Image description

‘আর এট্টু দেরি অইলে আমার মাইয়ার জীবনডাই শেষ অইছল’-সড়কের বেহাল দশার কথা জানাতে গিয়ে দুর্দশার চিত্র এভাবেই তুলে ধরেন আখাউড়ার দূর্গাপুর নিবাসী বাবুল মিয়া। কয়েক দিন আগে রাতে হঠাৎই ব্যথা ওঠে তার প্রসূতি মেয়ের। তড়িঘড়ি মেয়েকে নিয়ে ছোটেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে। পথিমধ্যে দীর্ঘ বেহাল সড়ক। পুরো পথ জুড়েই অজস্র খানাখন্দ। কিন্তু উপায় নেই। হাসপাতালে যেতে হলে এই পথ দিয়েই যেতে হবে। বাড়ি থেকে হাসপাতালের যা দূরত্ব, তাতে ১০ মিনিটের বেশি লাগার কথা না। কিন্তু এই ছোট্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে লেগে গেল প্রায় এক ঘণ্টা। তার ওপর ঝাঁকুনির পর ঝাঁকুনি। গাড়ি যেন চলতেই চায় না। হাসপাতালে যখন মেয়েকে নিয়ে পৌঁছালেন, মেয়ের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন তার মেয়ে আর নাতি। বৃদ্ধ বাবা পরিহাস করে বলেন, ‘আমরা ত আর হমতা (ক্ষমতা) নাই; আল্লাহর কাছে এই জুলুমের বিচার দিয়া রাখলাম।’

সড়কটির নাম আখাউড়া-চান্দুরা সড়ক। নামেই শুধু সড়ক। যে বেহাল দশা দেখলে মনেই হবে না যে এটি কোনো সড়ক। বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত আর খানা-খন্দে ভরে গেছে পুরো পথ। এই পথেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনগুলো চলছে হেলে-দুলে, ধীরগতিতে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে বড় বড় গর্ত ভরে পরিণত হয় ডোবায়। গর্তে পানি জমে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে যান চলাচলে। তখন জনদুর্ভোগ বেড়ে দাঁড়ায় কয়েকগুণ। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে এমনই অবণর্নীয় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন আখাউড়ার সাধারণ মানুষ।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের অধীনে আখাউড়া-চান্দুরা সড়কটি। সর্বশেষ চার বছর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে আখাউড়া থেকে সিঙ্গারবিল পর্যন্ত সড়কটি সংস্কার করে এলজিইডি। এরপর এই সড়কে আর কোনো কাজ হয়নি।

আখাউড়া-চান্দুরা সড়কের আখাউড়া পৌর শহরের সড়ক বাজার থেকে সিঙ্গারবিল বাজারের ব্রিজ পর্যন্ত দূরত্ব সাড়ে ৫ কিলোমিটার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার পাঁচটি ও আখাউড়ার একটি পৌরসভাসহ একটি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষের একমাত্র ভরসা এ সড়কটি। এ সড়ক দিয়েই ওইসব ইউনিয়নের বাসিন্দারা জেলা সদরে আসা-যাওয়া করে থাকেন। শুধু তা-ই নয়, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চান্দুরা থেকে কুমিল্লা গিয়ে মিশেছে সড়কটি। তাই কুমিল্লা হয়ে রাজধানী যেতে বিকল্প সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে এ সড়কটি। প্রতিদিন অন্তত হাজারখানেক যানবাহন চলাচল করে এ পথে। বহুল ব্যবহার আর সঠিক সংস্কারের অভাবে অল্পদিনেই সড়কের মাঝখানে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় অসংখ্য গর্ত।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে এ সড়কের খুবই করুণ। সাড়ে ৫ কিলোমিটার সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে কয়েক হাজার ছোট-বড় গর্ত। একেকটি বড় গর্ত যেন এক একটি মরণফাঁদ। কিছু কিছু অংশ দেখে তো বোঝার উপায়ই নেই যে, এটা কোনো পৌর সড়ক। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এ পথ মাড়াতে চায় না কেউই। কারণ ১০ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে সময় লাগছে এক ঘণ্টা। আর ঝুঁকি তো রয়েছেই।

উপজেলার আমোদাবাদের উজ্জল মিয়া। আখাউড়া শহরে একটি ফার্মেসি রয়েছে তার। তিনি বলেন, আগে সিএনজি বা অটোরিকশা দিয়ে দোকানে যেতাম। রাস্তা খারাপ হওয়ায় প্রায় সময়ই পায়ে হেঁটে আসা-যাওয়া করি এখন।

সিএনজিচালক ওয়াসিম মিয়া বলেন, বেশি দরকার না হলে কেউ এ সড়কে চলাচল করে না। আমরা সিএনজিচালকও পেটের দায়ে গাড়ি নিয়ে নামি রাস্তায়। ঝাঁকুনির চোটে প্রতি রাতে শরীরে অসহ্য ব্যথা হয়। ভাঙাচোরা রাস্তায় গাড়ির বারোটা বেজে গেছে।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আখাউড়া উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম সুমন সড়কটির দুরাবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, সংস্কার প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এ সড়কের মেরামত কাজ শুরু হবে বলে আশা করি।