বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান ২৩৫টি। তবে এর বাইরে অনুমতি ছাড়াই অবৈধভাবে ব্যবসা করছে আরও হাজারেরও বেশি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান। এর বাইরেও আরও কয়েকশ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ফোনে ফোনে ব্যাগ কাঁধে ঘুরে ঘুরে অবৈধভাবে কেনাবেচা করে থাকে দেশি-বিদেশি মুদ্রা।
সিআইডি জানায়, অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে প্রতিদিন ৭৫০ কোটি টাকা সমমূল্যের অর্থ লেনদেন হয়। আনুমানিক এই হিসাবে সংখ্যাটি মাসে ২২ হাজার ৫০০ কোটিতে দাঁড়ায়। এই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার হয় বলেই ধারণা রয়েছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় পরিচালিত অবৈধভাবে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে যারাই থাক তাদের খুঁজে বের করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সিআইডিপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া।
২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরবরাহ সংকটে খোলা বাজারে ডলারের দর একশ টাকা ছাড়িয়ে যায়। তারপরও দিনের পর দিন দর চড়তে থাকার পেছনে মানি এক্সচেঞ্জগুলোর কারসাজির অভিযোগ ওঠে। এই অস্থিরতার মধ্যে সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, দেশে অনুমোদিত ২৩৫টির বাইরে আরও ৭০০-এর মতো মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। ওই সময় সিইআইডি মানি এক্সচেঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযানে নামার কথাও জানিয়েছিল। ২০২২ সালে অনুমোদিত ২৩৫টি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৫টি পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪২টিকে কারণ দর্শানোর নোটিস, ২৮টির ব্যাংক হিসাব তথ্য জানতে চেয়েছে এবং ৫টির লাইসেন্স স্থগিত করেছে। পরে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য নিয়ে মানি এক্সচেঞ্জ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে সিআইডি।
এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার রাজধানীর ৫টি স্থানে একযোগে অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে সিআইডি। তার মধ্যে ৩টি অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ অফিস হচ্ছে- গুলশানের জে এম সি এইচ প্রাইভেট লিমিটেড, মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ারের আলম অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং উত্তরার আশকোনা মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের তৈমুর মানি এক্সচেঞ্জ। বাকি দুটি ফেরারি প্রতিষ্ঠান। অভিযানে মোট ৫ প্রতিষ্ঠানের ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন- আবু তালহা ওরফে তাহারত ইসলাম তোহা (৩২), আছাদুল শেখ (৩২), হাছান মোল্যা (১৯), আবদুল কুদ্দুস (২৪), হাসনাত এ চৌধুরী (৪৬), শামসুল হুদা চৌধুরী ওরফে রিপন (৪০), সুমন মিয়া (৩০), তপন কুমার দাস (৪৫), আবদুল কুদ্দুস (৩২), কামরুজ্জামান রাসেল (৩৭), মনিরুজ্জামান (৪০), নেওয়াজ বিশ্বাস, আবুল হাসনাত (৪০) ও শাহজাহান সরকার (৪৫)। এ সময় আসামিদের কাছ থেকে ১ কোটি ১১ লাখ ১৯ হাজার ৮২৬ টাকা সমমূল্যের ১৯টি দেশের বৈদেশিক মুদ্রাসহ সর্বমোট ১ কোটি ৯৯ লাখ ৬১ হাজার ৩৭৬ টাকা জব্দ করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু নাম ভাড়া দিয়েই নিবন্ধিত মানি এক্সচেঞ্জগুলো আইন ভেঙে একাধিক জায়গায় শাখা খুলেছে। কেউ কেউ নিজেই চালান। আবার ফোনের মাধ্যমে বাসা-বাড়িতে গিয়ে লেনদেন করেন অনেকে। অবৈধ এসব প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা হুন্ডি। তবে শুধু মুদ্রা কেনাবেচা নয়, বিদেশগামী বিভিন্ন যাত্রীর পাসপোর্টে ভুয়া সিলের মাধ্যমে ডলার এনডোর্সমেন্ট করে থাকে মানি চেঞ্জারগুলো। এতে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
ঢাকা কাস্টম হাউসের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২২ সালে বৈদেশিক মুদ্রা জব্দের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ঢাকা কাস্টম হাউসের অভিযানে বৈদেশিক মুদ্রা জব্দের পরিমাণ ২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ডলার জব্দের পরিমাণ ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩৫ মার্কিন ডলার। বিভিন্ন সময়ে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হওয়া কিংবা নিবন্ধনহীন অধিকাংশ মানি চেঞ্জারই মূলত এসব অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত।
