বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, রেস্তোরাঁ কিংবা ভ্রমণে গিয়ে ক্যামেরার সামনে দুই আঙুল তুলে ‘ভি’ (V) চিহ্ন দেখানো এখন অত্যন্ত পরিচিত এক ভঙ্গি। তবে এই চিরচেনা পোজ নিয়েই নতুন এক ভীতি ও সতর্কতার কথা বলছেন প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেখতে খুব সাধারণ মনে হলেও এই সেলফিই আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ও ডিজিটাল নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। ছবি থেকে আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট চুরি হওয়া এখন আর কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নয়, বরং এক বাস্তব প্রযুক্তিগত ঝুঁকি।
ছবি থেকে কীভাবে আঙুলের ছাপ চুরি সম্ভব?
স্মার্টফোনের ক্যামেরার মান এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত। বর্তমানের ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোতে ১০০ থেকে ২০০ মেগাপিক্সেল পর্যন্ত ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে উচ্চ রেজল্যুশনের ক্লোজ-শট ছবিতে আঙুলের সূক্ষ্ম রেখাও স্পষ্ট ধরা পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির কারণে দূর থেকে তোলা ছবি থেকে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা এখন আর অসম্ভব নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। আগে যেখানে আঙুলের ছাপ চুরির জন্য মানুষের স্পর্শ করা কোনো বস্তু লাগত বা অত্যন্ত দামি ল্যাবরেটরি প্রযুক্তির প্রয়োজন হতো, এখন এআই প্রযুক্তির সাহায্যে সাধারণ ছবি থেকেই নিখুঁত বায়োমেট্রিক ডেটা বের করা সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা একটি সাধারণ সেলফিও এখন অপরাধীদের কাছে তথ্য সংগ্রহের বড় মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও গবেষণা যা বলছে
এই সতর্কতার পেছনে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। গবেষক এবং হ্যাকাররা বিভিন্ন সময়ে এটি বাস্তবে করে দেখিয়েছেন:
জাপানের এনআইআই-এর গবেষণা: জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্সের (NII) গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে, মাত্র ৩ মিটার (প্রায় ১০ ফুট) দূর থেকে ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবি থেকেও আঙুলের ছাপ নিখুঁতভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব। বিশেষ করে ছবিতে যদি আলো পর্যাপ্ত থাকে এবং আঙুল সরাসরি ক্যামেরার দিকে থাকে (যেমনটা 'ভি' পোজে হয়), তবে বায়োমেট্রিক ডেটা কপি করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ক্লোন: ইউরোপের বিখ্যাত হ্যাকার সংগঠন ‘কস কম্পিউটার ক্লাব’ (CCC)-এর সদস্য জান ক্রিসলার জার্মানির তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একটি সাধারণ প্রেস কনফারেন্সের ছবি ব্যবহার করে তার বুড়ো আঙুলের নিখুঁত ক্লোন তৈরি করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন।
এআই সুপার-রেজিলিউশন ও থ্রিডি প্রিন্টিং: সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘জেনারেটিভ এআই সুপার-রেজিলিউশন’ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। আমরা যখন ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে ছবি দেই, তখন প্ল্যাটফর্মগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবির কোয়ালিটি কমিয়ে দেয়। কিন্তু আধুনিক এআই মডেলগুলো ওই ঝাপসা পিক্সেলের ভেতরের প্যাটার্ন অ্যানালাইসিস করে আঙুলের নিখুঁত লুপ ও ঘূর্ণন পুনরায় তৈরি করতে পারে। এরপর সস্তা থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই টু-ডি ম্যাপকে সিলিকন বা বিশেষ আঠার ছাঁচে রূপান্তর করে হুবহু নকল আঙুল তৈরি করা সম্ভব।
কেন এটি চিন্তার কারণ
বর্তমান সময়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট শুধু ফোন আনলক করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংকিং অ্যাপ, ডিজিটাল ওয়ালেট, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তার প্রধান চাবিকাঠি এখন বায়োমেট্রিক বা এই আঙুলের ছাপ।
পাসওয়ার্ড বা পিন কোড ফাঁস হলে তা সহজে পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু মানুষের আঙুলের ছাপ কখনো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই কোনোভাবে যদি আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট একবার নকল করা সম্ভব হয়, তবে আপনার ব্যক্তিগত সব ডিভাইস ও আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা স্থায়ী হুমকির মুখে পড়বে। ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজি (NIST) তাদের সাম্প্রতিক বায়োমেট্রিক গাইডলাইনেও এই স্পর্শহীন বায়োমেট্রিক চুরির ঝুঁকি নিয়ে কড়া সতর্কতা জারি করেছে।
ঝুঁকির তালিকায় কোন ধরনের ছবি
সব ধরনের ছবিতে এই ভয় না থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। যেমন:
খুব কাছ থেকে বা ক্লোজ-শটে তোলা সেলফি; নতুন মডেলের ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন বা প্রফেশনাল ক্যামেরায় তোলা হাই-রেজিলিউশন ছবি; ‘ভি’ পোজ দেওয়া ছবি, যেখানে আঙুলের ভেতরের অংশ সরাসরি ক্যামেরার খুব কাছাকাছি থাকে; মূল হাই-রেজিলিউশন ছবিটি কোনো ক্লাউড বা ওপেন সোর্সে সরাসরি শেয়ার করা।
করণীয়
প্রযুক্তির এই যুগে শতভাগ নিরাপদ থাকতে বিশেষজ্ঞরা কিছু সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন:
পোজ বদলানো: খুব কাছ থেকে ছবি তোলার সময় সরাসরি ক্যামেরার দিকে আঙুলের ভেতরের অংশ বা প্রিন্ট দেখানো এড়িয়ে চলুন।
রেজিলিউশন কমিয়ে দেওয়া: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার আগে সেটির রেজিলিউশন কিছুটা কমিয়ে দেওয়া ভালো। এতে আঙুলের রেখাগুলো আর স্পষ্ট বোঝা যায় না।
মাল্টিলেয়ার সিকিউরিটি: ডিভাইসের সুরক্ষায় শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্টের ওপর নির্ভর না করে শক্তিশালী পিন, পাসওয়ার্ড এবং টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করা উচিত।
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরনও পাল্টাচ্ছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি শেয়ার করার ক্ষেত্রে এখন থেকেই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।