২০০৫ সালের কার্ডিফ এখনো বাংলাদেশ ক্রিকেটের আবেগের আরেক নাম। রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেদিন মোহাম্মদ আশরাফুল খেলেছিলেন ১০১ বলে ১০০ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস। শেষ দিকে আফতাব আহমেদের ছক্কায় নিশ্চিত হয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সেই একমাত্র ওয়ানডে জয় এত বছর ধরে স্মৃতির মতোই ছিল, পুনরাবৃত্তির মতো নয়।
২১ বছর পর মিরপুরে সেই স্মৃতির পাশে নতুন অধ্যায় যোগ করল বাংলাদেশ। এবার নায়ক একজন নন, কয়েকজন। ব্যাট হাতে মোসাদ্দেক হোসেন, বল হাতে নাহিদ রানা, শুরুতে তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান—সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডার্ক ওয়ার্থ মেথডে ৮৬ রানের দাপুটে জয় তুলে নিল মেহেদী হাসান মিরাজের দল।
১৫ বছর পর বাংলাদেশে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে এসে শুরুতেই বড় ধাক্কা খেল অস্ট্রেলিয়া। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে আগে ব্যাট করে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৮৪ রান করে বাংলাদেশ। জবাবে ৪২.২ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার রান ছিল ৯ উইকেটে ১৯১। এরপর বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে খেলা আর শুরু করা না গেলে ডিএলএস পদ্ধতিতে জয় পায় বাংলাদেশ।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো ছিল না বাংলাদেশের। দ্বিতীয় ওভারেই নাথান এলিসের বলে মারনাস লাবুশেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে ৫ রানে ফেরেন সাইফ হাসান। তবে দ্রুত ধাক্কা সামলে নেন তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত।
দ্বিতীয় উইকেটে ৯৬ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে শক্ত ভিত এনে দেন দুজন। তানজিদ ছিলেন বেশি আক্রমণাত্মক। ৪৪ বলে ৫৪ রানের ইনিংসে ৭টি চার ও ১টি ছক্কা মারেন তিনি। এলিসের বলে জেভিয়ার বার্টলেটের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন বাঁহাতি এই ওপেনার।
শান্ত তুলনামূলক ধীরগতিতে খেললেও ইনিংস ধরে রাখেন। ৮৬ বলে ৬৭ রান করেন তিনি, মেরেছেন ৯টি চার ও ১টি ছক্কা। লিটন দাস ৭ রান করে ফিরলে এবং শান্ত ২৬তম ওভারে আউট হলে ১৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ।
সেই জায়গা থেকেই ইনিংসের মোড় ঘুরিয়ে দেন মোসাদ্দেক হোসেন। দীর্ঘদিন পর ওয়ানডে দলে ফিরে খেলেন অপরাজিত ৮৬ রানের ইনিংস। ৭০ বলের ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৭টি চার ও ৩টি ছক্কা। তাওহিদ হৃদয়ের সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে ৭৫ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে আবার ম্যাচে ফেরান তিনি।
হৃদয় ৫১ বলে ৩১ রান করে আউট হন। মেহেদী হাসান মিরাজ ৩ রান করে ফিরলে আবারও চাপ আসে। তবে শেষ দিকে তাসকিন আহমেদের ১৬ বলে ২০ রানের ক্যামিও এবং মোসাদ্দেকের দৃঢ় ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ পৌঁছে যায় ২৮৪ রানে।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নাথান এলিস ৩৮ রানে নেন ৩ উইকেট। ম্যাট রেনশ ও অভিষিক্ত লিয়াম স্কট নেন ২টি করে উইকেট। জেভিয়ার বার্টলেট পান ১ উইকেট।
২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস শুরুতেই ভেঙে দেন তাসকিন। প্রথম বলেই ম্যাথু শর্টকে বোল্ড করেন তিনি। নতুন বল সিমে পড়ে ভেতরে ঢুকে ভেঙে দেয় শর্টের স্টাম্প। অস্ট্রেলিয়ার রান তখনও শূন্য।
পরের ধাক্কা দেন মোস্তাফিজুর রহমান। দ্বিতীয় ওভারে লাবুশেনকে এলবিডব্লিউ করেন তিনি। ২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে তখনই চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
জশ ইংলিস ও কুপার কনোলি কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু নাহিদ রানা আক্রমণে এসে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। ইংলিসকে লিটন দাসের ক্যাচে ফেরানোর পর অ্যালেক্স ক্যারি, লিয়াম স্কট ও জেভিয়ার বার্টলেটকেও আউট করেন এই পেসার।
নাহিদের গতি ও বাউন্সে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের অস্বস্তি ছিল স্পষ্ট। ১০ ওভারে ৪১ রান দিয়ে ৪ উইকেট নেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কার্যকর ছিলেন মোসাদ্দেকও। ব্যাট হাতে ম্যাচ গড়ার পর বল হাতেও ১০ ওভারে ৩৭ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন তিনি। কনোলি ও ম্যাট রেনশকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাঝের সারি ভাঙেন মোসাদ্দেক।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে শেষ দিকে ফিফটি করেন ক্যামেরন গ্রিন। অপরাজিত ছিলেন ৫২ রানে। অ্যালেক্স ক্যারি করেন ৪৭, কনোলি ৩৫। তবে ২৮৫ তাড়া করতে নেমে মাত্র তিন ব্যাটসম্যানের ২০ পেরোনোই বলে দেয়, বাংলাদেশের বোলিং ম্যাচটা কতটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
মিরপুরের ঘাসে ঢাকা উইকেট নিয়ে ম্যাচের আগে থেকেই আলোচনা ছিল। পিচে পেস ও বাউন্স থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। বাংলাদেশের পেসাররা মাঠে সেই সম্ভাবনাকেই কাজে লাগালেন দারুণভাবে।
কার্ডিফে আশরাফুলের সেঞ্চুরি ছিল এক বিস্ময়ের রাত। মিরপুরে এই জয় বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ঘোষণা। একসময় অস্ট্রেলিয়াকে হারানো ছিল রূপকথা; এখন ঘরের মাঠে বাংলাদেশ সেই প্রতিপক্ষকে হারাল পরিকল্পনা, পেস, ব্যাটিং গভীরতা ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে।
আশরাফুল-আফতাবের সেই স্মৃতির পাশে এবার জায়গা করে নিলেন মোসাদ্দেক, নাহিদ, তাসকিনরা। অস্ট্রেলিয়া-বধের গল্পে কার্ডিফের পর এবার মিরপুরও লেখা থাকল আলাদা করে।