Image description

দোকানে লাইন ধরে সাজানো এলপিজি সিলিন্ডার। বিক্রেতার দাবি, বেশিরভাগই খালি। কিছুতে গ্যাস থাকলেও সেগুলো বিক্রির জন্য নয়; অর্ডারের মাল, শুধু ডেলিভারির অপেক্ষা। তবে সিলিন্ডারপ্রতি ৫০০ থেকে হাজার টাকা বাড়তি দিলেই পাঁচ মিনিটে মিলছে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার। পাশের গুদাম থেকে এনে রিকশায় তুলে দেওয়া হচ্ছে ক্রেতার হাতে।

 

অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই। আমদানিকারকরাও মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সরবরাহে ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন। ফলে গৃহস্থালি ও রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে বাজারে এক ধরনের লুকোচুরি চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

আমদানিকারক, সরবরাহকারী, খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দিলেও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন নেই। একদিকে পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকট, অন্যদিকে বোতলজাত গ্যাসের বাজারে এই অরাজকতাÑসব মিলিয়ে রান্নার জ্বালানি নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন কোটি কোটি গ্রাহক। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডারে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও রয়েছে।

 

বিইআরসি নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ১২ কেজির একেকটি সিলিন্ডার ১,৫৮৫ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ২,২৫০ থেকে ২,৫০০ টাকায়। কোনো কোনো দোকানে তিন হাজার টাকা চাওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। খুচরা দোকানে ৩৫ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ৫,৩৫০ থেকে ৫,৮০০ টাকায়। যদিও সরকার নির্ধারিত দাম ৪,৬২৪ টাকা। ৫,৯৪৫ টাকার ৪৫ কেজির সিলিন্ডার দোকানিরা বিক্রি করছেন ৬,৭৫০ থেকে ৭,০০০ টাকায়। ১,৯৮২ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া ১৫ কেজির একেকটি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২,৫৫০ থেকে ৩,০০০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়টি সবপক্ষই জানেন কিন্তু মুখে স্বীকার করছেন না। সরকারের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে আমদানিকারকরা বলছেন, আমদানি ও সরবরাহে ঘাটতি নেই। অথচ অনেক আমদানিকারক এলপিজি আমদানির সিডিউলই নিশ্চিত করতে পারছেন না।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব পড়েছে এলপিজি আমদানিতে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে কয়েকগুণ বেড়েছে জাহাজ ভাড়া। ফলে বেশি দাম দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে এলপিজি কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বেশকিছু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আমদানি বন্ধ রেখেছে।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আমদানিকারক বলেন, এলপিজির মূল্য নির্ধারণের সময় বিইআরসি টনপ্রতি ১৬০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে হিসাব করেছিল। বর্তমানে তা বেড়ে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে উঠেছে। বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করতে না পারায় কেউ কেউ আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একই সময়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোরও কেউ কেউ চুক্তির পুরো পরিমাণ পণ্য পাচ্ছে না।

 

তবে গত সোমবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এলপিজি অপারেটররা মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে আশ্বস্ত করেন, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই। আশ্বাসের পক্ষে গতকাল তারা একটি বিবৃতিও দিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ফোন ধরেননি কোনো নেতা।

 

দেশের বর্তমান এলপিজি আমদানির পরিমাণ, মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি, বাজারদর এবং আনুষঙ্গিক বিষয় পর্যালোচনার জন্য এ সভার আয়োজন করা হয়। বিদ্যুৎমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভায় দেশের এলপিজি খাতের সার্বিক চিত্র উপস্থাপন ও পর্যালোচনা করা হয়।

 

সভায় জানানো হয়, গত আগস্টে এক লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনে এক লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন এলপিজি আমদানি করা হয়। আমদানিকারক ও অপারেটররা দেশের জোগান ও মজুত পরিস্থিতি ভালো রয়েছে বলেও দাবি করেন।

 

দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশই যায় গৃহস্থালির রান্নায়। পরিবহন ও শিল্পকারখানায়ও এর ব্যবহার রয়েছে।

 

এপ্রিলের শুরুতে ১২ কেজি এলপিজির দাম ৩৮৭ টাকা এবং ১৯ এপ্রিল আরো ২১২ টাকা বাড়ানো হয়। তবে জুন ও জুলাইয়ে টানা দুই মাস দাম কমানো হয়। চলতি মাসের দাম নির্ধারণ করা হয় গত ২ সেপ্টেম্বর।

 

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বিইআরসি দাম পুনর্নির্ধারণ করতে পারে। এ আশঙ্কায় খুচরা বিক্রেতাদের কেউ কেউ বিক্রির চেয়ে মজুতের দিকে বেশি ঝুঁকছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

 

এদিকে, বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়টি জানলেও এখনই কঠোর অভিযান চালাতে ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিইআরসির কর্মকর্তারা। তাদের আশঙ্কা, অভিযান চালানো হলে ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে দিতে পারেন। এতে সরবরাহ আরো কমে সংকট বাড়তে পারে।

 

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, কয়েক দিন ধরে বাজারে এলপিজির বাড়তি দামের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সংকটের সময় অভিযান চালানোর ঝুঁকি রয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা দোকান বন্ধ করে দিলে সরবরাহ আরো কমতে পারে। আমদানি অব্যাহত রাখা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

 

বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা

এদিকে দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক রয়েছে জানিয়ে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, পর্যাপ্ত সরবরাহের পরও বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি বা অবৈধ মজুত করা হলে সরকারের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক।

 

লোয়াব জানায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে ১.৫৬ লাখ টন এবং আগস্ট মাসে ১.৫৮ লাখ টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো এলপিজি অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সিলিন্ডার বিক্রি করেন বা নিয়মবহির্ভূতভাবে মজুত করেন, তবে তা প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক অনলাইন সভায় জেলা প্রশাসকদের বাজার মনিটরিং করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষা ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সংস্থাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা বজায় রাখবে।