Image description

টানা বৃষ্টিতে সুরক্ষিত এলাকায় রাখা আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির দায় নেবে না চট্টগ্রাম বন্দর। একই সঙ্গে কোনো জবাবদিহি করতেও বাধ্য নয় বলে কড়া ভাষায় বিজ্ঞপ্তি জারি। আইনের ধারা উল্লেখ করে বন্দর সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘যেকোনো পক্ষ থেকে আসা ক্ষতিপূরণের যেকোনো দাবি অস্বীকার, বর্জন এবং প্রত্যাখ্যান করছে।’

১০ জুলাই ২০২৬ বন্দর পরিচালক পরিবহন গোলাম মোহাম্মদ সারওয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষর করেন এ বিজ্ঞপ্তিতে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও শিপিং এজেন্টদের মধ্যে চরম অসন্তোষ। বিশেষ করে বন্দর ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে লেখা এরকম ভাষাকে ‘শিষ্টাচার-বহির্ভূত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ বলে মনে করছেন তারা।

গত ৫ জুলাই ২০২৬ চট্টগ্রাম নগর জুড়ে টানা ভারী বৃষ্টিপাতে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বৃষ্টির পানিতে বন্দরের ভেতর বিভিন্ন ইয়ার্ডে পণ্যভর্তি কনটেইনারের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কনটেইনারের নিচে জমে থাকা পানি ভেতরে ঢুকে পণ্যের ক্ষতি হওয়ার খবর জানা গেছে। একই সঙ্গে বন্দরেরই অংশ হিসেবে পরিচিত বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে পণ্য নষ্ট হওয়ার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে দেখা যায়। সেখানে বন্দরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়ে এবং ক্ষতিপূরণের দাবি ওঠে। এরপরই বন্দর গতকাল শুক্রবার এই কড়া বিজ্ঞপ্তি দিল।

ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক জানিয়েছেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার ত্রাণ দেয়। আর চট্টগ্রাম বন্দরের জিম্মায় থাকা পণ্য বিনষ্টের জন্য ক্ষতিপূরণের বদলে ব্যবসায়ীদের চপেটাঘাত দিল।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের দোহাই দিয়ে বন্দর দায় এড়াতে পারে না। পণ্য চুরি গেলে, দুর্ঘটনা ঘটলে, কনটেইনার হারানো গেলে দায় নিতেও দেখি না। বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে; কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নেই, বৃষ্টিতে পণ্য রক্ষার শেডও বানায়নি!’

গোলাম মোহাম্মদ সারওয়ারুল ইসলামের ইংরেজিতে লেখা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, পূর্বোক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপরোক্ত মালপত্র, কার্গো, কনটেইনার ইত্যাদির যে ক্ষতি এবং লোকসান হয়ে থাকতে পারে বা হয়েছে তা একটি অ্যাক্ট অব গড (দৈব দুর্বিপাক) এবং যার পরিণতির জন্য এই কর্তৃপক্ষ আইনত মোটেও দায়ী নয় এবং ‘দি রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চট্টগ্রাম পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কনটেইনার), ২০০১’-এর রেগুলেশন-১৯৯(১৪)-এর অধীনে সমস্ত পরিণতি থেকে মুক্ত। সৃষ্ট পূর্বোক্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উদ্ভূত যেকোনো পক্ষ/উৎস থেকে আসা ক্ষতিপূরণের যেকোনো দাবি অস্বীকার, বর্জন এবং প্রত্যাখ্যান করছে।

বন্দর ব্যবহাকারীরা বলছেন, সুরক্ষিত এলাকার ভেতর পণ্য বন্দরের জিম্মায় থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কারও হাত নেই। কিন্তু বন্দরের নিজেদের অবহেলা-ত্রুটির কারণে পণ্য ক্ষতির দায় বন্দরকেই নিতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু বললেন, ‘আইনের অজুহাত দিয়ে বন্দর দায় এড়াতে চাইছে। কিন্তু এই পণ্য তো তাদের জিম্মায় আছে। সেগুলো ক্ষতির দায় তাদেরকেই নিতে হবে, কোনো বিকল্প নেই। আর এটা যদি না করে, তাহলে শিপিং বাণিজ্যে বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে।’

৫ জুলাইয়ের পর বন্দরের কাছ থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতিপূরণের আবেদন করেনি বলে জানিয়েছেন বন্দর ভারপ্রাপ্ত সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। তাহলে আগেভাগে কেন বিজ্ঞপ্তি, এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন ‘যেহেতু ক্ষতিপূরণের দায় নেব না। তাই আগেই জানিয়ে দেওয়া হলো।’

বন্দর-শিপিং নিয়ে কাজ করেন এমন এক সিনিয়র আইনজীবী জানালেন, আইন অনুযায়ী, কোনো ঘটনাকে ‘অ্যাক্ট অব গড’ বলে দায় এড়াতে হলে দুটি শর্ত পূরণ হতে হবে। ঘটনাটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত হতে হবে। আর ক্ষতি এড়ানোর জন্য মানুষের বা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও কোনো উপায় ছিল না। সেটি প্রমাণ করতে হবে। এখানে বন্দরের সব ইয়ার্ড পানিতে ডুবেনি। সেজন্য এটি কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলিত আচরণ‘ হিসেবে গণ্য হতে পারে। কেউ আদালতে মামলা করে এর ক্ষতিপূরণ পাবেন।

এখনো পর্যন্ত পানিতে ডুবে কী পরিমাণ পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার প্রকৃত হিসাব জানা সম্ভব হয়নি।