বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প আবারও বৈশ্বিক স্বীকৃতিতে নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে। সম্প্রতি আরও তিনটি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘লিড’ (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) সনদ অর্জন করেছে। এর ফলে দেশে লিড সনদপ্রাপ্ত তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৭-এ। এর মধ্যে ১২৪টি প্লাটিনাম এবং ১৪৪টি গোল্ড রেটিং পেয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বের সর্বোচ্চ স্কোরধারী ১০০টি লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানার মধ্যে এখন বাংলাদেশের রয়েছে ৫৩টি। পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং টেকসই উৎপাদনে এটিকে বাংলাদেশের বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় নিম্নমূল্যের পোশাক উৎপাদনের দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ এখন ধীরে ধীরে ‘সবুজ ও টেকসই পোশাকশিল্পের বৈশ্বিক হাব’ হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। বিশেষ করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, জ্বালানি দক্ষতা এবং পানি ব্যবস্থাপনায় বড় বিনিয়োগের সুফল এখন দৃশ্যমান হচ্ছে।
নতুন যুক্ত হওয়া তিন কারখানা
সম্প্রতি লিড সনদ পাওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি গাজীপুরে এবং একটি সাভারে অবস্থিত। তিনটিই প্লাটিনাম ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি পেয়েছে। এরমধ্যে একটি হলো বিগ বস করপোরেশন লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটির কারখানা গাজীপুরের অ্যাপটেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠানটি ‘লিড বিডি প্লাস সি: ওয়্যারহাউসেস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারস ভার্সন ৪’ রেটিং সিস্টেমে ৯০ পয়েন্ট অর্জন করে প্লাটিনাম সনদ পেয়েছে। অত্যাধুনিক গুদাম ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর কারণে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ স্কোর অর্জন করেছে বলে জানা গেছে।
লিড সনদ পাওয়া দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটি হলো, ইউনিয়ন লেবেল অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড। ইউনিয়ন গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এই কারখানাটি ‘লিড ও প্লাস এম: এক্সিস্টিং বিল্ডিংস ভার্সন ৪.১’ রেটিং সিস্টেমে ৮৫ পয়েন্ট পেয়ে প্লাটিনাম সনদ অর্জন করেছে। বিদ্যমান ভবনকে পরিবেশবান্ধব ও শক্তি সাশ্রয়ী ব্যবস্থায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে এটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তৃতীয় সনদ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি মূলত যৌথ শিল্প কমপ্লেক্স। সাভারের তেঁতুলঝোড়ায় অবস্থিত ‘ভারটেক্স ওয়্যার লিমিটেড’, ‘ড্রেস ওয়ার্ল্ড লিমিটেড’ এবং ‘নিও ফ্যাশন লিমিটেড’- এর যৌথ কারখানাটি ‘লিড বিডি প্লাস সি: নিউ কনস্ট্রাকশন ভার্সন ৪’ রেটিং সিস্টেমে ৮১ পয়েন্ট অর্জন করে প্লাটিনাম সনদ পেয়েছে। পরিবেশবান্ধব নির্মাণশৈলী, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি এ স্বীকৃতি অর্জন করে।
কেন এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ
লিড সনদ মূলত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল দিয়ে থাকে। একটি কারখানা কতটা পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী, পানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ এবং কর্মপরিবেশে নিরাপদ, তার ভিত্তিতেই এ সনদ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় ব্র্যান্ড পরিবেশবান্ধব উৎপাদনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে গ্রিন কারখানার সংখ্যা বাড়ার অর্থ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাওয়া। বিশ্ববাজারে এখন ক্রেতারা শুধু কম দামে পণ্য চান না; তাঁরা জানতে চান, পণ্য উৎপাদনের সময় পরিবেশের কতটা ক্ষতি হয়েছে, শ্রমিকেরা কতটা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করেছেন এবং কারখানাটি কতটা টেকসই ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। সে জায়গায় বাংলাদেশ এখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে সক্ষম হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার তুলনামূলক কম হয়। একই সঙ্গে এসব কারখানায় কর্মপরিবেশ উন্নত হওয়ায় শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতাও বাড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচ কমে আসে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বাড়ে। বিশেষ করে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক খাতকে ঘিরে যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল, গত এক দশকে গ্রিন কারখানার বিস্তার সেই ভাবমূর্তি বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তবে শুধু উৎপাদন নয়, এখন টেকসই শিল্পায়নেও নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে দেশটি। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানার মধ্যে ৫৩টি বাংলাদেশের হওয়া সেই বার্তাই দিচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন নীতি, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ আরও বাড়বে। সে বাস্তবতায় বাংলাদেশের গ্রিন কারখানাগুলো রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন শুধু উৎপাদন সক্ষমতায় নয়, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নেও বিশ্বে উদাহরণ তৈরি করছে। নতুন নতুন গ্রিন কারখানা যুক্ত হওয়ায় দেশের ব্র্যান্ড ইমেজ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা আরও বাড়বে।’