তদারকির ঘাটতির কারণে ঈদের পর থেকেই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম আরও এক দফা বাড়াতে ৫-৬টি প্রভাবশালী কোম্পানির একটি সিন্ডিকেট নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে। মূলত রমজানের শুরু থেকেই এ চক্রটি পরিকল্পিতভাবে ডিলারদের মাধ্যমে খুচরা বাজারে তেলের সরবরাহ কৃত্রিমভাবে সীমিত করে রাখে।
এবার ইরান যুদ্ধের অজুহাতে নিত্যপণ্যের বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট চক্র। জ্বালানি সংকট পরিবহণেও-এমন অজুহাত ও পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকার কারণে বাজারে পণ্যমূল্য বাড়ছে বলে ওই অসাধু চক্রের দাবি।
তাদের কাছে ক্রেতারা এক ধরনের জিম্মি দশায় পড়েছেন। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল সরকার নির্ধারিত মূল্য ১৭৬ টাকা। কিন্তু সুযোগ পেয়ে তারা বিক্রি করছে ২০৮ টাকায়। শুধু তাই নয়, উধাও করা হচ্ছে বোতল সয়াবিন। ঈদের পর বাজারে যে ব্রয়লার মুরগির কেজি ছিল ১৮০ টাকা তা এখন ২২০ টাকায় বিক্রি করছে। কেজিতে ১০০ টাকা বাড়িয়ে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ টাকা। ৬৫০ টাকার দেশি মুরগি ৮০০ টাকায় ঠেকেছে। ২০০ টাকা কেজির নিচে মিলছে না কোনো মাছ। সঙ্গে চাল-ডালের মূল্যও অস্বাভাবিক। প্রতি কেজি মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল ৫৬-৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের চালের মধ্যে বিআর ২৮ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৮ টাকা আর সরু চালের মধ্যে মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা। পাশাপাশি প্রতি কেজি মোটা মসুর ডাল ১০৫-১১০, মাঝারি দানার মসুর ডাল ১২০ ও সরু দানার মসুর ডাল ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ২০৫-২০৮ টাকা। যা ডিসেম্বরে সরকার প্রতি লিটার ১৭৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। সেক্ষেত্রে লিটারপ্রতি ৩০ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে দাম না বাড়লেও সরবরাহ কমিয়ে কোম্পানিগুলো বাজার থেকে উধাও করছে বোতল সয়াবিন তেল।
পণ্যের অগ্নিমূল্যে দিশেহারা মধ্য ও নিম্নবিত্তরা। দাম এতই বেড়েছে যে, ফলের দোকানে এখন আর ঢোকাও কঠিন।
এদিকে নিত্যপণ্যের সঙ্গে সব ধরনের সেবা সামগ্রীর দামও লাগামহীনভাবে বাড়ছে। বাজারের অগ্নিমূল্যের সঙ্গে মানুষের আয় না বাড়ায় বাধ্য হয়ে ভোক্তা খাবার উপকরণ কমিয়ে কিনছেন। একই সঙ্গে কমাতে হচ্ছে ভ্রমণ, শিক্ষা, বিনোদনসহ অন্যান্য খাতের খরচ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আয় ও ব্যয়ের মধ্য সমন্বয় করতে তারা অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন অনেক খরচ কমিয়ে দিয়েছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, পণ্যের বেসামাল দামে অসহায় মধ্য ও নিম্নবিত্ত। অসহায় হয়ে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। ইরান যুদ্ধের অজুহাতে যাতে অবৈধভাবে কেউ বাজারে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারে সেজন্য তদারকি জোরদার করতে হবে।
শুক্রবার রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে নিত্যপন্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের চিত্র দেখা গেছে। ব্রয়লার ও দেশি মুরগির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি গরুর মাংস ও মাছ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮২০-৮৫০ ও খাসির মাংস ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে ২০০ টাকা কেজির নিচে মিলছে না কোনো মাছ। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার প্রতি কেজি পাঙাশ ২০০, তেলাপিয়া ২৩০, রুই ৩৫০, মৃগেল ২৫০-৩০০, দেশি টেংরা ৬০০, বেলে ৩৫০, চিংড়ি ৯০০, পাবদা ৩৫০, কই ৪০০-৫০০, শিং ৪০০, পোয়া ২৬০, শোল ৭০০ এবং টাকি ৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
নয়াবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে এসেছেন মো. সহিদুল ইসলাম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, পণ্যের বাজারে অস্থিরতা চলছে। রোজায়ও পণ্যের দাম এত ছিল না। ঈদের পর সবকিছুর দাম হু-হু করে বাড়ানো হচ্ছে। পরিবারের জন্য একটু মাছ-মাংস জোগাড় করতাম। কিন্তু বাজারে যে দাম কেনা সম্ভব নয়।
বাজারের মুরগি বিক্রেতা আমিনুল বলেন, পাইকারি বাজারে সব ধরনের মুরগির দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রতি কেজি ২০-৩০ টাকা বাড়তি দরে কিনতে হচ্ছে। যে কারণে আমাদের খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বেশি দামে কিনতে হলে আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করা ছাড়া কোনো গতি নেই।
এদিন কথা হয় কাপ্তান বাজারের পাইকারি মুরগি বিক্রেতা সোহেলের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। ট্রাকগুলো পর্যপ্ত তেল নিতে পারছে না। যে কারণে পরিবহণে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে। সঙ্গে সরবরাহ কম হচ্ছে। এতে বাড়তি দামে মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে।
মালিবাগ কাঁচাবাজারে কথা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে জানান, দুই ছেলে, স্ত্রী ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে তিনি থাকেন মালিবাগে। বেতন পান ৬০ হাজার টাকা। ২ বছর আগে এ টাকায় কোনোমতে চলতে পারতেন। কিন্তু এখন আর পারছেন না। সংসারের চাহিদা মেটাতে না পেরে প্রতি মাসেই ধার করছেন। বাসা ভাড়া ২২ হাজার টাকা, বড় ছেলে অনার্স চতুর্থবর্ষের ছাত্র। প্রতি সেমিস্টারে তার খরচ ৪০ হাজার টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতসহ ছেলেকে হাতখরচ দিতে হয় মাসে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। ছোট ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। মাসে যাতায়াত খরচসহ স্কুল ফি ৭ হাজার টাকা। এরপর পরিবারের ৫ সদস্যের জন্য মাসে চাল দরকার ৩৫-৪০ কেজি। ৬৫ টাকা কেজি ধরলেও প্রায় ২ হাজার ৬০০ টাকা লাগে। মাছ-সবজিসহ অন্যান্য পণ্য কিনতে লাগে ১০ হাজার টাকা। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিল চার হাজার টাকা। এতেই বেতনের টাকা শেষ। এরপর নিজের অফিসে যাতায়াত খরচ, চিকিৎসা, ছেলেদের বই-খাতা, কলমসহ অন্যান্য ব্যয় তো আছেই। এসব ব্যয় মেটাতে আগে সঞ্চয় ভেঙেছেন। এখন ধার করছেন। সবকিছুর দাম বাড়তি থাকায় এখন মাংস তো কেনাই হয় না। আগে সপ্তাহে দু-তিন দিন মাংস থাকত। এখন থাকে ডিম আর সবজি। ডিমের দাম বাড়ায় তাও এখন আর প্রতিদিন থাকে না।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বাজারে সৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ যাতে অবৈধভাবে মুনাফা করতে না পারে সেজন্য আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে পণ্যের দাম সহনীয় হয়ে যাবে।