Image description
 

আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বামপন্থী, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ধারার ৯টি দলের সমন্বয়ে নতুন জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর ঘোষণা দিয়েছে। নতুন এই জোট আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিভিন্ন দাবিদাওয়ার আন্দোলনে সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছে দলগুলোর নেতারা।

আজ শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় কনভেনশন থেকে এ জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। বেলা ১১টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে দিনব্যাপী কনভেনশনের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।

কনভেনশনে দেশের বাম, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ছাত্র-শ্রমিক, কৃষক, নারী, ডাক্তার, আইনজীবী, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি, দলিত, হরিজন, সুফি, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ দেড় হাজার নেতা-কর্মী অংশগ্রহণ করেন।

কনভেনশনে অংশ নিয়ে নতুন এই জোটে থাকার বিষয়ে জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন, বাসদ (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মাহবুব) ও সোনার বাংলা পার্টি। এ ছাড়া প্রয়াত বামপন্থী নেতা পংকজ ভট্টাচার্য প্রতিষ্ঠিত ঐক্য ন্যাপ, গণমুক্তি ইউনিয়ন, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন ও নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চা এই জোটে শিগগিরই যুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কনভেনশনের খসড়া ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফী রতন। তিনি বলেন, ‘দেশ ও দেশবাসীর জন্য সুখ-শান্তি-স্বস্তি ও প্রতিশ্রুতিময় নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে প্রগতিমুখী গণতান্ত্রিক ধারার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের সকল দেশপ্রেমিক-গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল-বাম রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবর্গ, আদিবাসী তথা বিভিন্ন জাতিসত্তা, নারী সংগঠনসমূহ, শ্রম-কর্ম-পেশার সংগঠনসমূহ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহসহ অধিকার আন্দোলনের কর্মী এবং অপরাপর সব শক্তির সম্মিলনে আমরা “জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি” গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’

কাফী রতন বলেন, ‘এই কনভেনশন থেকে আমরা সকলের অংশগ্রহণে “গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট” গঠনের প্রস্তাব করছি এবং ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মূল অঙ্গীকার হিসাবে খসড়া ঘোষণা ও কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করছি। আমরা আশা করছি, আপনারা এ প্রস্তাব অনুমোদন করবেন।’

কাফী রতন জানান, অংশগ্রহণকারী দল-সংগঠনের প্রতিনিধি ও প্রগতিশীল ব্যক্তবর্গের সমন্বয়ে গঠিত “পরিচালনা কমিটি” কর্তৃক যুক্তফ্রন্ট পরিচালিত হবে। যৌথ নেতৃত্বের ধারায় পরিচালনা কমিটি তার কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করবে।

কনভেনশনে লেখক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আজকের যুক্তফ্রন্ট হবে সমাজ বিপ্লবের যুক্তফ্রন্ট। যে যুক্তফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন তার ওপরেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এই গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নিয়ে কাজে নেমে পড়লে দেশে একটা জাগরণ আসবে।’

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, ‘মানুষ এই রাজনীতিকদের বিশ্বাস করে না। তাদের তারা দেখেছে। তারা অত্যাচারী, জুলুম-লুণ্ঠনকারী। মানুষ বিকল্প পাচ্ছে না। সেই বিকল্প যদি আমরা উপস্থিত করতে পারি, তাহলে দেখবেন মানুষ কীভাবে সাড়া দিচ্ছে এবং কীভাবে নেতৃত্ব গড়ে উঠছে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই সুযোগ আমাদের সামনে আছে।’

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে—এমন প্রত্যাশা জানিয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘জনগণ চায় পরিবর্তন, এটা করতে পারবে বাস্তবে বামপন্থীরা। বামপন্থীরা জন-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে বলেই তাদের ওপর শাসকদের এত রাগ।’

আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, এই যুক্তফ্রন্টে সবাইকে যুক্ত করতে হবে। সারা দেশে দলীয় রাজনীতি করে না; কিন্তু সমাজের নানা অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা থাকে। তাদের এই সংগ্রামে যুক্ত করতে হবে।’

সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘রাজনীতিতে এখন নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। কে কার সঙ্গে মিলছে, তা নিয়ে হইচই চলছে। বাজারদর যেভাবে বাড়ায় বিক্রেতা—ঠিক সেভাবেই রাজনৈতিক দলগুলো এখন সিট নিয়ে বার্গেনিং করছে। এখন একটা গোলমেলে পরিস্থিতি।’

বাম দলগুলোর নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কঠিন সময় চলছে। এখন আমরা যদি বরফ ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে পারি, তবে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারব। ন্যায় ও সত্যের ধারায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের ক্ষমতা অর্জন করার পথ দেখাতে হবে। ক্ষমতাসীন হয়ে ক্ষমতা পরিচালনা করার শিক্ষাও জনগণকে দিতে হবে।’

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, ‘আজ থেকে বাম দলগুলোর কর্মীদের একটাই পরিচয় হবে তা হলো আমরা সবাই গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের মানুষ।’ এ সময় তিনি গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন তিনি।

শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরে যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, যেভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলছে; এখন শিল্পী, কৃষক, শ্রমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পেশার মানুষকে একতাবদ্ধ হতে হবে।’

কনভেনশনে সভাপতিত্ব করেন বাম জোটের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। তিনি বলেন, জুলাই সনদে বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে এই অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিস্থাপন করতে চায়। এখনো সেই লুটপাট ও দুর্নীতির ধারায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে। এ কারণে এখন জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক উত্থান জরুরি।

কনভেনশনে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক সোহরাব হোসেন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, ঐক্য ন্যাপের সভাপতি এস এ সবুর, বাসদ (মাহবুব) সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ ভূঁইয়া, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, সোনার বাংলা পার্টির আহ্বায়ক সৈয়দ হারুন, বাসদ (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসদু রানা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী, গণতান্ত্রিক ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. হারুন অর রশীদ, নারী নেত্রী সীমা দত্ত, জলি তালুকদার, সাংস্কৃতিক ঐক্যের সমন্বয়ক মফিজুর রহমান লাল্টু, শ্রমিকনেতা শামীম ইমাম, সুফি সৈয়দ মুহাম্মদ রায়হান শাহ, শিপন রবিদাস প্রমুখ।