দেশের ব্যাংকিং খাত এখন এক গভীর সংকটের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাইরে থেকে নতুন শাখা, ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ কিংবা আমানতের প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ভেতরে জমেছে অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার পাহাড়। খেলাপি ঋণের বিস্তার, রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি, তারল্য সংকট, উচ্চ সুদহার এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ— সব মিলিয়ে দেশের আর্থিক খাতের ভিত্তি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে।
অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এখন সময় এসেছে একটি কঠোর কিন্তু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। তাদের মতে, ব্যাংক খাতে প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার চিত্র বদলে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সংকট এখন টাকার নয়, আস্থার।
আস্থাহীনতার কেন্দ্রবিন্দুতে ব্যাংকিং খাত
গত এক দশকে দেশের ব্যাংক খাতে এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও বড় ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর তা ফেরত না দিয়েও পার পেয়ে গেছেন। পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড়, আদালতের স্থগিতাদেশ কিংবা নীতিগত সুবিধা ব্যবহার করে অনেকেই দায় এড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে সৎ উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে হিমশিম খেয়েছেন।
কিছু ব্যাংকে আমানতকারীরা নিজেদের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কোথাও চেক ফেরত গেছে, কোথাও সীমিত পরিমাণে টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি পুরো অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়লে শিল্প, ব্যবসা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ–সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যাংকিং খাতের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়েছিল
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ব্যাংক খাতে নানা অনিয়ম ও লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী ব্যাংকের মালিকানা দখল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চাপ দিয়ে টাকা ছাপানোর সুযোগ নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান শুরু হবে। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে– এমনটাই আশা করেছিলেন অনেকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের একটি ধারা ঘিরে। সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন যুক্ত হওয়া ১৮(ক) ধারা একীভূত পাঁচ ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের আবারও নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি করছে।
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে উদ্বেগ
ব্যাংক খাতের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংককে শুধু একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, বরং কোটি মানুষের আস্থা, প্রবাসীদের স্বপ্ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়।
প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, বিপুল আমানত, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং শিল্প খাতে বড় বিনিয়োগের কারণে ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সম্প্রতি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তবে বাস্তবে ব্যাংকটির শক্তিশালী আমানতভিত্তি, বিস্তৃত গ্রাহক নেটওয়ার্ক এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সহায়ক শক্তি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হলে এর প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাই নেতিবাচক চাপে পড়বে।
একীভূত পাঁচ ব্যাংক ও বিতর্কিত ধারা
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ এর আওতায় গত বছর এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। পুরো ব্যাংকিং খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের গড় হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২ ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঘাটতিই ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।
এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ধারার মাধ্যমে অতীতে অনিয়মে জড়িত পুরোনো শেয়ারহোল্ডারদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অংশও এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কারণ, যাদের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, নামে-বেনামে ঋণ নেওয়া ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ দিলে পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আইএমএফ- বিশ্বব্যাংকের চাপ
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংক এ ধরনের বিধান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, একীভূত ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখা হলে তা সরকারের সংস্কারবিরোধী অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি আরও প্রায় ২০০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাংক থেকেও অতিরিক্ত অর্থায়নের আলোচনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আস্থা হারানো সরকার চায় না।
কারণ অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফ কর্মসূচি ব্যাহত হলে শুধু ঋণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ঋণমান, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে লেনদেনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘সুশাসন ছাড়া সমাধান নেই’
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ব্যাংক একীভূত করলেই সংকটের সমাধান হবে না। যদি রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও অনিয়ম একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে নতুন কাঠামোও ব্যর্থ হবে।
তারা বলছেন, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা; বিদেশে অর্থ পাচারের তদন্ত ও সম্পদ জব্দ; ব্যাংক পরিচালক হওয়ার যোগ্যতায় কঠোরতা; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা; রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ; আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরীক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও সম্পদ জব্দের মতো পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে।
তারল্য সংকট ও উচ্চ সুদের চাপ
ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় সমস্যা এখন তারল্য সংকট। অনেক ব্যাংক উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। ফলে ঋণের সুদও বেড়ে যাচ্ছে। এতে শিল্প খাতে বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহকের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অর্থনীতিতে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করতে হলে বাজারভিত্তিক কিন্তু নিয়ন্ত্রিত সুদনীতি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে শৃঙ্খলা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
‘ব্যাংক খাতের লুট নিয়ে থ্রিলার সিনেমা হতে পারে’
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘দেশের ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়: প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং খাত– জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে বিশিষ্টজনেরা ব্যাংক খাতের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, যারা ব্যাংক খাতে সমস্যা তৈরি করেছে, তাদের ফেরত আনতে আইনে নতুন ধারা কেন যুক্ত করা হলো– তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নৈতিক সক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ব্যাংক দখল নিয়ে যেসব তথ্য বেরোচ্ছে, তা দিয়ে থ্রিলার সিনেমা হতে পারে।
ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মঈন উদ্দিন বলেন, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে কঠিন সংস্কারের পথ বেছে নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ সংকট শুধু ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ– এসব ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু ব্যাংক খাতের গভীর সংকট সমাধান ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের ভাষায়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। হয় সুশাসন, জবাবদিহি ও কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার পথে হাঁটতে হবে, নয়তো সংকট আরও গভীর হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন প্রয়োজন শুধু একটি সাহসী সিদ্ধান্ত– যে সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনবে, দুর্নীতির সংস্কৃতি ভাঙবে এবং সাধারণ মানুষের জমানো অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাত।