Image description

দেশের টেলিভিশন নাটকের প্রিয় মুখ ফারুক আহমেদ। দীর্ঘদিন ধরে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের হাসিয়েছেন, ভাবিয়েছেন এবং কখনো কখনো জীবনের গভীর সত্যও তুলে ধরেছেন সহজ-সরল উপস্থাপনায়। মঞ্চ থেকে টেলিভিশন—অভিনয়ের প্রতিটি মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্রতা প্রমাণ করেছেন তিনি। সমসাময়িক নাট্যজগত, অভিনয়জীবন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন কালের কণ্ঠের সঙ্গে।

দীর্ঘ চার দশকের অভিনয় জীবনে ফিরে তাকালে—সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী মনে হয়?

মানুষের ভালোবাসা। আমি তো আমজনতার অভিনেতা, আমজনতার লেখক, আমজনতার পরিচালক। মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড়। এই দীর্ঘ জীবন অভিনয় করে আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি।

এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 

অভিনয় কি আপনার কাছে পেশা, নাকি এখনো নেশা?

নেশা এবং পেশা দুইটাই। প্রথমে নেশাই ছিল। আমি যখন অভিনয় শুরু করি তখন এটা পেশা হিসেবে নেওয়া যেত না।

তখন মঞ্চে অভিনয় করতাম। মঞ্চে কোনো টাকা-পয়সা দেওয়া হয় না। তখন টেলিভিশন বলতে ছিল শুধু বিটিভি। বিটিভিতে যখন আমি এনলিস্টেড হই তখন বছরে একটি বা দুটি নাটক করার সুযোগ পেতাম। কারণ অনেক অভিনেতা আর মাত্র একটি চ্যানেলে।
যে কারণে অর্থের প্রয়োজনে চাকরিতে যোগ দিলাম। আর অভিনয় নেশা হিসেবে নিলাম। এরপর যখন বিভিন্ন চ্যানেল এলো তখন আমি অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার চিন্তা করলাম।

 

আপনি প্রায়ই বলেন মঞ্চই অভিনয়ের বিদ্যাপীঠ—আজকের প্রজন্ম কি তা মনে করে বা সেই শিক্ষাটা পাচ্ছে? 

না, সবাই তা পাচ্ছে না। অনেকে সরাসরি চলে আসছে অভিনয়ে। তবে এর মধ্যে যারা মঞ্চে অভিনয় করেনি, তাদের মধ্যেও অনেকে ভালো অভিনয় করছে। তারা যদি মঞ্চে অভিনয় করে আসত তাহলে অভিনয়ের ম্যাথমেটিক্সটা জানা থাকত। আরো বেশি ভালো অভিনয় করতে পারত। আবার অনেকে মঞ্চে কাজ করার পরেও খুব ভালো করে না, সেটাও আছে।

আমাদের দেশে অভিনয় শেখার মাধ্যম খুবই কম। যেমন, পাশের দেশে আছে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা। অভিনয় শেখার একটি বড় প্রতিষ্ঠান। সেখান থেকে জামিল আহমেদ, নাইলা আজাদ নুপুর, তারেক আনাম খানসহ আরো অনেকে অভিনয়ের ওপর পড়াশোনা করেছেন। আমাদের দেশে অভিনয় শেখার এরকম বড় কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এজন্যই যারা অভিনয়ে আগ্রহী তাদেরকে মঞ্চ থেকে অভিনয় শিখতে বলা হয়। 

এখনকার নাটকে বাস্তব জীবন কম দেখানো হয়, ফলে চরিত্রগুলো কৃত্রিম হয়ে যাচ্ছে—আপনি কি একমত?

