কেউ কেউ বলেন, একটি জীবনকে বিশ্বকাপ দিয়েও মাপা যায়। চার বছর পরপর ফিরে আসা এই টুর্নামেন্ট একজন উৎসুক শিশুকে আগ্রহী কিশোরে, আর কিশোরকে পরিণত মানুষে রূপান্তরের বিভিন্ন মাইলফলকের সাক্ষী করে। স্মৃতির ভাঁজে জমে থাকে প্রিয় দল, আরাধ্য নায়ক এবং তাদের গায়ে জড়িয়ে থাকা সেই আইকনিক জার্সিগুলো।
এসব জার্সি যেন শুধু পোশাক নয়, একেকটি গল্প। সময়ের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া শিল্পকর্মের মতো। কিন্তু কী এমন আছে, যা এগুলোকে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এত দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে?
এ বিষয়ে কথা বলেছেন মার্কিন কিট ডিজাইনার ম্যাথিউ উলফ। ২০১৮ বিশ্বকাপে আলোড়ন তোলা নাইজেরিয়ার জার্সি এবং সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের জার্সির ডিজাইনার হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এছাড়া প্যারিস সাঁ জার্মেইসহ আরও বহু ক্লাবের কিট ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
উলফ বলেন, ‘আমার সবচেয়ে প্রিয় ফুটবল জার্সিগুলোর বেশিরভাগই ৯০-এর দশক ও ২০০০ সালের শুরুর দিকের শৈশবস্মৃতি থেকে এসেছে। জীবনের সেই পর্যায়ে খেলোয়াড়দের সত্যিই সুপারহিরোর মতো মনে হয়, আর তাদের পোশাকগুলোও যেন জাদুকরী লাগে।’
তিনি বলেন, ‘মেক্সিকো ১৯৯৮, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪, জার্মানি ১৯৯০ ও ১৯৯৪, জাপান ১৯৯৮, ২০০২ সালের নাইকির সেট, এমনকি ২০০২ সালে ক্যামেরুনের হাতাকাটা জার্সিও আমার কাছে বিশেষ। কারণ ছোটবেলায় এগুলো আমার কাছে অসাধারণ ও বিশাল কিছু বলে মনে হয়েছিল।’
উলফের মতে, কোনো খেলোয়াড় একটি নির্দিষ্ট জার্সি পরে কী অর্জন করেছেন, সেটিও সেই জার্সির আইকনিক হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। সময়ের সঙ্গে একটি ফুটবল কিটকে দেখার এবং মূল্যায়নের ধরনও বদলে যায়।
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও নান্দনিকতা জার্সির মাধ্যমে ফুটে উঠতে দেখা অনুপ্রেরণাদায়ক। তবে এটি ভোক্তাবাদ নিয়েও প্রশ্ন তোলে। প্রকৃত সাংস্কৃতিক প্রকাশ আর পণ্যনির্ভর বাজার ব্যবস্থার মধ্যে সীমারেখা কোথায়, কিংবা আমরা কত দ্রুত এসব পোশাক বদলে ফেলছি—সেটিও ভাবার বিষয়।’
শীর্ষ ১০টি আইকনিক বিশ্বকাপ জার্সি
বিশ্বকাপের জার্সি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নস্টালজিয়া কাজ করাটা স্বাভাবিক। শৈশবের আবছা স্মৃতিগুলো যেন সোনালি ফিল্টারে মোড়া হয়ে ফিরে আসে। ৯০-এর দশক এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকের রঙিন প্রিন্ট, ঢিলেঢালা জার্সি কিংবা ৮০-এর দশকের শেষভাগের নকশাগুলো সহজেই এই তালিকায় জায়গা পেতে পারত।
তবে ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি নিয়ম মানা হয়েছে—একটি দেশ বা একটি বিশ্বকাপ থেকে একটির বেশি জার্সি রাখা হয়নি।
১০. ক্যামেরুন (২০০২)
