Image description

রমজানে ইফতারির অন্যতম অনুষঙ্গ মুড়ি। ঢেঁকি ছাঁটা চালে মাটির চুলায় লাকড়ির আগুনে মাটির বিশেষ পাতিলে লবণ-পানি মিশিয়ে মুড়ি ভাজার প্রচলন কালের বিবর্তনে নেই বললেই চলে। এখন যন্ত্রের মাধ্যমে নানারকম রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা প্যাকেটজাত মুড়িই হয়ে উঠেছে সহজলভ্য। 

তবে পাবনার ঈশ্বরদীর সাতটি গ্রামে ৩০ বছর ধরে শতভাগ ‘নিরাপদ’ মুড়ি তৈরি করে আসছেন শত শত নারী। মুলাডুলির কয়েকটি গ্রামের নাম শুধু মুড়ির কারণে পরিচিতি পেয়েছে ‘মুড়িগ্রাম’ হিসেবে। বাজারে সাধারণত এখন যন্ত্রে উৎপাদন করা প্যাকেটজাত মুড়ি পাওয়া যায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজিতে। তবে ঈশ্বরদীর এই নিরাপদ মুড়ি স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৬০ টাকা দরে। ঢাকা-চট্টগ্রামের সুপারশপে যা ২০০ টাকা কেজি। 

ঈশ্বরদীর নিরাপদ মুড়ির সুখ্যাতি ছড়িয়ে গেছে বিশ্বের উন্নত দেশে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই, ইউরোপ, আমেরিকা ও লন্ডনে যাচ্ছে মুলাডুলির মুড়ি। গতকাল সকালে ঈশ্বরদী শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মুলাডুলির অজগ্রাম হাজারীপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মুড়ি নিয়ে নারীর ব্যস্ততা। কেউ ধান সেদ্ধ করছেন, কেউ শুকাচ্ছেন, কেউ মাটির বিশেষ হাঁড়িতে বালু গরম করছেন, পাশাপাশি লবণ-পানি মিশিয়ে চাল থেকে মুড়ি ভাজা ও চালনায় ঝাঁকিয়ে স্তূপ করছেন। 

গ্রামের মধ্যবয়সী নারী জাহেদা বেগম বলেন, ‘আমি এখানে ৩০ বছর ধরে মুড়ি ভাজছি। শুধু মুড়ি ভাজার কাজ করে প্রতি মাসে আয় করি ১৫ হাজার টাকা।’ আলতা বানু বলেন, ‘সারাদিন চুলোর আগুনের তাপ সহ্য করে মুড়ি ভাজি। কষ্ট হলেও দিনশেষে ভালো কাজ ও ভালো আয় হওয়ায় সব কষ্ট ভুলে যাই।’ 
মুলাডুলির সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর মুড়ির চাহিদা বাড়ছে। শুধু আমাদের চাতালে প্রতিদিন প্রায় আড়াই মণ মুড়ি ভাজা হয়।’ তিনি জানান, সারাবছর উপজেলার মুলাডুলি, হাজারীপাড়া, শেখপাড়া, দাশুড়িয়া, খয়েরবাড়িয়া, মাড়মী ও সুলতানপুর গ্রামের শতাধিক নারী তাদের বাড়িতে মুড়ি ভাজেন। তবে রমজান এলে মুড়ির চাহিদা অনেক বাড়ে। রমজানের শুরুর পর এক স্থান থেকেই দুই হাজার ১০০ কেজি মুড়ি বিক্রি হয়েছে বলে জানান সানোয়ার হোসেন। 

মুড়িগ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে ভেজালমুক্ত মুড়ি তৈরির জন্য গ্রামের নারীদের সহযোগিতা করছে উবিনীগ ও নয়াকৃষি আন্দোলন। ঈশ্বরদী আঞ্চলিক অফিসের সমন্বয়কারী আজমিরা খাতুন জানান, মুলাডুলি, হাজারীপাড়া, শেখপাড়া, দাশুড়িয়া, খয়েরবাড়িয়া, মাড়মী, সুলতানপুরসহ নাটোরের বেশ কয়েকটি গ্রামে শতাধিক নারী এই মুড়ি তৈরি করছেন। তিনি জানান, মুড়ির জন্য উৎকৃষ্ট আমন ধানের বিশেষ জাত ‘মোটা মোটা’ ও ‘ঘীগজ’ ধান বরিশাল ও নোয়াখালী থেকে আনা হয়। সার-বিষমুক্তভাবে উৎপাদিত এ ধানের ঢেঁকি ছাঁটা চাল দিয়ে মুড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় শুধু লবণ আর পানি। এই মুড়িতে অন্য কোনো উপকরণ ব্যবহার করা হয় না। তারা এই মুড়ির নামও দিয়েছেন ‘নিরাপদ’ মুড়ি। 

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন এসব এলাকায় প্রায় ২৫ মণ মুড়ি তৈরি হয়। বাজারে যেসব সাধারণ মুড়ি পাওয়া যায় তা থেকে এই মুড়ি দেখতে যেমন আলাদা, তেমনি স্বাদ ও স্বাস্থ্যের জন্যও নিরাপদ। প্রতিবছর চট্টগ্রামের নন্দনকানন, দেশীদশ, ঢাকার মোহাম্মদপুরের শস্য প্রবর্তনা ও বনানীর সুপারশপে এই মুড়ি বিক্রি হয়। ঈশ্বরদীর গ্রামে উৎপাদিত প্রচুর মুড়ি হজ মৌসুমে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে যায়। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের বড় বড় সুপারশপ ছাড়িয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই, ইউরোপ, আমেরিকা ও লন্ডনেও নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে মুড়ি।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, ভেজালের যুগে ঈশ্বরদীর এই ‘নিরাপদ’ মুড়ি তৈরি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ।