Image description

পরিবারতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। বিমা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিবারতন্ত্র চলছে প্রতিষ্ঠানটিতে। আইন অনুযায়ী বিমা কোম্পানিতে একই পরিবার থেকে দুইজনের বেশি পরিচালক এবং ধারণকৃত শেয়ারের পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি না থাকার বিধান থাকলেও সেই নির্দেশনা মানছেন না মেঘনা লাইফ। এদিকে ভয়াবহ আর্থিক চাপেও পড়েছে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

ব্যবসায় নেমেছে ধস, ফলে লাইফ ফান্ড ভেঙে চলছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিমাকারীর নিবন্ধন প্রবিধানমালা, ২০১৩ (বিউনিক-খ) এর ১৮ (ট) ও (ঠ) অনুযায়ী, একই পরিবার থেকে এক কোম্পানিতে ২ জনের বেশি পরিচালক এবং তাদের ধারণকৃত শেয়ারের পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি থাকতে পারবে না বলে বিধান রয়েছে। তবে এই বিমা আইনকে একেবারেই তোয়াক্কা করছে না নিজাম-হাসিনা পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক আধিপত্যে চালানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

খোঁজ নিয়ে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ আইন লঙ্ঘন করে তার পরিবার থেকে আরও ৪ জনকে পরিচালনা পর্ষদে জায়গা করে দিয়েছেন। এরা হচ্ছেন—নিজাম উদ্দিন আহমেদের কন্যা উম্মে খাদিজা মেঘনা, পুত্র রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, পুত্রবধূ দিলরুবা শারমিন ও আরেক পুত্র নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল। এদের মধ্যে পুত্র নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেলকে কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। আইন লঙ্ঘন করে নিজ পরিবারের সদস্যদের এনেই ক্ষান্ত হননি তিনি।

দল ভারী করার জন্য পরিচালনা পর্ষদে ডেকে এনেছেন নিজেদের আরেক বিমা কোম্পানি কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদ আনোয়ার খানকেও মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মনোনীত পরিচালক করেছে। কারণ, তিনি চেয়ারম্যানের একান্ত অনুগত ও বাধ্যগত। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে (নিজ ও স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠিত) স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশনের মনোনীত প্রতিনিধি মো. মঈন উদ্দিনকেও মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মনোনীত পরিচালক পদে বসিয়েছেন।

মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজাম উদ্দিন আহমেদের কন্যা উম্মে খাদিজা মেঘনার ধারণকৃত শেয়ারের পরিমাণ ২ শতাংশ, পুত্র রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের ২ দশমিক শূন্য এক শতাংশ, পুত্রবধূ দিলরুবা শারমিনের ২ দশমিক শূন্য এক শতাংশ ও আরেক পুত্র নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেলের ধারণকৃত শেয়ারের পরিমাণ ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। শুধু তাই নয়, নিজাম-হাসিনা পরিবারের আরেক বিমা কোম্পানি কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের ধারণকৃত শেয়ারের পরিমাণ ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এছাড়া তাদের আরেক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন হাসপাতালের ধারণকৃত শেয়ারের পরিমাণ ২ দশমিক ৪০ শতাংশ। সব মিলিয়ে চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ, পরিবার ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ধারণকৃত মোট শেয়ারের পরিমাণ ২০ দশমিক ৩ শতাংশ।

এসব বিষয়ে জানতে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে এসব বিষয়ে তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, আত্মীয় ও অনুগতদের বলে বলিয়ান নিজাম উদ্দিন আইনের তোয়াক্কা করছেন না। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার আইন ও বিধান মানছে না মেঘনা লাইফ। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে এই বিমা কোম্পানিকে পরিবারের বলয় থেকে বের করে আনা জরুরি বলে মনে করে অংশীজনরা।

জানতে চাওয়া হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্স্যুরেন্স ও ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক ড. হাসিনা শেখ শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, কোনো কোম্পানিতে এক পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তি পরিচালনা পর্ষদে থাকলে সেখানে অনিয়ম করার আশঙ্কা বেশি থাকে।

এদিকে মেঘনা লাইফের ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, ৫ বছরে কোম্পানিটির ব্যবসা ও জীবন তহবিল—দুই সূচকেই উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে।

