Image description

বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় উদীয়মান খাত তথা ‘সানরাইজিং ইন্ডাস্ট্রি’ এবং ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার, সৌর ও বায়ুর মতো নবায়নযোগ্য শক্তি, গ্রিন হাইড্রোজেন, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ও ব্যাটারি প্রযুক্তি, উন্নত বায়ো মেডিসিন, লাইফ সায়েন্স এবং ই-কমার্স, ডিজিটাল ব্যাংকিং, পেমেন্ট গেটওয়ে ও অনলাইন লজিস্টিকসের মতো ফিনটেক খাতে এই বিনিয়োগ বাড়াতে চান তারা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) ডিরেক্টর জেনারেল চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জির নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। ভারতের ভারী অবকাঠামো, জ্বালানি, ইভি ও বায়োটেকনোলজি খাতের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর প্রধানরা ছিলেন প্রতিনিধি। এই বহরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, মাহিন্দ্রা গ্রুপ, ভারত বায়োটেক, অ্যাপোলো হসপিটালস, গোদরেজ ইন্ডাস্ট্রিজ এবং অরবিন্দ লিমিটেডের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারকদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সফরকালে শুধু প্রস্তুত করা পণ্য রপ্তানি নয়; বরং ঢাকার কাছাকাছি সরাসরি ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট গড়ে তোলা, বাংলাদেশি তরুণ প্রকৌশলীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পিপিপি মডেলে মেগা অবকাঠামো নির্মাণের ওপর জোর দেন তারা।

অটোমোবাইল, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও অবকাঠামোগত বৃহৎ প্রকল্প নির্মাণে মাহিন্দ্রা গ্রুপ ও লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর মতো প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক সাফল্য রয়েছে। অন্যদিকে ভারত বায়োটেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠান বায়োমেডিসিন গবেষণা এবং গোদরেজ ও অরবিন্দ লিমিটেড তথ্যপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবস্থাপনায় কাজ করে আসছে সফলভাবে।

এসব উদীয়মান খাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অপার। বিপুলসংখ্যক তরুণ ও প্রযুক্তি খাতে ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট থাকায় আইটি ও এআই খাতে দেশের দ্রুত বিকাশ ঘটছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার কারণে ইভি ও সবুজ জ্বালানি খাতেও বিশাল সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশ সরকারও এসব নতুন খাতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দিচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব।

জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে কিছু রাজনৈতিক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে লক্ষ করছি, রাজনৈতিক ইস্যুগুলোকে একপাশে সরিয়ে ভারত বাণিজ্যিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে স্বাভাবিক এবং সক্রিয় রাখতে সচেষ্ট রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা কোনোভাবেই ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে না।’

তিনি আরও বললেন, ‘বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে এবং এই মুহূর্তে আমরা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছি। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুদেশের মধ্যকার এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি যেকোনো বৈদেশিক বিনিয়োগকেই আমরা স্বাগত জানাব, তবে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবসময় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখতে হবে।’

সরকার এসব সম্ভাবনাময় খাত ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বাজেটে বিভিন্ন ধরনের কর ছাড় ও প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ আয়কর ছাড়ের পাশাপাশি ব্যাটারি প্রযুক্তি ও লিথিয়াম আমদানিতে শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক যানবাহন নিবন্ধনে ট্যাক্স কমানো এবং ইভি চার্জিং স্টেশনের কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আইটি, স্টার্টআপ ও ফিনটেক খাতে কর ছাড় অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ও অনুমোদন ব্যবস্থা করা হয়েছে আরও সহজ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশগুলোর একটি ভারত। বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত সহস্রাধিক ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে, যা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় ভারতীয় নতুন বিনিয়োগের পথ দেখাচ্ছে।