দেশের ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের ঋণে খেলাপির হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের জুন শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২৪ সালের একই সময় এ হার ছিল ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং আপডেট-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের জুন শেষে এক কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৬ শতাংশ। এক কোটি এক টাকা থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত এ হার দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ১০ শতাংশ। ১০ কোটি এক টাকা থেকে ২০ কোটি পর্যন্ত খেলাপির হার হয়েছে ৪৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। এছাড়া ২০ কোটি এক টাকা থেকে ৩০ কোটি টাকার খেলাপির হার ৩৮ শতাংশ, ৩০ কোটি এক টাকা থেকে ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত ৪২ দশমিক ১০ শতাংশ, ৪০ কোটি এক টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ৪৫ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি এক টাকা থেকে তদূর্ধ্ব খেলাপি ঋণের হার ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে বিভিন্ন ঋণসীমায় শ্রেণিকরণ অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ব্যাংক খাতের ঋণ পোর্টফোলিওতে ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ৫০ কোটির বেশি ঋণের ক্ষেত্রে শ্রেণিকরণ অনুপাত ১৭ দশমিক এক শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৮ দশমিক দুই শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে ৪০-৫০ কোটি টাকার ঋণসীমায় এই হার ১০ দশমিক চার শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ দশমিক সাত শতাংশ হয়েছে। এছাড়া ছোট ঋণ শ্রেণিতেও অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে শ্রেণিকরণ অনুপাত সাত দশমিক চার শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিভিন্ন সীমায় এই প্রবণতা ইঙ্গিত করে যে, ঋণের মান-সংক্রান্ত সমস্যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। তবে বড় করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে তা তুলনামূলকভাবে বেশি। এই ধরনটি উচ্চমূল্যের ঋণের জন্য ঋণ মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা অথবা বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর প্রভাব ফেলা খাতভিত্তিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কার ইঙ্গিত দিতে পারে।
খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, শিল্প ঋণে ৩৫ দশমিক ৯০ শতাংশ, নির্মাণ খাতে ২৭ শতাংশ, পরিবহন খাতে ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ, ভোক্তা খাতে ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং কৃষি, মৎস্য ও বনায়নে ৩১ দশমিক ৬০ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণে এ হার ১২ শতাংশ এবং বিবিধ ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ।
গত বছরের জুন শেষে দেশে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে।
ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে। কিছুদিন পর বরং খেলাপি ঋণের হার আরো বাড়বে।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠিত হওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।