Image description

এতদিন যে খেজুরের বিচিকে মানুষ অপ্রয়োজনীয় ভেবে অবহেলায় ফেলে দিত, তা দিয়েই এখন তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু কফি! শুনতে অবাক লাগলেও এমনটাই বাস্তবে রূপ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন বাগেরহাট সদর উপজেলার উৎকুল এলাকার পল্লী চিকিৎসক হাওলাদার মোহাম্মদ আলী।

অবহেলায় পড়ে থাকা এই উপাদানকে কাজে লাগিয়ে নতুন এক সম্ভাবনাময় পণ্য তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন এই পল্লী চিকিৎসক।

উদ্যোক্তা হাওলাদার মোহাম্মদ আলী জানান, ইউটিউবে খেজুরের বিচি দিয়ে কফি তৈরির একটি ভিডিও দেখে মূলত তার মাথায় এই আইডিয়া আসে। এরপর তিনি নিজ উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে এর উৎপাদন শুরু করেন।

তার দাবি, বাগেরহাট জেলায় তিনিই প্রথম খেজুরের বিচি দিয়ে এই কফি তৈরি করছেন।

মোহাম্মদ আলী বলেছেন, ‘সৌদি আরবে যদি খেজুরের বিচি দিয়ে কফি তৈরি করা যায়, তাহলে আমরা কেন পারব না—এই চিন্তা থেকেই কাজ শুরু করি।’

প্রায় ২৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে তিনি এই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেন। বর্তমানে তার এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে পাঁচজন শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের দৈনিক ৫০০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়।

কফি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে এই উদ্যোক্তা জানান, খেজুরের মৌসুমেই মূলত এই কফি উৎপাদন করা হয়। প্রথমে খেজুরের কাঁদি প্রতি ২০ টাকা দরে কিনে তা থেকে বিচি সংগ্রহ করা হয়। এরপর বিচিগুলো পানিতে ভিজিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়। খোসা ছাড়িয়ে কড়া রোদে শুকানোর পর কড়াইয়ে বালির সঙ্গে এগুলোকে ভেজে নেওয়া হয়। সবশেষে মেশিন বা ব্লেন্ডারে গুঁড়া করে প্রস্তুত হয় কাঙ্ক্ষিত কফি। পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাসায়নিক বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না।

হাওলাদার মোহাম্মদ আলী জানান, এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২০ হাজার টাকার কফি বিক্রি করেছেন। স্থানীয়ভাবে এর ব্যাপক চাহিদাও তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ এই কফি কিনতে তার কাছে আসছেন। ভবিষ্যতে অনলাইনে বাজারজাত করে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এই পণ্য পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

‘প্রথমে বিষয়টি শুনে অবাক হয়েছিলাম। পরে খেজুরের বিচির কফি পান করে দেখেছি। এর স্বাদ ও ঘ্রাণ বেশ ভালো। এলাকার মানুষও আগ্রহ নিয়ে কিনছেন। এটি বাগেরহাটের জন্য একেবারেই একটি নতুন উদ্যোগ’, নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মোল্লা আজম শেখ।

হাওলাদার মোহাম্মদ আলীর কফি নিয়মিত পান করছেন কাসেম আলী নামে এক বৃদ্ধ। তিনি বলেছেন, আমি নিয়মিত এই কফি পান করছি। আমার ডায়াবেটিসের কিছুটা উপকার পেয়েছি বলে মনে হচ্ছে। স্বাদও ভালো লাগছে। তবে আমার এই বয়সে এমন কফি আমি আর খাই নাই।

 

এই উদ্যোগে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। উৎপাদন কাজে নিয়োজিত শ্রমিক মামুন শেখ বলেছেন, ‘খেজুরের মৌসুমে এখানে কাজ করে আয় করতে পারছি। বিচি সংগ্রহ, পরিষ্কার, শুকানো ও ভাজার কাজ করি। এই উদ্যোগের কারণে এলাকার আমাদের মতো কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।’

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন জানান, খেজুরের বিচি সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। সেই বিচি ব্যবহার করে মূল্য সংযোজনমূলক পণ্য তৈরি করা একটি ইতিবাচক ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ। এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই কফির স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে হলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।