ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তৈরি পোশাক রপ্তানি পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২৭ জাতির জোটের ১৫টি দেশেই তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। দেশগুলো বাংলাদেশের পোশাকের বড় বাজার। যেসব দেশে রপ্তানি সামান্য বেড়েছে, তার বেশির ভাগই বাংলাদেশের রপ্তানির ছোট বাজার। জোটগতভাবে ইইউ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি আসে এখান থেকে।
ইইউ জোটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার হচ্ছে জার্মানি। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় প্রধান বাজার। বিগত দিনে কোনো কোনো বছর যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি পোশাক রপ্তানি হয়েছে জার্মানিতে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, জার্মানিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছর অর্থাৎ আগের অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছর পোশাক রপ্তানি কম হয়েছে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থবছরের ৪৯৫ কোটি ডলারের রপ্তানি গত অর্থবছরে ৪৩৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
জার্মানিতে তৈরি পোশাকের ওভেনের (শার্ট, প্যান্ট) চেয়ে নিট ক্যাটেগরির পণ্য (গেঞ্জি জাতীয় পোশাক) রপ্তানি হয়ে থাকে। সেদেশে গত বছর নিটের রপ্তানি বেশি হারে কমেছে। নিট পোশাকের রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। ওভেনের কমেছে ১০ শতাংশের মতো। অবশ্য পোশাকের মোট রপ্তানিতে গত বছরও নিটের অংশই বেশি ছিল, যার পরিমাণ ২৬৮ কোটি ডলার। অন্যদিকে ওভেন পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৭০ কোটি ডলার।
গত অর্থবছরে ফ্রান্সে রপ্তানি কম হয়েছে ৯ শতাংশের মতো। পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯৭ কোটি ডলারের কিছু কম। আগের অর্থবছরে যা ছিল ২১৬ কোটি ডলার। ফ্রান্সে নিট পোশাকের রপ্তানি ১১ শতাংশ কমেছে। ওভেনের ক্ষেত্রে কমার হার ৫ শতাংশ। চতুর্থ প্রধান বাজার ইতালিতে রপ্তানি পরিস্থিতিও একই রকম। গত অর্থবছর দেশটিতে পোশাক রপ্তানি কম হয়েছে ৮ শতাংশের মতো। আগের অর্থবছরের ১৫৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি ১৪২ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। এখানেও ওভেনের তুলনায় নিটের রপ্তানি কমেছে বেশি হারে।
ইউরোপে নিট পোশাক রপ্তানিতে ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে নিট ক্যাটেগরির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান সমকালকে বলেন, নিট পণ্যে স্থানীয় মূল্য সংযোজন ওভেনের তুলনায় অনেক বেশি। গড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ। নিট উৎপাদনে স্থানীয় প্রক্রিয়া বেশি। এ কারণে কোনো সংকট এলে আগে নিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংক ঋণে সুদের উচ্চ হার কিংবা শ্রমিক অসন্তোষ এরকম যে কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলেই আঘাতটা নিট খাতে বেশি পড়ে।
ফজলে শামীম এহসান আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় বিশ্ব বাজারে রপ্তানি সংকুচিত হয়। আবার মার্কিন শুল্কহার এড়াতে চীন ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশ ইইউতে মনোযোগ বাড়িয়েছে। এরকম অনেক কারণে ইইউতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, বর্ধিত মূল্য ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি–এসব কারণে উৎপান ব্যয় অনেক বেড়েছে; যার কারণে অন্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগী সক্ষমতা কমেছে।
ইইউ জোটে রপ্তানি কমে যাওয়া বাকি দেশগুলোর মধ্যে ডেনমার্কে রপ্তানি কম হয়েছে ১০ শতাংশ। ১০৪ কোটি ডলারের রপ্তানি ৯৪ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। বেলজিয়ামে রপ্তানি কমেছে ৫ শতাংশ। রপ্তানি নেমে আসে ৫৩ কোটি ডলারে; যা আগের অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলার ছিল। চেক রিপাবলিকে কমেছে ৩ শতাংশ। ৩২ কোটি ডলার থেকে ৩১ ডলারে নেমে এসেছে পোশাক রপ্তানি। আয়ারল্যান্ডে রপ্তানি কমেছে ১০ শতাংশেরও বেশি। ২৫ থেকে ২৩ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। রোমানিয়ায় সবচেয়ে বেশি ২০ শতাংশ কমেছে রপ্তানি। রপ্তানি কমে হয়েছে ১৮ কোটি ডলার; যা আগের অর্থবছর ছিল ২৩ কোটি ডলার।
রপ্তানি কমে যাওয়া অন্য দেশগুলো হচ্ছে–পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া, ফিনল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ ও মাল্টা। অবশ্য,দ্বিতীয় প্রধান বাজার স্পেনে রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ৩৬০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছর যা ছিল ৩৪০ কোটি ডলার। রপ্তানি বাড়ার তালিকায় রয়েছে নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, স্লোভেনিয়া, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া, হাঙ্গেরি, সাইপ্রাস ও বুলগেরিয়া।
সব মিলিয়ে ইইউ জোটে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি ডলারের পোশাক; যা আগের অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৯৭১ কোটি ডলার। এক বছরে জোটে রপ্তানি কমে গেছে ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের পোশাকের রপ্তানি বাজার হিসেবে ইইউর হিস্যা কমে ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ।