Image description

ঈদ এলেই দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি পুরোনো সংকট নতুন করে সামনে আসে—এটিএম বুথে নগদ টাকার ঘাটতি। প্রতি বছরই দীর্ঘ ছুটির সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথে টাকা না থাকা, কারিগরি ত্রুটি কিংবা সেবা বন্ধ থাকার অভিযোগ ওঠে। তবে এবার পরিস্থিতি যেন আরও উদ্বেগজনক। ঈদের ছুটি শুরুর আগেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে এখন বড় প্রশ্ন—ব্যাংক খোলা থাকা অবস্থাতেই যদি টাকা পাওয়া না যায়, তাহলে টানা সাত দিনের ঈদের ছুটিতে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে  ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলো টানা সাত দিনের ছুটিতে যাচ্ছে। যদিও সীমিত আকারে কিছু শাখা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তবে সাধারণ গ্রাহকদের বড় অংশ নগদ লেনদেনের জন্য নির্ভর করছেন এটিএম বুথ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর। কিন্তু ঈদের আগের শেষ কর্মদিবসেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যে চিত্র দেখা গেছে, তা গ্রাহকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বুথে বুথে একই চিত্র

রবিবার (২৪ মে) সকাল থেকেই রাজধানীর রামপুরা, মতিঝিল, মগবাজার, শাহবাগ, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথে বাড়তি ভিড় দেখা যায়। কোথাও টাকা শেষ, কোথাও ‘আউট অব সার্ভিস’, আবার কোথাও টাকা থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে গ্রাহকদের। অনেকেই এক বুথ থেকে আরেক বুথে ঘুরেও টাকা পাননি।

রামপুরা এলাকায় একটি এটিএম বুথে টাকা তুলতে এসে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রহমান মাসুম। কিন্তু অপেক্ষার একপর্যায়ে জানতে পারেন বুথে আর টাকা নেই। শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে তাকে।

 

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মতিঝিলে টাকা তুলতে আসা গ্রাহক শামছুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথমে ট্রাস্ট ব্যাংকের বুথে গিয়ে দেখেন টাকা নেই। পরে পাশের ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথেও একই অবস্থা। শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের প্রধান শাখায় গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পর টাকা তুলতে সক্ষম হন।

শুধু এটিএম বুথ নয়, কিছু ব্যাংক শাখাতেও নগদ অর্থের ঘাটতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর মগবাজারে উত্তরা ব্যাংকের একটি শাখায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর এক গ্রাহককে জানানো হয়, আপাতত টাকা নেই। প্রয়োজনে অন্য শাখা থেকে টাকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক গ্রাহক। মৌসুমি ইসলাম নামে এক গ্রাহক বলেন, “ঈদের আগে মানুষের সবচেয়ে বেশি টাকা দরকার হয়। আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর এসে যদি বলা হয় টাকা নেই, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?”

কেন বাড়ছে এই সংকট

ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের সময় নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েক দিনে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ তুলতে চান গ্রাহকরা। কারণ ঈদকে কেন্দ্র করে কেনাকাটা, কোরবানির পশু কেনা, গ্রামের বাড়িতে যাওয়া এবং আত্মীয়স্বজনকে টাকা পাঠানোর মতো ব্যয় বেড়ে যায়।

অন্যদিকে টানা ছুটির কারণে অনেক ব্যাংক পর্যাপ্ত জনবল নিয়ে এটিএম বুথে নগদ অর্থ পুনরায় সরবরাহ (রিফিল) করতে পারে না। নিরাপত্তা ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এখানে বড় কারণ। ফলে কিছু সময়ের মধ্যেই অনেক বুথ টাকাশূন্য হয়ে পড়ে।

এবার পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে কারিগরি ত্রুটি ও নেটওয়ার্ক সমস্যার অভিযোগ। গ্রাহকদের অভিযোগ, অনেক বুথে টাকা থাকলেও ধীরগতির নেটওয়ার্ক বা সফটওয়্যার সমস্যার কারণে লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে না। আবার কোথাও টাকা না থাকলেও বুথ সচল দেখাচ্ছে, ফলে গ্রাহকদের অযথা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

নির্দেশনা আছে, বাস্তবায়ন কোথায়?

ঈদকে সামনে রেখে গ্রাহক ভোগান্তি এড়াতে আগেই বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২১ মে পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট থেকে তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো এক সার্কুলারে বলা হয়, ঈদের ছুটিকালীন এটিএম বুথে সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত সমাধানেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া এমএফএস, পিওএস, কিউআর কোড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকদের জন্য হেল্পলাইন সচল রাখা, তাৎক্ষণিক এসএমএস অ্যালার্ট চালু রাখা এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে ‘টু ফ্যাক্টর অথেন্টিফিকেশন’ নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ করেছে। কোনো ব্যাংকই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা না পেয়ে ফেরেনি। এখন কোনো ব্যাংক যদি নিজস্ব গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী নগদ অর্থ সরবরাহে ব্যর্থ হয়, সেটি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার বিষয়।

তিনি আরও বলেন, ঈদের ছুটিতে এটিএম বুথ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সচল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যাংক এ বিষয়ে অবহেলা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পরও শেষ কর্মদিবসেই যদি অধিকাংশ এলাকায় এটিএম বুথে নগদ সংকট দেখা দেয়, তাহলে দীর্ঘ ছুটির মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ডিজিটাল লেনদেন কি বিকল্প হতে পারে?

ব্যাংকাররা বলছেন, নগদ টাকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর বিকল্প নেই। বর্তমানে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু থাকলেও দেশের বড় অংশের মানুষ এখনও ঈদের কেনাকাটা ও কোরবানির বাজারে নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীল।

বিশেষ করে পশুর হাট, স্থানীয় বাজার এবং গ্রামের অর্থনৈতিক লেনদেনে এখনো নগদ অর্থের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ফলে এটিএম বুথে নগদ সংকট তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর।

বাড়ছে গ্রাহকদের উদ্বেগ

ব্যাংক খোলা থাকা অবস্থায়ই যখন গ্রাহকরা নগদ অর্থ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন টানা ছুটির মধ্যে এটিএম বুথ সচল রাখা এবং পর্যাপ্ত নগদ সরবরাহ নিশ্চিত করা ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রতিবছরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশনা দেয়, কিন্তু বাস্তবে তার কার্যকর নজরদারি খুব কম দেখা যায়। ফলে একই সংকট বারবার ফিরে আসে। অনেকের মতে, শুধু সার্কুলার জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখন দেখার বিষয়, ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে ব্যাংকগুলো কতটা কার্যকরভাবে এটিএম বুথে নগদ অর্থ সরবরাহ ও ডিজিটাল সেবা সচল রাখতে পারে। কারণ ঈদের আনন্দ অনেকটাই নির্ভর করছে মানুষের প্রয়োজনের সময় সহজে নিজের টাকায় প্রবেশাধিকার পাওয়ার ওপর।