এই নির্বাচন কিছুটা বিতর্কিত, কারণ জার্সিটি কখনো বিশ্বকাপে ব্যবহারই করা হয়নি। কিন্তু সেটিই একে স্মরণীয় করে তুলেছে। আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে ক্যামেরুন হাতাবিহীন জার্সি ব্যবহার করেছিল। তবে ২০০২ বিশ্বকাপের আগে ফিফা তা অনুমোদন দেয়নি।
সাবেক মিডফিল্ডার এরিক জেম্বা-জেম্বা বিবিসি স্পোর্ট আফ্রিকাকে বলেন, “আফ্রিকার সবাই ওই জার্সি পরতে চাইত।”
এমনকি সেই সময় টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামসও ফ্রেঞ্চ ওপেনে এই জার্সি দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি পোশাক পরেছিলেন। তবে তার পছন্দের ২৬ নম্বর যুক্ত করার অনুরোধ আয়োজকরা প্রত্যাখ্যান করেন।
পরে বিশ্বকাপের জন্য পুমাকে হাতাযুক্ত সংস্করণ তৈরি করতে হয়। দুই বছর পর ক্যামেরুন শার্ট ও শর্টস একসঙ্গে সেলাই করা ‘ওয়ানসি’ কিট উন্মোচন করলে সেটিও ফিফা নিষিদ্ধ করে।
৯. ইংল্যান্ড (অ্যাওয়ে জার্সি, ১৯৬৬)
ইংল্যান্ডের লাল জার্সি তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের প্রতীক। ওয়েম্বলিতে জিওফ হার্স্টের ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক, বিতর্কিত গোল এবং ববি মুরের হাতে জুলে রিমে ট্রফি সবকিছুই এই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
১৯৮২ কিংবা ১৯৯০ সালের জার্সিও বিবেচনায় ছিল। তবে ইংল্যান্ডের জন্য একটি জার্সি বেছে নিতে হলে সেটি অবশ্যই ১৯৬৬ সালের এই লাল জার্সি।
৮. ফ্রান্স (১৯৮২)
১৯৮২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচটিকে মিশেল প্লাতিনি নিজের জীবনের সেরা ম্যাচ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘কোনো সিনেমা বা নাটক এত বৈপরীত্য ও আবেগ তুলে ধরতে পারবে না। এটা ছিল নিখুঁত।’
হারাল্ড শুমাখারের ভয়াবহ ট্যাকল, অতিরিক্ত সময়ে ৩-৩ সমতা এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম টাইব্রেকার—সব মিলিয়ে ম্যাচটি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। আর সেই স্মৃতির অন্যতম অংশ ছিল ফ্রান্সের নীল জার্সি।
৭. নেদারল্যান্ডস (১৯৭৪)
বিদ্রোহী, একগুঁয়ে এবং অসাধারণ স্টাইলিশ—ইয়োহান ক্রুইফ ছিলেন ‘টোটাল ফুটবল’-এর প্রতীক। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস দলের জার্সিতে অ্যাডিডাসের তিনটি স্ট্রাইপ থাকলেও ক্রুইফের জার্সিতে ছিল মাত্র দুটি। কারণ তার ব্যক্তিগত চুক্তি ছিল পুমার সঙ্গে।
নিজের আত্মজীবনীতে ক্রুইফ লিখেছিলেন, ‘জার্সিটি তাদের হতে পারে, কিন্তু এর ভেতর থেকে যে মাথাটা বের হয়, সেটা তো আমার।’
৬. ক্রোয়েশিয়া (১৯৯৮)
লাল-সাদা চেকার্ড ডিজাইনের এই জার্সি খুব দ্রুতই ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র সাত বছর পর নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে দাভর সুকার, জভোনিমির ববান ও রবার্ট প্রসিনেচকিদের নেতৃত্বে দলটি সেমিফাইনালে ওঠে।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে প্রথমে এগিয়েও গিয়েছিল তারা।
৫. নাইজেরিয়া (২০১৮)
