কোরবানির ঈদ এলেই একসময় দেশের চামড়া শিল্পে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরত। এতিমখানা-মাদরাসা থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ী—সবার চোখ থাকত কাঁচা চামড়ার বাজারে। কিন্তু সেই বাজারে নেমেছে ভয়াবহ ধস। সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি না হওয়া শত শত গরুর চামড়া নদীর পাড়ে, সড়কে কিংবা খোলা জায়গায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও মাটিচাপা, কোথাও নদীতে নিক্ষেপ। পুরো পরিস্থিতি যেন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতের ভয়াবহ পতনের প্রতিচ্ছবি। তবে এ বিষয়ে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
কোরবানির চামড়ার বাজারে প্রতিবছরই কেন এই বিপর্যয় ঘটে— এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। সরকারের কৃত্রিমভাবে দাম নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক বাজার হারানো, চীনের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা, ট্যানারির সংকট, পরিবেশগত সনদ না পাওয়া এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক বাজার কাঠামো— সব মিলিয়ে দেশের চামড়া শিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের নীলডুমুর খেয়াঘাটে খোলপেটুয়া নদীর তীরে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকা চামড়া কিংবা ফেনীর কাটাখালি নদীতে ফেলে দেওয়া শতাধিক গরুর চামড়া শুধু স্থানীয় সংকট নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত বহন করে। তবে সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের চামড়ার মূল্য বেঁধে দেওয়া, দ্বিতীয়ত চামড়ার রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়া। রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনই একমাত্র ভরসা। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো বড় বাজারের ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়ার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
প্রতি বছর ঈদের আগে সরকার ঢাকায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। এ বছরও রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৬০–৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫–৬০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় ২০–৩০ টাকার বেশি দাম মেলেনি। কোথাও কোথাও চামড়া একেবারেই বিক্রি হয়নি। যদিও গত দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার রপ্তানি বেড়েছে, তবে সে অনুপাতে দেশে মূল্য বাড়েনি। চাহিদা থাকলেও মৌসুমি ও ছোট ব্যবসায়ীরা সরকারের নির্ধারিত দাম পাচ্ছেন না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার প্রশাসনিকভাবে দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে সেই দামে কেনার সক্ষমতা বা চাহিদা তৈরি করতে পারেনি। ফলে ঘোষিত মূল্য কার্যত কাগুজে ঘোষণায় পরিণত হয়েছে। সরকার কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম মূল্য ঘোষণা করলেও তা কার্যকরে কোনো কার্যকর মনিটরিং নেই। ফলে বাজার পুরোপুরি মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, কোরবানির চামড়ার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের চামড়া শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করা সরকারের লক্ষ্য। জুলাই মাসের মধ্যে চামড়া খাতের উন্নয়ন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব (রুটিন দায়িত্ব) আবদুর রহিম খান আগামীর সময়কে জানান, কোরবানির ঈদে একদিনে প্রায় এক কোটি পিস চামড়া বেচাকেনা হয়। ফলে বাজারে সরবরাহের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ কারণে সরকার এখানে হস্তক্ষেপ করে থাকে।
এদিকে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বড় ক্রেতা এখন মূলত চীন। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, রপ্তানির বড় অংশই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চীনা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা এখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনে অর্থনৈতিক মন্দা, শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় দেশটি আগের মতো চামড়া কিনছে না। এমনকি কিনলেও তুলনামূলক কম দামে কিনছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ ও পশ্চিমা বাজারে প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ এক ধরনের “সিঙ্গেল মার্কেট ট্র্যাপ”-এ আটকে গেছে। ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো এখনও সাভারের ট্যানারি শিল্পাঞ্চলের পরিবেশগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আন্তর্জাতিক মানের সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় অনেক বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশি চামড়া এড়িয়ে চলছে।
চামড়া খাতের ট্যানারি আয়ুব ব্রাদার্স লিমিটেডের পরিচালক বেলাল হোসেন শুক্রবার আগামীর সময়কে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় ট্যানারি মালিকরা কম দামে চামড়া কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
তার মতে, সরকারকে আগে চামড়া শিল্পের সমস্যার শিকড়ে যেতে হবে। সেখানে সমাধান করা গেলে কোরবানির চামড়ার মূল্য বেঁধে দেওয়া বা না দেওয়া তেমন প্রভাব ফেলবে না। বর্তমানে আমরা শুধু চীনের বাজারের ওপর ভরসা করে পুরো চামড়া খাত পরিচালনা করছি। সেখান থেকে বের হতে হলে আমাদের কারখানাগুলোকে কমপ্লায়েন্স করতে হবে। এ জন্য সরকারের সহায়তা প্রয়োজন।
মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, কাঁচা চামড়ার বাজার কয়েকটি বড় গ্রুপ ও ট্যানারি মালিকের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ঈদের সময় তারা সমন্বিতভাবে কম দামে চামড়া কিনে থাকে।
ফলে গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজার পায় না। অনেক এলাকায় পাইকাররা ইচ্ছাকৃতভাবে দেরিতে বাজারে আসে, যাতে চামড়া পচে যাওয়ার ভয় তৈরি হয় এবং সংগ্রাহকরা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন।
যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মুক্তাদির বলেছেন, সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ, ব্যবসায়ী–আড়তদারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মসজিদ–মাদরাসাভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে এবারের কোরবানির অধিকাংশ চামড়া ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় সংগ্রহ করা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী।