Image description

পবিত্র ঈদুল আজহা ত্যাগ, তাকওয়া, পরিচ্ছন্নতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় বিধান, মানবিক আচরণ, স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশ সচেতনতার বিষয়ও। তবে প্রতি বছর কুরবানির সময় অসচেতনতা, তাড়াহুড়া এবং সঠিক নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক সাধারণ বিষয়ও ভুল হয়ে থাকে। এসব ভুল শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও ক্ষতিকর হতে পারে।

 

 

এ লেখায় কুরবানির সময় বৈজ্ঞানিকভাবে ক্ষতিকর এমন কিছু সাধারণ ভুল ও তার সঠিক দিকগুলো নিয়ে চ্যানেল 24 অনলাইনের পাঠকদের জন্য লিখেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএস অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ও ডা. তাহিরুল হাসান ফাহিম।

➤ জবাইয়ের সময় যেসব ভুল বেশি দেখা যায়:
কুরবানির অন্যতম বড় ভুল হলো শরিয়তসম্মত জবাই পদ্ধতি অনুসরণ না করা। অনেক সময় ধারালো ছুরি ব্যবহার করা হয় না, পশুকে অতিরিক্ত কষ্ট দেয়া হয় কিংবা এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা হয়। অথচ ইসলাম পশুর প্রতিও সদয় আচরণের শিক্ষা দেয়। হাদিসে উত্তমভাবে ও কষ্ট কমিয়ে জবাই সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

 

আরেকটি প্রচলিত ভুল হলো, জবাইয়ের পর পশুর পুরোপুরি প্রাণ বের হওয়ার আগেই চামড়া ছাড়ানো বা শরীরে কাটাকাটি শুরু করা। কেউ কেউ দ্রুত প্রাণ বের করার জন্য গলার স্থানে বা মেরুদণ্ডে ধারালো ছুরির আগা দিয়ে আঘাত করেন। সমাজে এটি বহুদিনের প্রচলিত একটি ভুল পদ্ধতি।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে, জবাইয়ের স্থানে অতিরিক্ত আঘাত করলে পশুর স্পাইনাল কর্ড বা মেরুরজ্জুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এতে পশু স্বাভাবিকভাবে রক্তক্ষরণে মারা না গিয়ে আকস্মিক শক বা হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়ার ব্যাঘাতে মারা যেতে পারে। ফলে শরীর থেকে স্বাভাবিকভাবে রক্ত বের হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং মাংসে জমাট রক্ত থেকে যায়। এতে মাংসের গুণগত মান কমে যেতে পারে এবং সংরক্ষণ ক্ষমতাও হ্রাস পায়।

➤ জবাইয়ের সঠিক উপায়:
সঠিক পদ্ধতি হলো পশু জবাইয়ের পর কিছু সময় অপেক্ষা করা এবং স্বাভাবিকভাবে রক্ত বের হতে দেয়া। পশুর প্রধান রগগুলো সঠিকভাবে কেটে দিলে ধীরে ধীরে শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে আসে এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যু সম্পন্ন হয়। এতে কুরবানিও সঠিকভাবে আদায় হয় এবং মাংসও তুলনামূলক নিরাপদ থাকে। এ জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কুরবানির জন্য জবাইয়ের পর পশুর শরীর থেকে পর্যাপ্ত রক্ত বের হওয়ার সুযোগ দেয়া জরুরি। এতে মাংস খাওয়ার উপযোগী ও তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত থাকে।

➤ গরম মাংস সংরক্ষণের ভুল:
কুরবানির পরপরই গরম গরম মাংস রান্না করে খাওয়ার প্রবণতা আমাদের সমাজে খুব সাধারণ বিষয়। আবার অনেকে তাড়াহুড়া করে গরম মাংস পলিথিনে ভরে বা স্তূপ করে রাখেন, যা বড় ধরনের ভুল।

বৈজ্ঞানিকভাবে, জবাইয়ের পর মাংস কিছু সময় ঠান্ডা পরিবেশে রাখা বা ‘চিলিং’ করা উত্তম। সাধারণভাবে গরু বা খাসির মাংস অন্তত ৬ ঘণ্টা ঠান্ডা পরিবেশে রাখা ভালো বলে মনে করা হয়। এতে মাংস ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়, নরম হয়, স্বাদ উন্নত হয় এবং ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির ঝুঁকি কমে।

 

অন্যদিকে গরম অবস্থায় মাংস প্যাকেট বা স্তূপ করে রাখলে ভেতরে তাপ আটকে যায়। ফলে দ্রুত জীবাণু বৃদ্ধি ও পচনের আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মাংস পুরোপুরি ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত সেটি প্যাকেট করা বা ফ্রিজে স্তূপ করে রাখা উচিত নয়। সামান্য ১০–১৫ মিনিট সময় বাঁচাতে গিয়ে অনেকে এই ভুলটি করে থাকেন।

 

➤ মাংস ধোয়ার ভুল পদ্ধতি:
অনেকে মাংস কাটার পর অতিরিক্ত পানি দিয়ে বারবার ধুয়ে ফেলেন। কিন্তু বিজ্ঞানসম্মতভাবে এটি সবসময় ভালো পদ্ধতি নয়। অতিরিক্ত পানি ব্যবহারে মাংসের স্বাভাবিক গঠন ও স্বাদ নষ্ট হতে পারে। এছাড়া পানির ছিটা থেকে জীবাণু রান্নাঘরের সিঙ্ক, টেবিল বা অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে মাংসে যদি দৃশ্যমান ময়লা, লোম বা রক্তের জমাট অংশ থাকে, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প পানি দিয়ে পরিষ্কার করা যেতে পারে। এ জন্য অতিরিক্ত ধোয়া বা দীর্ঘ সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকা উচিত।

➤ অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ক্ষতি:
কুরবানির দিন অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার প্রবণতাও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। জবাইয়ের পরপরই অতিরিক্ত মাংস খেলে বদহজম, গ্যাসট্রিক, অ্যাসিডিটি ও খাদ্যজনিত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস খেলে উচ্চ কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই পরিমিত খাবার গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত রান্না অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

➤ পরিচ্ছন্নতার অভাব ও পরিবেশ দূষণ:
কুরবানির আরেকটি বড় সমস্যা হলো অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে পশু জবাই করা। রক্ত ও বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে রাখা, ড্রেন বন্ধ করে দেয়া কিংবা রাস্তা দখল করে পশু জবাই করার কারণে পরিবেশ দূষণ হয় এবং রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া দীর্ঘ সময় রক্ত ও বর্জ্য পড়ে থাকলে দুর্গন্ধ, মাছির উপদ্রব ও সংক্রমণের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। তাই নির্দিষ্ট স্থানে পরিচ্ছন্নভাবে কুরবানি সম্পন্ন করা এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণ করা জরুরি। এতে যেমন পরিবেশ ভালো থাকে, তেমনি জনস্বাস্থ্যও সুরক্ষিত থাকে।

➤ সচেতন কুরবানিই হোক সবার লক্ষ্য:
কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা, সহমর্মিতা ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতিফলন। তাই শরিয়তের বিধান, স্বাস্থ্যবিধি ও বৈজ্ঞানিক দিকগুলো মাথায় রেখে সঠিকভাবে কুরবানি সম্পন্ন করা সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত। সচেতনতা ও সঠিক নিয়ম মেনে কুরবানি করলে একদিকে যেমন ইবাদতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে পরিবার ও সমাজও থাকে নিরাপদ ও সুস্থ।