বুধবার দুপুরে মালিবাগ সিআইডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিআইডিপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিএফআইইউ টিমের তথ্য ও সহযোগিতায় রাজধানীর গুলশান-১, রিংরোড, মোহাম্মদপুর, উত্তরার আশকোনা, এবি মার্কেট ও চায়না মার্কেটে একযোগে পাঁচজন বিশেষ পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই ৫টি প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় অবৈধ। গ্রেফতাররা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজস্ব অফিস এবং ভাসমান যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি (লাইসেন্স) ব্যতীত বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় করে আসছিল।
সিআইডিপ্রধান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করেছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা সমমূল্যের বিদেশি মুদ্রা অবৈধভাবে ক্রয়-বিক্রয় করে থাকে। গড়ে সব অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জে প্রতিদিন ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়।
তিনি আরও বলেন, গ্রেফতারদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অবৈধ। আমরা আমাদের অপারেশনাল কার্যক্রম অব্যাহত রাখব। আমাদের অভিযানের কারণে অনেক অবৈধ প্রতিষ্ঠান অফিস গুটিয়ে কাঁধে-ঘারে ব্যাগ নিয়ে ঘুরে ঘুরে ফোনে ফোনে যোগাযোগ করে ব্যবসা করছে। যার যেখানে পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা দরকার সেখানে পৌঁছে দিচ্ছে। বিনিময়ে ডলার বা অন্য বিদেশি মুদ্রার ন্যায্যমূল্যের তুলনায় বেশি টাকা নিচ্ছে।
সিআইডিপ্রধান সাধারণ মানুষের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, যখন কোনো কাজে বা চিকিৎসা নিতে বিদেশে যাচ্ছেন তার আগে কিছু প্রসিডিউর আছে। ভিসা পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের যেকোনো ব্যাংকে ভিসা দেখালে বিদেশি মুদ্রা পাবেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তা দিতে বাধ্য। তাহলে কেন তারা অবৈধভাবে ১০০ টাকার ডলার ১১৫ বা ১২০ টাকায় ক্রয় করবেন! এটা অন্যায় ও অবৈধ। আমরা এই অবৈধ কাজকে উৎসাহিত করতে পারি না। লাগবেই যখন তখন বৈধভাবে নেব, ব্যাংক কিংবা বৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান থেকে নেব। তাহলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা এসব অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান অটোমেটিক্যালি বন্ধ হয়ে যাবে।
এক প্রশ্নের জবাবে সিআইডিপ্রধান বলেন, যারা প্রবাসী তারা দেশে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে বাসায় বসেই টাকা পাঠায়। এ ক্ষেত্রে সময় বাঁচে ও কোনো হ্যারাসমেন্ট বা বাড়তি কোনো ভাড়া লাগে না। দেশের মানুষ ঘরে বসে টাকা পেয়ে যায়। তবে এটা অবৈধ। আমাদের দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে। দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মতে, কোনো অবৈধ পথ বেছে নেওয়া উচিত নয়। ব্যাংক থেকে সহজে মানি এক্সচেঞ্জ করা যায়, সেই বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক দেখবে। তবে যেকোনো ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার যদি হুন্ডি কিংবা অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে জড়ানোর তথ্য মেলে তবে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জের বিষয়ে মানি চেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. হেলাল উদ্দিন শিকদার সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের আশা ছিল অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে। সে ক্ষেত্রে অ্যাসোসিয়েশন থেকে লিস্টও দেওয়া হয়েছে অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জের। গত ৬ মাস থেকে এই অভিযানের কাজ চলছিল। এরা বৈধ মানি এক্সচেঞ্জের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এরাই হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করছে। তাই আমরা চাই, অনুমোদন ছাড়া মানি চেঞ্জিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকুক।