Image description
জেনি উইলিয়ামস

ওয়াশিংটনের একটা অদ্ভুত রেওয়াজ আছে। ইরান নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই তাদের মুখে খই ফোটে। গণতন্ত্র, নারী অধিকার, পরমাণু অস্ত্র রোধ আর আঞ্চলিক শান্তির ফিরিস্তি শুরু হয়। কিন্তু গল্পটা শেষ হয় অন্য জায়গায়। শেষমেশ খাতা খুলে দেখা যায়, পড়ে আছে শুধু নিষেধাজ্ঞা, হুমকি, রণতরী আর বোমা। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে আমেরিকা যখন বের হয়ে গেল, তখন থেকেই তাদের নানারকম জোরজবরদস্তিকে ‘উদ্বেগ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসের বাজারে একদিকে আমেরিকার শান্তি প্রস্তাবের খসড়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল, অন্যদিকে ট্রাম্প অনবরত হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নতুন করে হামলার হুমকি দিয়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বলছিলেন। মুখের কথা আর আসল কাজের মধ্যে এই যে ফারাক, এটা এখন আর লুকানো কোনো কূটনীতি নয়। এটাই আসল ক্ষমতা। ক্ষমতার দম্ভ।

আমেরিকার ইরান নীতির সংকট এখানেই স্পষ্ট। তাদের নীতিতে নৈতিকতার বালাই নেই। সাধারণ ইরানিদের দেখানো হয় সহানুভূতির পাত্র হিসেবে। তারপর তাদের ওপরই চাপানো হয় এমন সব নিয়ম, যাতে তাদের রোজকার জীবনটাই একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংক অচল। জাহাজ চলাচল বন্ধ। ওষুধ নেই। খাবারের দাম আকাশছোঁয়া। আমদানির খরচ বাড়ছে। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কর্পূরের মতো উড়ে যাচ্ছে। আর তাদের ওপরই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হচ্ছে।

যুদ্ধ তো আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লে শুরু হয় না; যুদ্ধ শুরু হয় বোমা মারার অনেক আগে। ওয়াশিংটনের ঠান্ডা ঘরের শুনানিতে, টিভি স্টুডিওর টক শোতে; থিংকট্যাংকের রিপোর্টে বাজানো হয় যুদ্ধের দামামা। বড় বড় দাতার বৈঠকে আর সংবাদপত্রের চটকদার শিরোনামে যুদ্ধের সলতে পাকানো হয়। আমজনতাকে বোঝানো হয়— কূটনীতি আসলে বোকাদের খেলা। গায়ের জোর দেখানোই একমাত্র রাস্তা। হরমুজ প্রণালির চলমান সংকটে এই চেনা ছকটাই আবার দেখা যাচ্ছে। যে জলপথ দিয়ে গোটা দুনিয়ার সিংহভাগ জ্বালানি যেত, তা এখন হুমকি আর দরকষাকষিতে অচল। ট্রাম্প তো এক কাঠি ওপরে। যেসব চীনা সংস্থা ইরান থেকে তেল কিনছে, তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলা হবে কি না, তা নিয়ে দরদাম করছেন। এটা কোনো নৈতিক প্রশ্ন নয়। এটা বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোড়ে। নিজের আখের গোছানোর চাল। এখানেই খেরোখাতায় নাম ওঠে লবিস্ট আর টাকার। ‘আইপ্যাক’ (AIPAC)-এর কথাই ধরা যাক। তাদের কাজ হলো ইসরায়েলপন্থীদের ভোটে জেতানো, আর যারা আমেরিকার এই ইসরায়েল-প্রেমের সমালোচক, তাদের উপড়ে ফেলা। খাতা-কলমে এটা আইনি রাজনীতি। কিন্তু আইনি হলেই কি তা ন্যায়সংগত? ২০২৬ সালে ইলিনয়ের মাত্র ৬টি সংসদীয় আসনের নির্বাচনে এসব বাইরের গোষ্ঠী আর আইপ্যাক মিলে প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার ঢেলেছে! সমস্যা এটা নয় যে ভোটাররা ইসরায়েল বা ইরান নিয়ে বিতর্ক শুনছেন। সমস্যা হলো, টাকার জোরে বিতর্কটাকে একতরফা করে তোলা হয়।

ওয়াশিংটন যা দেয়, তা হলো— এক ফোঁটা মায়াকান্না আর তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একটা কড়া নিষেধাজ্ঞার খসড়া

একই নাটকের পরের অঙ্কটা হলো ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ আর ‘মোজাহেদিন-ই খালক’ (MEK)। নির্বাসিতদের রাজনীতিকে কীভাবে পশ্চিমি দুনিয়ার বৈধতার থিয়েটার বানানো যায়, এরা তার জ্যান্ত উদাহরণ। ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-এর দিকে বরাবরই আঙুল উঠেছে। সৌদি আরবের রহস্যময় তহবিল থেকে তারা টাকা পায় বলে অভিযোগ। যদিও তারা সরকারের প্রভাবের কথা অস্বীকার করে। আর এমইকে? ২০১২ সালে আমেরিকা তাদের জঙ্গি তালিকা থেকে বাদ দেয়। এখন আমেরিকার প্রাক্তন কর্তারা তাদের মাথায় তুলে নাচছেন। ভাবখানা এমন, এরাই যেন ইরানের ভবিষ্যৎ। আসল গলদ কিন্তু শুধু টাকায় বা ইতিহাসে নয়; আসল গলদ হলো— একটা গোটা সমাজের বিকল্প হিসেবে এদের খাড়া করা। ইরানের জটিল সমাজ, তাদের ইতিহাস, কান্না, মধ্যবিত্তের লড়াই আর রাজনৈতিক চেতনাকে স্রেফ কিছু চটকদার স্লোগানে মুড়ে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাসিতদের এই মাইকটা ওয়াশিংটন ঠিক তখনই বাজায়, যখন তারা ওয়াশিংটনের মনমতো স্ক্রিপ্ট আউড়ে যায়। মানবাধিকারের ভাষা তো মানুষকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে আমেরিকার এই বুলি ঠিক উল্টো কাজ করে। ইরানের নারী, ছাত্র, শ্রমিকদের মঞ্চে আনা হয় সাক্ষী হিসেবে। কিন্তু তাদের নিজেদের যন্ত্রণার দাওয়াই কী হবে, তা ঠিক করার অধিকার তাদের দেওয়া হয় না। তাদের কষ্টটা হয়ে উঠেছে ‘পোর্টেবল’ বা বহনযোগ্য। সেই কষ্ট নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে বক্তৃতা ঝাড়া হয়, নিউজ চ্যানেলে ফুটেজ বানানো হয়, দাতাদের নৈশভোজে সহানুভূতি কুড়ানো হয়। আর তারপর? সেই কষ্টের দোহাই দিয়ে চাপানো হয় এমন সব বিধ্বংসী নীতি, যা ইরানিরা কোনোদিন চায়নি। আসল সহমর্মিতা দেখাতে হলে উত্তেজনা কমাতে হবে। কূটনীতির দরজাটা খুলতে হতো। একটা দেশকে জবরদস্তির ল্যাবরেটরি বানানো বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ওয়াশিংটন তা করে না। ওয়াশিংটন যা দেয়, তা হলো— এক ফোঁটা মায়াকান্না আর তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একটা কড়া নিষেধাজ্ঞার খসড়া।

আমেরিকার ঘরোয়া রাজনীতিটাও বেশ মজার। যুদ্ধ আর অবরোধের জেরে তেলের দাম যখন ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারে গিয়ে ঠেকল, তখন আমেরিকার সাধারণ মানুষকে বোঝানো হলো— দেশের স্বার্থে এইটুকু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে! অথচ মানবতাবাদের মোড়কে মোড়া এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ জাহাজগুলো স্রেফ দরকষাকষির ঘুঁটি। যারা ইরানের তেল কিনছে, তাদের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা চাপানোর যুক্তিটাও অদ্ভুত। বেঁচে থাকার সব পথ বন্ধ করো, আর তারপর সেই কান্নাকে নিজেদের ‘লেভারেজ’ বা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করো। এমনকি তাদের কূটনীতিও আসলে একধরনের চাপ সৃষ্টির কৌশল। সেখানে এই বোধটুকু নেই যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কোনোদিন স্থানীয় মানুষকে বাদ দিয়ে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

ইরান নিয়ে একটা সুস্থ নীতি যদি তৈরি করতে হয়, তবে ইরানিদের কষ্টকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। কূটনীতিকে আবার মূল মঞ্চে ফিরিয়ে আনতে হবে। বুঝতে হবে যে গায়ের জোরের একটা সীমা আছে। আর যুদ্ধ এড়ানোর দাওয়াই হিসেবে দেদার নিষেধাজ্ঞা চাপানো বন্ধ করতে হবে। সবশেষে এটা স্বীকার করতেই হবে যে— ভয়, নির্বাসিতদের তামাশা আর ক্ষমতার পালাবদলের দিবাস্বপ্ন ফেরি করে যারা পকেট ভরায়, তাদের হাত দিয়ে অন্তত গণতন্ত্র আসে না।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।
লেখক: মার্কিন সাংবাদিক ও কলামিস্ট