নাইজেরিয়ার ২০১৮ সালের জার্সি ছিল এক সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে ফ্যাশন ও সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেই এটি আইকনে পরিণত হয়। জার্সিটির জন্য ৩০ লাখের বেশি আগাম অর্ডার আসে। লন্ডনে নাইকির প্রধান স্টোরের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
ডিজাইনার ম্যাথিউ উলফ বলেন, “আমরা সরাসরি নাইজেরিয়ার জার্সির ইতিহাস থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়েছিলাম। ২০০২ সালের উজ্জ্বল সবুজ রং ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম। ১৯৯৪-৯৫ সালের কিটও আমাদের অনুপ্রেরণা ছিল।”
৪. ব্রাজিল (১৯৭০)
ফুটবলে ব্রাজিল এবং হলুদ রঙ যেন সমার্থক। পেলে, কার্লোস আলবার্তো, রিভেলিনো, জাইরজিনহোদের গায়ে থাকা ১৯৭০ সালের ক্যানারি-হলুদ জার্সি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত পোশাক। পুরনো আর্কাইভ ফুটেজেও এটি সমান উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয়।
৩. যুক্তরাষ্ট্র (অ্যাওয়ে জার্সি, ১৯৯৪)
১৯৯৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ব্যাপক সংশয় ছিল। তবে অ্যাডিডাস যখন তাদের ডেনিম-প্রভাবিত নীল জার্সি উন্মোচন করল, তখন সেটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
বড় বড় তারকা ছাপানো সেই জার্সিকে অনেকে সাহসী বলেছিলেন, আবার অনেকে একে অদ্ভুতও মনে করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় জার্সিতে পরিণত হয়েছে।
২. আর্জেন্টিনা (অ্যাওয়ে জার্সি, ১৯৮৬)
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত দুটি গোলের সাক্ষী—দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’।
সেদিন আর্জেন্টিনা যে গাঢ় নীল জার্সি পরেছিল, তার পেছনেও আছে অসাধারণ গল্প। খেলোয়াড়রা আগের ম্যাচে জার্সিটিকে ভারী মনে করায় কোচ কার্লোস বিলার্দো মেক্সিকো সিটির বাজারে নতুন জার্সি খুঁজতে লোক পাঠান। কথিত আছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা নিজেই। তিনি বলেছিলেন, ‘কী সুন্দর এই জার্সি। এটা পরেই আমরা ইংল্যান্ডকে হারাব।’
পরে সেই ম্যাচে ম্যারাডোনার পরা জার্সি নিলামে ৭.১ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি হয়।
১. পশ্চিম জার্মানি (১৯৯০)
তালিকার শীর্ষে রয়েছে ১৯৯০ বিশ্বকাপজয়ী পশ্চিম জার্মানির জার্সি। এটিকে আধুনিক ফুটবল জার্সি ডিজাইনের পথিকৃৎ বলা হয়। ‘আ কালচার অব কিটস’-এর লেখক জন ব্লেয়ার বলেন, ‘তখনকার বেশিরভাগ জার্সিই ছিল সাধারণ। কিন্তু এটি ছিল এক অসাধারণ ডিজাইন, একটি বিশ্বকাপজয়ী দল এবং নতুন শৈল্পিক ভাবনার অনন্য সংমিশ্রণ।’
ডিজাইনার ইনা ফ্রাঞ্জম্যানকে জাতীয় দলের জার্সিতে ‘ছোট্ট একটি বিপ্লব’ আনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি জার্মান পতাকার রং ব্যবহার করে যে নকশা তৈরি করেছিলেন, সেটিই পরে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত জার্সিতে পরিণত হয়।
ফ্রাঞ্জম্যান বলেন, ‘এই জার্সি অনেক বছর পর এসে এক শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে। মানুষ এখনও এর পেছনের গল্প জানতে চায়। এটা আমাকে গর্বিত করে।’