মোটামুটি একমত। যেকোনো শিল্পেই পড়াশোনা করা জরুরি। বর্তমানে আমাদের বই পড়ার অভ্যাস কম। অভিনয়ের জন্যেও পড়াশোনা করা দরকার। অভিনেতা বা শিল্পী একবারে হয় না। অভিনেতা বা শিল্পী হওয়ার কোনো ট্যাবলেট নেই। খেলাম আর বড় একজন অভিনেতা হয়ে গেলাম, অঙ্কনশিল্পী হয়ে গেলাম, গায়ক হয়ে গেলাম অথবা ফুটবলার হয়ে গেলাম। একটি নির্দিষ্ট পথ পরিক্রমা এবং পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে একজন অভিনেতা বা শিল্পী হয়। 

কমেডি চরিত্রে মানুষ আপনাকে বেশি ভালোবাসে। একজন অভিনেতা হিসেবে এটা কি কখনো সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে? 

সীমাবদ্ধতা না। আমি অভিনয় করি। কমেডি বুঝি না, সিরিয়াসও বুঝি না। পান্ডুলিপিতে যে চরিত্র আমাকে দেওয়া হয় সেই চরিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। আমার থিয়েটারের বয়স ৪২ বছর। এই ৪২ বছর ধরে আমি মঞ্চে অভিনয় করছি। আমি বর্তমানে ঢাকা থিয়েটারের রঙমহাল নাটকের নির্দেশনা দিচ্ছি। আমি বই লিখি। আমার বই প্রচুর পাঠক আগ্রহ নিয়ে পড়ে। কাজেই আমার হীনমন্যতায় ভোগার কোনো স্থান নেই।  

ইউটিউব ও ওটিটির যুগে টেলিভিশন নাটকের ভবিষ্যৎ আপনি কীভাবে দেখছেন?

আমি মহাজাতক নই। এটা আসলে অনেক চিন্তার বিষয়। আমাদের দেশের সার্বিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। তবে এখন যেহেতু স্বাভাবিক একটা রাজনৈতিক ধারা ফিরে আসছে তাই আমরা আশা করি সামনে টেলিভিশন নাটকের আরো ভালো কিছু আসবে। 

এখন কি ভালো অভিনয়ের চেয়ে শিল্পীদের দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগ্রহ বেশি?

অনেকের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা পাওয়াটাই মুখ্য বিষয়। তাদের অভিনয়ের উদ্দেশ্য কিভাবে ভিউ বাড়ানো যায়। আবার অনেকেই ভালো একটি নাটকে অভিনয়ের জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকে।

নতুন অভিনেতাদের মধ্যে কোন জিনিসটি সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত বলে মনে হয়?

শিক্ষা, জানাশোনা। তবে সবার ক্ষেত্রে নয়। নতুন প্রজন্মের অনেকে ভালো অভিনয় করছে। যাদের অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করে।

অভিনয় জীবনের এমন কোনো সময় কি ছিল, যখন মনে হয়েছে ছেড়ে দেবেন?

না। আমি এত দুঃখী মানুষ না।

শুনেছি এবারের ঈদে আপনার কিছু নতুন কাজ আসছে। সেগুলো নিয়ে বলুন।

কাজ তো অনেক করেছি। যেমন—এবারের ঈদে মুক্তি পেয়েছে হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে তানিম নূরের পরিচালনায় চলচ্চিত্র বনলতা এক্সপ্রেস। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন চ্যানেলের জন্য আরো কয়েকটি নাটক।  

বাংলাদেশের নাটক কি সমাজ পরিবর্তনে এখনো ভূমিকা রাখতে পারছে?

নাটক মানুষকে সচেতন করতে পারে। উদ্বুদ্ধ করতে পারে। জ্ঞান দিতে পারে। কিন্তু নাটক কোনো দেশের সমাজ পরিবর্তন করেছে—এরকম কিছু আমার জানা নেই। নাটক সমাজ পরিবর্তনের একটি সহায়ক শক্তি। 

যদি আবার শুরু করার সুযোগ পেতেন—ফারুক আহমেদ কি আবার অভিনেতাই হতেন? 

হ্যাঁ, অভিনেতাই হতাম। এটা আমার জীবনের সঙ্গে মিশে আছে।