দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োজিত ৬৯৮ কর্মীকে স্থায়ীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। বিষয়টিতে সরকারের নিয়োগ সংক্রান্ত আইন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিমালা লংঘন হচ্ছে বলে খোদ ব্যাংকের আলোচনায়ই উঠে এসেছে।
মূলত ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এ কর্মীদের মজুরিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তাদের স্থায়ীকরণের জন্য সংশোধন করা হচ্ছে ব্যাংকের নিয়োগ সংক্রান্ত প্রবিধানমালা। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মানবসম্পদ বিষয়ক পরামর্শক বা এইচআর কনসালট্যান্ট। জনবল কাঠামোয় যুক্ত হচ্ছে নতুন পদ। নিয়োগকালীন বয়সসীমাসহ আনুষঙ্গিক নিয়ম ও বিধি শিথিলের অনুমোদন নিয়ে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে অনুমোদন পেলে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হবে।
দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ীকরণ নিয়ে গত ৬ অক্টোবর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের কার্যপত্রে উঠে আসে, এ নিয়োগের গোটা প্রক্রিয়াই হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরি আইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিমালা ও নির্দেশনা লংঘন করে। এতে বলা হয়, দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের স্থায়ীকরণের জন্য অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে জারি করা এক পরিপত্রে ‘বয়সসীমা শিথিলযোগ্য’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও বিষয়টি ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাগুলোয় সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ আইন ২০২৬’- এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কার্যপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এন্ট্রি পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সশরীরে অংশগ্রহণ বা অনলাইন অ্যাসেসমেন্ট প্রক্রিয়ার আওতায় অন্তত দুই ধাপের (নৈর্ব্যক্তিক এবং/অথবা লিখিত ও মৌখিক) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হতে হবে। এছাড়া আবেদনের সুযোগের সমতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইট বা জব সাইট অথবা অন্তত দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিধান রয়েছে। কিন্তু অগ্রণী ব্যাংকের নতুন প্রস্তাবিত প্রবিধানে এ কর্মীদের যেভাবে স্থায়ী নিয়োগের কথা বলা হচ্ছে, তা এ নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বলা হয়েছে, এ ধরনের নিয়োগ শুধু একবারই দেয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আর কোনো নিয়োগ হবে না। এ নিয়ে ব্যাংকের প্রস্তাবিত প্রবিধানটি আগামী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) পাস হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, এই কর্মীদের দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া শুরু হয় ২০১০ সালে। অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ ওই বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্বে ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত তার আগ্রহেই এ মজুরিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মূলত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এ কর্মীদের স্থায়ী নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানালেন আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘তাদের নিয়োগ হয়েছে ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। মূলত ফিল্ড অফিসার হিসেবে। তাদের কাজ ছিল প্রধানত কৃষি ঋণ দেয়া তা পুনরুদ্ধার করা। এছাড়া এ ধরনের কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৭০০। এছাড়া গোডাউন কিপারও থাকতে পারে। তাদের নিয়োগের সময় সব শর্তই পূরণ করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগগুলো হয়েছিল অস্থায়ী ভিত্তিতে। যেহেতু তাদের নিয়োগ হয়েছিল দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে; সেহেতু শুরু থেকেই তাদের দাবি ছিল; দাবি বলবো না অনুরোধ ছিল যে তাদের স্থায়ীকরণ করা যায় কিনা। একজন যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী; যার স্নাতক এমনকি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও আছে, এখানে হয়তো যুক্ত হয়েছে ৩০ বছর বয়সে। এখন হয়তো তার বয়স ৪৫ হচ্ছে। এসব হিসাব করেই এমন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আর আমরাও চূড়ান্তভাবে নিয়োগের আগে বয়স, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও চাকরিজীবনে কোনো ধরনের অসদাচরণের অভিযোগ আছে কিনা, সেগুলো যাচাইবাছাই করেই স্থায়ীকরণ করবো।’
যেহেতু তাদের নিয়োগ হয়েছিল দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে; সেহেতু শুরু থেকেই তাদের দাবি ছিল; দাবি বলবো না অনুরোধ ছিল যে তাদের স্থায়ীকরণ করা যায় কিনা। একজন যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী; যার স্নাতক এমনকি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও আছে, এখানে হয়তো যুক্ত হয়েছে ৩০ বছর বয়সে। এখন হয়তো তার বয়স ৪৫ হচ্ছে। এসব হিসাব করেই এমন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদচেয়ারম্যান, অগ্রণী ব্যাংক
মজুরিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ীকরণের জন্য ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার’ নামে নতুন একটি পদ এরই মধ্যে সৃজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধিমালা ও নির্দেশনা শিথিলের পক্ষে যুক্তি দিয়ে কার্যপত্রে বলা হয়, এন্ট্রি পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মগুলো যেসব পদের জন্য প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদের কথা বলা নেই। যদিও অগ্রণী ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এটি জুনিয়র অফিসার সমমানের পদ। এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সব আইন এবং বিধিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে অগ্রণী ব্যাংকের কয়েক কর্মকর্তা অভিযোগ তুলেছেন, এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। আবার দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও ব্যাংক খাত নিয়ে কাজ করা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ অবশ্যই দেয়া যেতে পারে। কিন্তু এটি করতে গিয়ে যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও সরকারের নিয়োগ নীতিমালার কোনো লংঘন না ঘটে। আর বিষয়টি নিয়ম লংঘনের দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠার কোনো আশঙ্কা থাকলে, তা এখনই বন্ধ করে দেয়া উচিত। কোনোভাবেই যাতে অগ্রণী বা অন্য কোনো ব্যাংকের জন্য নতুন উদাহরণ তৈরি না হয় যে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইন এবং বিধিমালা লংঘন করা যায়।
যুক্তি যা-ই হোক না কেনো, সংশ্লিষ্ট নীতিমালা লংঘন করে তো এটি করা যাবে না। এটি কোনো অবস্থায়ই সমর্থনযোগ্য নয়। আর লংঘনের ক্ষেত্রে আমি মনে করি অগ্রণী ব্যাংক যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো নিয়ে পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত অবিলম্বে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ও তা বন্ধ করা।ড. ইফতেখারুজ্জামাননির্বাহী পরিচালক, টিআইবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, ‘যদি নির্ধারিত পদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে তা করা যেতেই পারে। এখানে দেখার বিষয় হলো এটি করতে গিয়ে কোনো শ্রেণি বিশেষকে অযাচিত সুবিধা দেয়া হচ্ছে কিনা বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা লংঘন হচ্ছে কিনা। যুক্তি যা-ই হোক না কেনো, সংশ্লিষ্ট নীতিমালা লংঘন করে তো এটি করা যাবে না। এটি কোনো অবস্থায়ই সমর্থনযোগ্য নয়। আর লংঘনের ক্ষেত্রে আমি মনে করি অগ্রণী ব্যাংক যদি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো নিয়ে পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না দিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত অবিলম্বে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ও তা বন্ধ করা। হতে পারে তাদের জনবল ঘাটতি আছে। হতে পারে তাদের ব্যবসা প্রসারের জন্য এটা প্রয়োজন। কিন্তু সেটা তো নিয়ম লংঘন করে হতে পারে না। আর যদি বলা হয়, এটা শুধু এবারই করা হবে, ভবিষ্যতে আর করা হবে না; তার মানে হলো এটার পেছনে হয়তো বড় ধরনের দুর্নীতির গন্ধ আছে'।