মাঠে বল গড়ানোর আগেই তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের ইরান অধ্যায়। একদিকে স্টেডিয়ামের ভেতরে ইরানের প্রাক্-ইসলামী বিপ্লব আমলের ‘সিংহ ও সূর্য’ খচিত ঐতিহাসিক পতাকা বহনে ফিফার নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে মার্কিন ভূখণ্ডে অনুষ্ঠিতব্য ইরানের ম্যাচগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত টিকিট যুক্তরাষ্ট্র বাতিল করেছে বলে তেহরানের অভিযোগ। সবমিলিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে লস অ্যানজেলেস ও সিয়াটল। একদিকে সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে প্রবাসী ইরানিদের বিক্ষোভ, অন্যদিকে ফুটবলকে ঘিরে দুই বৈরী দেশের নতুন কূটনৈতিক যুদ্ধ, ফুটবল ও রাজনীতিকে একই সমান্তরালে নিয়ে এসেছে।
‘ইরান দল খেলছে না, খেলছে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দল।’-যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইরানি অধিকারকর্মী রুজবেহ ফারাহানিপুরের এই একটি মন্তব্যই স্পষ্ট করে দেয় এবারের বিশ্বকাপে ইরানি ফুটবল দলকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিল মনস্তত্ত্ব। আগামী ১৫ই জুন লস অ্যানজেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ইরান। তবে তার আগেই স্টেডিয়ামের বাইরে প্রাক্-১৯৭৯ আমলের সিংহ ও সূর্য খচিত পতাকা নিয়ে জড়ো হয়েছেন হাজারো প্রবাসী ইরানি।
বিবিসি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী বিক্ষোভকারীদের দাবি, বর্তমান সবুজ-সাদা-লাল পতাকায় খচিত ইসলামী প্রতীক ও ‘আল্লাহু আকবার’ লিপিটি বর্তমান দমনপীড়নকারী সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে, যা তারা মেনে নিতে পারছেন না। আন্দোলনকারীদের একজন আরেজো রাশিদিয়ান বলেন, ‘এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। এটিই ইরানের আসল পতাকা।’ চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসীরা ফুটবল দলটিকেও সরকারের ‘প্রোপাগান্ডা যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন। তবে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রাক-বিপ্লব আমলের এই ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ পতাকা নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। ফিফার নিয়মানুযায়ী এটিকে ‘রাজনৈতিক প্রতীক’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এ ছাড়া ইরান ফুটবল ফেডারেশনও বিশ্বকাপে অংশ নেয়ায় শর্ত দেয় যে, তাদের অফিশিয়াল পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অধিকারকর্মীরা বলছেন, আমেরিকার মতো মুক্তবাকের দেশে ফিফার এই সেন্সরশিপ মেনে নেয়া যায় না। খেলোয়াড়রা নিজেরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকার অনুরোধ করলেও, বিক্ষুব্ধ প্রবাসীদের মতে, ‘যখন তারা এই জার্সি পরে, তখন তারা সরকারেরই প্রতিনিধিত্ব করে।’
টিকিট বাতিলের অভিযোগ
বিশ্বকাপ শুরুর আগে অভূতপূর্ব সংকটের কথা জানিয়েছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন (এফএফআইআরআই)। তাদের অভিযোগ, গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর জন্য ইরানি সমর্থকদের জন্য ফিফার নিয়ম মেনে বরাদ্দকৃত ৮ শতাংশ টিকিটের কোটা পুরোপুরি বাতিল করেছে সহ-আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি দু’দেশের মধ্যে উদ্ভূত সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পর থেকেই ওয়াশিংটন একের পর এক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করছে বলে অভিযোগ তেহরানের। ফেডারেশন এক বিবৃতিতে বলে, ‘যুক্তরাষ্ট্র আবারো সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ইরানি সমর্থকদের স্টেডিয়ামে আসার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে ফেডারেশন এখন সমর্থকদের একটি টিকিটও সরবরাহ করতে পারছে না।’ একে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মূল স্পিরিট ও সমতার নীতির পরিপন্থি বলে আখ্যা দিয়েছে ইরান। এই ভিসা জটিলতার কারণে ইরানের ১৫ জন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মার্কিন ভিসা পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে ইরান দল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার পরিবর্তে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিজুয়ানাকে তাদের বিশ্বকাপ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। গত রোববার অধিনায়ক এহসান হাজসাফিসহ খেলোয়াড়রা মেক্সিকোতে পৌঁছান। এই টিকিট কেলেঙ্কারি ও ভিসা জটিলতা নিয়ে এখন পর্যন্ত ফিফা বা মার্কিন আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
১৫ই জুন লস অ্যানজেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করবে ইরান দল। এরপর ২১শে জুন একই জায়গায় বেলজিয়াম এবং ২৬শে জুন সিয়াটলে মিশরের মুখোমুখি হবে তারা।