Image description

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক সেনাপ্রধানের স্ত্রী ও সাবেক ফার্স্ট লেডি। এসব পরিচয় ছাপিয়ে ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠেন জাতির অভিভাবক। দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণীপেশার মানুষের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে আপসহীন খেতাব পাওয়া অশীতিপর এই নেত্রী এখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী। ভুগছেন বার্ধক্যজনিত নানা ব্যাধিতে। গত ৬ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ারের সিসিইউতে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে তাকে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা। খালেদা জিয়াকে নিয়ে গতকাল নয়াপল্টনে দোয়া মাহফিলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্যের পরপরই দলের নেতাকর্মীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতা কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চান প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হাসপাতালে যান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। রাতে একে একে হাসপাতালে ছুটে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে মির্জা আব্বাস গণমাধ্যমকে বলেন, ম্যাডামকে দেখে মনে হয়েছে, উনি স্ট্যাবল নন। ম্যাডামের সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাচ্ছি। রাতে হাসপাতালে ছুটে যান বিজেপি সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দলিব রহমান পার্থ। তিনিও হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমের কাছে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে উৎকণ্ঠার কথা জানান। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। 

এদিকে মায়ের অসুস্থতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও এক্সে আবেগঘন বার্তা দেন জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশবাসীর কাছে মায়ের সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়ে তিনি লিখেন, এমন সঙ্কটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্খা যে কোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতিক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।

ওদিকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সুস্থতা কামনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে নানা মন্তব্য লিখেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অনেকে স্বৈরাচার আমলের খালেদা জিয়ার আপসহীন নানা বক্তব্য ফেসবুক শেয়ার করে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেন, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। দেশবাসীর কাছে তার সুস্থতার জন্য দোয়ার আহ্বান জানাই। 

বিএনপি চেয়ারপারসনকে নিয়ে একটি দীর্ঘ মন্তব্য ফেসবুকে শেয়ার করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, মামলার রায় হওয়ার আগে খালেদা জিয়া একবার বিদেশ সফরে গেলেন। হাসিনা আর ওবায়দুল কাদের বলে বেড়াতে লাগলেন, খালেদা জিয়া আর আসবেন না। এতিমের টাকা মেরে খেয়ে পালিয়েছে। খালেদা জিয়া চিকিৎসা করে ফিরে আসলেন। কোর্টে বললেন, আমি এতিমের টাকা চুরি করব? আমি? কোর্ট জেল দিয়ে দিল। সারা দুনিয়ার মানুষ জানত, কেসটা ভুয়া। খালেদা যদি বিদেশ থেকে না আসতেন হাসিনার অন্যায় বিচার এড়ানোর জন্য, আমরা উনাকে দোষ দিতাম না। কেউই দিত না। কিন্তু খালেদা এসেছিলেন। জেলেও ঢুকেছিলেন। দেশের মানুষকে হাসিনার জেলে রেখে নিজে বিদেশ ট্যুরে রাজি হননি। খালেদা জানতেন, এটা জেল না। এটা কবর। এখানে ঢুকলে আর বের হতে না পারার সম্ভাবনাই বেশি। জেনেও কবরে ঢুকেছিলেন। যেখানে তাকে ভালো খেতে দেওয়া হয়নি, চিকিৎসার সুযোগ চাইলে হাসিনা বলেছিলেন, অনেক বছর ই তো বাঁচল, আর কত? খালেদা জিয়া হাসিনার জেলে ছিলেন। খাবারে বিষ মেশানোর ১০০ ভাগ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খালেদা সেই খাবার খেয়েছেন। নিজের জন্য খাননি। খেয়েছিলেন মানুষের জন্য। আমার আপনার জন্য। খালেদার আর পাওয়ার কী ই বা বাকি ছিল? তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধানের স্ত্রী, ফার্স্ট লেডি। পাওয়ার তো কিছু বাকি ছিল না। তবুও জেলে গিয়েছিলেন, জানতেন, হাসিনার সাথে পারবেন না। তবুও তিনি বিদেশ না গিয়ে দেশের মানুষের সাথে কষ্ট ভাগ করে নিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া অসুস্থ। ভয়ংকর রকমের অসুস্থ। হাত সোজা করতে পারেন না। লিভারে ইনফেকশন ছড়াচ্ছে। ৬ বছর হাসিনার জেলে না থাকলে কি খালেদাকে আজ এই পরিণতি হত? না। হত না। এই যে আজ তাঁর ভয়ংকর অসুস্থতা, এই অসুস্থতা আমার আপনার জন্য তাঁর করা কুরবানী। এই অসুস্থতা তারই চুজ করে নেওয়া। আল্লাহ যেন আইসিইউতে শুয়ে থাকা এই নারীকে আমাদের কাছে সুস্থ করে ফেরত দেন। কারণ, আজ থেকে ৮ বছর আগে একদা এই নারী নিজের জীবন, পরিবার, স্বজন সবকিছু বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ আর গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছিলেন!!

বিশিষ্ট টকশো আলোচক ডা. জাহেদ উর রহমান ফেসবুকে লিখেন, বেগম খালেদা জিয়ার জন্য প্রার্থনা। ভয়ংকর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি সুস্থ হয়ে উঠুন।

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনীম জারা নিজের ফেসবুক পেজে লিখেন, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। রাজনীতি, দল–মত, মতাদর্শ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর জন্য সবার দোয়া কামনা করি। এক সপ্তাহ আগে এক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে খুব অল্প সময়ের দেখা হয়েছিল।

তিনি বলেছিলেন, “দেশে থাকো, দেশের জন্য কাজ করো।” অসংখ্য মানুষ একই উপদেশ দেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া যখন এই কথা বলেন তার গভীরতা, ইতিহাস, আর সত্যতা অন্যরকম। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেও তিনি দেশ ও দেশের মানুষের পাশ থেকে সরে দাঁড়াননি। বেদনা, অপমান ও সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান এবং বিশ্বাস থেকে আপস করেননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করি, তিনি যেন বেগম খালেদা জিয়াকে রহমত, আরোগ্য ও শান্তি দান করেন।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের সুস্থতা কামনা করে রাজধানীতে দোয়া মাহফিল করেছে জামায়াত নেতারা। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জন্য আজ ফজরের নামাজের পর মসজিদে মসজিদে দোয়া করা হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও আজ দেশেব্যাপী বিভিন্ন জেলা উপজেলার মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিলের কর্মসূচি পালন করা হবে। 

উল্লেখ্য, গত ২৩শে নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। সর্বশেষ গত ১৫ই অক্টোবর বিএনপি চেয়ারপারসন এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।  হাসিনার আমলে ২০১৮ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি থেকে টানা দুই বছর কারাগারে থাকাকালে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া।  এরপর মুক্তি দিলেও তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে দেয়া হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর গত ৮ই জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। লন্ডন ক্লিনিকে টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৫শে জানুয়ারি খালেদা জিয়া তার ছেলে তারেক রহমানের বাসায় লন্ডনের ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেন। যুক্তরাজ্যে উন্নত চিকিৎসা শেষে গত ৬ই মে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।