২০২১ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫ বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা কমেছে একশ ৬ কোটি টাকা। একই সময়ে লাইফ ফান্ড বা জীবন তহবিল কমেছে ২শ’ ৯৪ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ব্যবসা কমে ৩শ’ ৮৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, ২০২২ সালে সামান্য বেড়ে ৩শ’ ৯১ কোটি ৯৩ লাখ, ২০২৩ সালে ৩শ’ ৮২ কোটি ৯৫ লাখ এবং ২০২৪ সালে ৩শ’ ৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকায় নেমে আসে।

২০২৪ সালেই এক বছরে প্রিমিয়াম আয় কমেছে ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির মোট প্রিমিয়াম আয় আরও কমে দাঁড়ায় ২৮২ কোটি টাকায়।

২০২১ সালে মেঘনা লাইফের মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৩শ’ ৮৮ কোটি টাকা। এরপর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫ সাল শেষে মোট প্রিমিয়াম আয় নেমে দাঁড়িয়েছে ২শ’ ৮২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা কমেছে প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ।

তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়াম আয়ের পাশাপাশি মেঘনা লাইফের জীবন তহবিলও কয়েক বছর ধরে কমেছে। কোম্পানির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১ হাজার ৮শ’ ৬৭ কোটি ৯২ লাখ, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭শ’ ৯১ কোটি ৯৫ লাখ, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৬শ’ ৭৫ কোটি ১০ লাখ, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৬শ’ ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৫শ’ ৭৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবন তহবিল ঋণাত্মক ২০২১ সালে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে।

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ জীবন তহবিল প্রায় ১ হাজার ৪৯২ কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় জীবন তহবিল ২০২৫ সালে এসে কমেছে প্রায় ২৯৪ কোটি টাকা বা ১৬ শতাংশ। লাইফ ফান্ডের ধারাবাহিক ঋণাত্মক অবস্থাই বলে দিচ্ছে লাইফ ফান্ড ভেঙে চলছে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কার্যক্রম।

খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞরা বলছেন, কোম্পানির ব্যবসা কমার পেছনে নতুন পলিসি সংগ্রহে দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মেঘনা লাইফের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় ২০২৩ সালের ৭৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা থেকে ২০২৫ সালে কমে ৪৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। কোম্পানির প্রতিবেদনে এ পতনের কারণ হিসেবে মূল্যস্ফীতির চাপ, মানুষের তারল্য সংকট এবং ভোক্তার আচরণে পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে গ্রাহকদের পুরোনো পলিসির দাবি পরিশোধ অব্যাহত থাকায় তহবিলের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৩শ’ ৭৪ কোটি ৭৫ লাখ, ২০২২ সালে ৪শ’ ২০ কোটি ৭৭ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৪শ’ ৪৬ কোটি ৪১ লাখ টাকায় ওঠে। ২০২৪ সালে দাবি পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৩শ’ ৬৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২শ’ ৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকায়।

ফলে ২০২২ ও ২০২৩ সালে কোম্পানির দাবি পরিশোধের পরিমাণ ওই বছরের মোট প্রিমিয়াম আয়ের চেয়েও বেশি ছিল। ২০২৩ সালে দাবি-প্রিমিয়াম অনুপাত ছিল একশ ১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালেও ছিল একশ ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২৫ সালেও প্রিমিয়াম আদায়ের চেয়ে বীমা দাবির পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। অর্থাৎ প্রিমিয়াম আয় ছিল ২শ’ ৮২ কোটি টাকা আর বীমা দাবি পাওনা ছিল ২শ’ ৮৬ কোটি টাকা।

মেঘনা লাইফের জীবন তহবিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস বিনিয়োগ আয়। কিন্তু পাঁচ বছরের হিসাবে এখানেও দুর্বলতা দেখা যায়। ২০২০ সালে কোম্পানির বিনিয়োগ আয় ছিল ৯৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। ২০২১ সালে তা কমে ৮৯ কোটি ৭৬ লাখ, ২০২২ সালে ৮৫ কোটি ৭৯ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকায় নেমে আসে। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে বিনিয়োগ আয় দাঁড়ায় ৭৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

জানতে চাওয়া হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের জনসংযোগ কর্মকর্তা সাদিক আল আরমান শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, কর্তৃপক্ষের কাছে এসব বিষয়ে কোনো অভিযোগ আসলে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শীর্ষনিউজ