বিদেশি প্ল্যাটফর্মের হাত ধরে ওটিটির সঙ্গে পরিচিত হন দেশের দর্শকরা। শুরুতে নির্দিষ্ট একটা শ্রেণির মাধ্যমগুলোর দর্শক ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সকল হিসেব পাল্টে গেছে। প্রতিনিয়তই মাধ্যমটিতে যুক্ত হচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। দর্শক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ওটিটির তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। প্রসারিত হচ্ছে নির্মাতা-শিল্পী-কলাকুশলীদের কাজের পরিধি। তবে একইসঙ্গে নেটফ্লিক্স, হইচই, অ্যামাজন প্রাইমের মত বৈশ্বিক জায়ান্টদের আধিপত্যে চরকি, বঙ্গ, দীপ্ত প্লে, আইস্ক্রিনের মতো দেশীয় প্লাটফর্মগুলোকে রীতিমতো যুদ্ধে নামতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েক কোটি মানুষ নিয়মিত ওটিটি কনটেন্ট দেখেন। তবে তাদের বড় একটি অংশ নেটফ্লিক্স, হইচই ও ডিজনি প্লাস হটস্টারের মতো জনপ্রিয় প্লাটফর্মের দর্শক। বিশেষ করে তরুণ প্রজš§ এই মাধ্যমগুলোর কনটেন্ট দেখতে বেশি পছন্দ করেন। তবে পিছিয়ে নেই দেশের প্ল্যাটফর্মগুলো। বিগত তিন-চার বছরে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের ওটিটি বাজার বর্তমানে বছরে প্রায় ৩০০-৫০০ কোটি টাকার, যা প্রতি বছর ২০-২৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। তারা বলছেন, দেশের ওটিটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে চলতি বছরের শেষে ওটিটি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ মিলিয়ন ছেড়ে যাবে। যদিও বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকেই। বর্তমানে ওটিটি সেবার ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ রয়েছে। যা দেশীয় প্লাটফর্মগুলোর পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধি করেছে। এতে গ্রাহক সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সেই সুযোগে বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো বাড়তি সুবিধা হিসেবে টেনে নিচ্ছে দেশীয় দর্শক।-এমনটাই মনে করছেন বোদ্ধারা।
কনটেন্টের মান, গল্প বলার ধরনে দেশি কনটেন্ট চমক দেখালেও বাজেটের ক্ষেত্রে বিদেশি প্ল্যাটফর্ম বিশেষ করে নেটফ্লিক্স বা প্রাইম ভিডিওর বাজেটের কাছে দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো নস্যি। যেখানে একটি ‘স্কুইড গেম’ বা ‘মানি হাইস্ট’-এর বাজেট শতকোটি, সেখানে বাংলাদেশের একটি পূর্ণাঙ্গ সিরিজের বাজেট ধরা হয় মাত্র ১-২ কোটি টাকা! তবে বাজেটে পিছিয়ে থাকলেও গল্পের গভীরতায় দেশীয় কনটেন্ট চমক দেখাচ্ছে। প্রথমদিকে দেশীয় ওটিটি কন্টেন্টের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বর্তমানে দ্রুত উন্নত হচ্ছে। ‘তকদির’, ‘কারাগার’, ‘মহানগর’ ‘কাইজার’ বা ‘পেট কাটা ষ’-এর মতো সিরিজগুলো প্রমাণ করেছে যে, শক্তিশালী মেধা ও মৌলিক গল্প থাকলে বিদেশি কনটেন্টের সঙ্গেও টেক্কা দেওয়া সম্ভব। বিদেশি দর্শকরাও এখন বাংলাদেশি থ্রিলার বা ড্রামা কনটেন্টের প্রশংসা করছেন।
এদিকে ওটিটি নিয়ে দর্শক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রেও অনেকটাই বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। ইংরেজি বা আন্তর্জাতিক মানের কনটেন্টের জন্য দর্শকরা এখনও নেটফ্লিক্স বা অ্যাপল টিভিকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। যদিও নিজের ভাষা, সংস্কৃতি এবং চারপাশের পরিচিত গল্প দেখার জন্য মানুষ দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকেই ঝুঁকছে। ভিন্ন ভাষার বিদেশি দর্শক সেভাবে টানতে না পারলেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে দেশীয় ওটিটি এখন সবচেয়ে বড় বিনোদন মাধ্যম। কাজের মান নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন থাকলেও বিদেশি