Image description

দেশের জীবন বীমা (লাইফ ইন্স্যুরেন্স) খাতে কোম্পানিগুলোর মোট সম্পদ ৫১ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড করেছে। তবুও সুফল মিলছে না সাধারণ গ্রাহকদের ভাগ্যে। আর্থিক খাতের টানা প্রবৃদ্ধি ও হাজার কোটি টাকার প্রিমিয়াম আয়ের জাঁকজমকপূর্ণ খতিয়ানের আড়ালে এখনো ঢাকা পড়ে আছে প্রায় ১২ লাখ ভুক্তভোগী পরিবারের কান্না। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে চূড়ান্ত আর্থিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোম্পানিগুলোর হাতে ৫১ হাজার ৪৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও, অলস ও অনিষ্পন্ন অবস্থায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে গ্রাহকদের ৪ হাজার ৪০৩ কোটি ২০ লাখ টাকার বৈধ বীমা দাবি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, টাকার অঙ্কে বীমা দাবি নিষ্পত্তির গড় হার মাত্র ৬৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ হলেও পলিসির সংখ্যার দিক থেকে তা ৫৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৪২ শতাংশ গ্রাহকই মেয়াদ শেষে বা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর পরও তাদের প্রাপ্য টাকা সময়মতো পাচ্ছেন না। মেটলাইফ বাংলাদেশ বা ন্যাশনাল লাইফের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো শতভাগের কাছাকাছি দাবি মিটিয়ে খাতের সুনাম ধরে রাখলেও, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ ও সানফ্লাওয়ার লাইফের মতো কিছু কোম্পানির চরম অনিয়ম ও অর্থ সংকটের দায় বইতে হচ্ছে পুরো খাতকে।

নিয়মের তোয়াক্কা না করে কোম্পানিগুলোর সীমাহীন ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় এ সংকটের মূল কারণ— এমনটাই উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনডিপির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) অনুমোদিত সীমার বাইরে শতকোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করায় খালি হয়েছে সাধারণ গ্রাহকের আমানত বা ‘লাইফ ফান্ড’। সরকারি প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশনই অনুমোদিত সীমার বাইরে গিয়ে সর্বোচ্চ ২৪৬ কোটি ৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে। ফলে সম্পদ দৃশ্যমান হলেও মেয়াদপূর্তিতে গ্রাহককে দেওয়ার মতো নগদ অর্থের তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে এই খাত, যা ধসিয়ে দিচ্ছে পুরো বীমা ব্যবস্থার ওপর জনমানুষের আস্থার ভিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দিন আগামীর সময়কে বলেছেন, অনেক বীমা কোম্পানির আর্থিক বিবরণী দেখলে দেখা যায় স্থায়ী সম্পদ, বহুতল ভবন এবং বিনিয়োগের পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সাধারণ গ্রাহকের পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের বীমা দাবি পরিশোধের হার সেই অনুপাতে বাড়ছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা স্থবির বা নিম্নমুখী।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর হস্তক্ষেপের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছেন, আইডিআরএ’র উচিত কোম্পানিগুলোর সম্পদ মূল্যায়নের পাশাপাশি কত শতাংশ বীমা দাবি সফলভাবে এবং সময়মতো পরিশোধ করছে, তার ভিত্তিতে রেটিং বা লাইসেন্স নবায়ন করা। যে কোম্পানিগুলো সম্পদ বাড়াচ্ছে, কিন্তু দাবি পরিশোধে গড়িমসি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিআরএ’র মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বীমা খাতে আস্থার সংকট কাটাতে আইডিআরএ মনিটরিং ব্যবস্থা আগের চেয়ে জোরদার করেছে। যেসব কোম্পানির ক্লেইম সেটেলমেন্ট রেশিও (সিএসআর) সন্তোষজনক নয়, তাদের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে স্থায়ী সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের জমানো টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’