামিল।
আরণ্যকের প্রত্যাখ্যান
অনুদান বরাদ্দে অসন্তোষ জানিয়ে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের কাছে চিঠি দিয়েছেন আরণ্যকের প্রধান সম্পাদক হারুন রশীদ এবং প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রশীদ। তারা বরাদ্দ নিতে অপারগতার কথা জানিয়েছেন।
আরণ্যক চিঠিতে বলেছে, ‘দেশের শীর্ষস্থানীয় এবং নিয়মিত নাট্যচর্চাকারী সংগঠন হিসেবে আরণ্যক স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্বপূর্ণ দাবিদার। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময় ও হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আরণ্যক নাট্যদলের জন্য মাত্র সাড়ে ৩৬ হাজার টাকা অনুদান বরাদ্দ করা হয়েছে। এই বরাদ্দ কেবল অপ্রতুলই নয়, বরং আরণ্যকের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সাংস্কৃতিক অবদান, ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় নাট্য আন্দোলনে তার অনন্য ভূমিকার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কার্যত আরণ্যককে নবীন নাট্যদলের ক্যাটাগরিতে ফেলে এই অনুদান ঠিক করা হয়েছে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, নাট্যচর্চায় অনিয়মিত অনেক সংগঠন যেখানে এক লাখ টাকারও বেশি অনুদান পেয়েছে, সেখানে দেশের অন্যতম প্রবীণ ও সক্রিয় নাট্যদলের জন্য এমন নামমাত্র বরাদ্দ অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।’
চিঠিতে অনুদান নীতিমালা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আরণ্যক। বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; এটি শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি রাষ্ট্রের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতির প্রতিফলন। সেই বিবেচনায় এবারের বরাদ্দ আরণ্যক নাট্যদলের যথাযথ মূল্যায়নকে প্রতিফলিত করে না। তাই আমরা বিনয়ের সঙ্গে এই অনুদান গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে অনুদান প্রদানের নীতিমালা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং নির্ধারিত মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছি। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত মূল্যায়নের স্বার্থে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা অত্যন্ত জরুরি।’
সাহিত্য একাডেমিও পায়নি অনুদান
শুধু রাজধানী নয়, ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন অনুদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ। চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতিচর্চায় নেতৃত্ব দিচ্ছে সাহিত্য একাডেমি। বিগত বছরেও সংগঠনটি ৫৯ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে। তবে এবার অজানা কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘গত বছরও আমরা অনুদান তালিকায় ছিলাম। এবার কেন রাখা হলো না, সেটাই জানতে চাই। অনুদানের অর্থ খুব বেশি নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া এই অর্থ এক ধরনের স্বীকৃতি। এজন্যই এটা পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।’
ফেডারেশনের অনুদান পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের নেতৃত্বের বৈধতা, সাংগঠনিক সংকট এবং সরকারি অনুদান বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের কাছে ২৫ জুন চিঠি দিয়েছেন নাট্যব্যক্তিত্ব ও ফেডারেশনের সাবেক চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ। চিঠির একটি অনুলিপি আগামীর সময়ের হাতে এসেছে।
চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, ফেডারেশনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে একটি পক্ষ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে বর্তমান নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। এই পরিস্থিতিতে ফেডারেশনকে দেওয়া ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সরকারি অনুদান গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জানান বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে অনুদান বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং বরাদ্দ পুনর্মূল্যায়নের দাবি।