প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন ফি বেশি হওয়া এবং দেশের প্ল্যাটফর্মগুলোর কম ও সহজ পেমেন্ট সিস্টেম দর্শকদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। সেই জায়গা থেকে অনেকেই প্রেক্ষাগৃহের বদলে ঘরে বসে ওটিটির কনটেন্ট দেখায় অভ্যস্ত হচ্ছেন। তবে এখনও বাইরের দর্শকের কাছে নিজেদের কনটেন্ট পৌঁছাতে না পারলে প্ল্যাটফর্মগুলো বিশ্ববাজারে অনেকটাই পিছিয়েছে রয়েছে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজনের সঙ্গে কি আমাদের প্ল্যাটফর্মগুলো সত্যিই তাল মেলাতে পারছে? সবাই হয়তো ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ উভয়ই উত্তর দেওয়ার দিকেই ঝুঁকবেন। যাত্রা শুরুর সময় থেকেই দেশীয় প্লাটফর্মগুলো বিদেশি ওটিটির সঙ্গে তাল মেলাতে লড়াই করছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, সময়ের সঙ্গে অনেকটাই এগিয়ে গেলেও এখন অবধি সমানতালে চলার মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। বিদেশি প্লাটফর্মগুলোর কন্টেন্টের মান এবং বাজেটের সঙ্গে দেশীয় প্লাটফর্মগুলোর পেরে ওঠা অনেকটাই স্বপ্নই রয়ে গেছে। সৃজনশীলতায় তাল মেলাতে পারলেও বাজারজাতকরণ, ডাটা অ্যানালিটিক্স এবং বিশ্বব্যাপী বিপণনে দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো পিছিয়ে। বিদেশি ওটিটিগুলো প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা স্ট্র্যাটেজি তৈরি করে, যা আমাদের দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষেত্রে সীমিত। তবে আশার কথা হলো, নেটফ্লিক্স বা হইচই এখন বাংলাদেশি নির্মাতাদের দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের মেধার স্বীকৃতি দিচ্ছে। অন্যদিকে দেশীয় কন্টেন্টের প্রতি সাধারণ দর্শকদের আবেগ ও নিজস্ব সংস্কৃতি বোঝার সুবিধা দেশের প্লাটফর্মগুলোকে লোকাল অ্যাডভান্টেজ দিচ্ছে। যার ফলে ‘চরকি’ বা ‘হইচই-বাংলাদেশ’ নিয়মিত ভালো কন্টেন্ট দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দর্শকশ্রেণি তৈরি করেছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হচ্ছে দেশি প্ল্যাটফর্মগুলোকে। ওটিটির মূল ভিত্তি হলো হাই-স্পিড ইন্টারনেট এবং উন্নত স্ট্রিমিং প্রযুক্তি। ওকলা স্পিডটেস্টের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ইন্টারনেটের গতি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে এখনো কম। বলা চলে, প্রযুক্তির দিক থেকে বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো বেশ এগিয়ে। নেটফ্লিক্সের অ্যালগরিদম বা ইন্টারফেস এতটাই মসৃণ যে, একজন ব্যবহারকারী খুব সহজেই তার পছন্দের কনটেন্ট খুঁজে পান। অন্যদিকে দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাফারিং সমস্যা, অ্যাপ ক্র্যাশ করা বা দুর্বল সার্চ ইঞ্জিনের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এছাড়া ফোর-কে রেজ্যুলেশন বা ডলবি অ্যাটমোস সাউন্ডের মতো আধুনিক সুবিধাগুলো দেশীয় অ্যাপগুলোতে এখনও পুরোপুরি কার্যকর নয়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এই বিষয়গুলোর ব্যবধান কমানো দেশের প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সফলতা-ব্যর্থতার অঙ্কে যে ফলাফলই হোক, দেশের ওটিটি শিল্প এখন একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এ কথা বলা বাহুল্য। বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো যেমন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে তেমনি খুলে দিয়েছে বিশ্ববাজারের দুয়ারও। দেশীয় ওটিটিগুলো যদি প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক শেকড়কে আঁকড়ে এগোতে পারে তাহলে শুধু প্রতিযোগিতা করা নয়, বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে খুব বেশি সময় লাগবে না।