তিন ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মনোবলে কিছুটা চিড় ধরেছে। তৈরি হয়েছে হতাশাও। প্রথমত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড হয়েছে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার। দ্বিতীয়ত, পূর্বাচলে সরকারি প্লট বরাদ্দে অনিয়মের তিন মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সবচেয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে অগ্রণী ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা তিনটি লকারে ৮৩২ ভরি স্বর্ণের খোঁজ পাওয়ার ঘটনায়।
জানা গেছে, এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। দলটির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা হতবাক হয়েছেন। কারণ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে ভেতরে ভেতরে এতকিছু ঘটেছে, যা তাদের জানা ছিল না। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের আদৌ এসব সম্পদ অর্জনের প্রয়োজন ছিল কি না-এমন প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ কোনোদিন ফিরে এলেও সম্পদ অর্জনের এসব ঘটনা ইতিহাস হয়ে থাকবে। অনেকের মতে, এসব ঘটনা নৈতিক দিক থেকেও দলটিকে কিছুটা দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দেবে। বিশেষ করে, শেখ হাসিনার নির্দেশে নানাভাবে তৎপর থাকার অংশটির মধ্যে এসব ঘটনা নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, নানাভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও আটকা পড়েছে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দলের এই অংশের আর্থিক সংগতিও কম; অথচ এদেরই এখন ঝুঁকি নিতে হচ্ছে, পালিয়ে থাকতে হচ্ছে।
এর আগে বাগানবাড়ি ও ডুপ্লেক্স বাড়িসহ শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা বিপুল সম্পদের চিত্র গণমাধ্যমে আসে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মতে, তৎকালীন সরকার এবং সরকারপ্রধান নিজেদেরকে জবাবদিহি থেকে শুরু করে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভেবেছে। যে কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের অধিকার হরণ করে ক্ষমতায় ছিল। আর ক্ষমতায় থেকে তারা চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। যুগান্তরকে তিনি বলেন, সেই চোরতন্ত্রের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এটা সার্বিকভাবে বিব্রতকর। কিন্তু অবাক হওয়ার মতো নয়। অন্তত আমি অবাক নই। কারণ এটা তার ক্ষমতার অপব্যবহারের যে সার্বিক চিত্র, সেটার ক্ষুদ্র একটা অংশ। তিনি আরও বলেন, তবে সৌভাগ্যের বিষয় যে এগুলো এখন জবাবদিহির মধ্যে আনার একটা ক্ষেত্র বা সুযোগ তৈরি হয়েছে। যার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে প্লট দুর্নীতি মামলার রায়টা হলো। আমার জানা মতে, আরও অন্তত ৫-৬টা মামলায় তার ও পরিবারের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো আছে। যেখানে আয়ের উৎস নেই, কর ফাঁকি আছে। ডকুমেন্টেশন নেই। ফলে প্রতারণা এখানেও চলে আসবে।
মামলার রায় এবং ভল্টে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের খোঁজ পাওয়ার ঘটনার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এসব ঘটনায় কিছুটা ‘দমে’ গেছেন। তারা বলছেন, মাঠপর্যায় থেকে ঝুঁকি নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম করার কারণে তাদের জন্য ক্রমশ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। গ্রেফতার আতঙ্কে তাদের থাকতে হচ্ছে লুকিয়ে। শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ঝুলছে হত্যা ও দুর্নীতির মামলা। ফলে এমন পরিস্থিতির মধ্যে দলীয় প্রধানের বিষয়ে নেতিবাচক খবর তাদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। তাদের মতে, উদ্ধার করা স্বর্ণ তার পরিবারের সদস্যদের হলেও এটি আয়কর নথিতে দেখানো হলেও নেতিবাচক আলোচনা কম হতো। ফলে পুরো বিষয়টি নেতাকর্মীদের হতবাক করেছে।
তারা বলছেন, এসব ঘটনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থান একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ল। ভবিষ্যতে কী নিয়ে রাজনীতি করবেন, সে বিষয় নিয়েও তারা চিন্তিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনা নিজেকে সবকিছুর ঊর্র্ধ্বে মনে করতেন। ফলে এ ধরনের অন্যায়-দুর্নীতির খবরে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাদের মতে, দলীয় প্রধানের এ ধরনের কর্মকাণ্ড নেতাকর্মীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দেয়। তাদের মনোভাব দুর্বল করে। অপরাধ স্বীকার করার মানসিকতা সৃষ্টি হলে হয়তো তা দলের রাজনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত। পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের মনোবলও চাঙা রাখতে সহযোগিতা করত। কিন্তু একের পর এক ঘটনা সামনে আসায় সেই সম্ভাবনা খুব একটা দেখছেন না তারা।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শেখ হাসিনা ও তার দলের বিষয়টা হচ্ছে- তিনি নিজে এবং তার দল গুরুতর অপরাধ গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী একটি মামলার রায়ও হয়েছে। সে বিষয়ে কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। কাজেই এক্ষেত্রে তিনি বা তার দল অনুশোচনা ফিল করবে কি-না সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সত্যিকার অর্থেই যদি তারা নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড় করায়, তাহলে নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় বিচারক হতে পারে। তারা যে খুন ও অন্যায় করেছে, এটা স্বীকার করার মতো মানসিকতা সৃষ্টি হলে দলের রাজনীতিতে হয়তো কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। যদিও দু-একটা রায়ের ফলে তাদের মধ্যে সেই ধরনের মানসিকতা তৈরি হবে বলে আমি মনে করি না।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (মাভাবিপ্রবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স (সিপিএস) বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, সার্বিকভাবে বললে ক্ষমতা কাঠামোকে ব্যবহার করে কোনো সরকার বা তাদের মতাদর্শের লোকের এ ধরনের কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে কাম্য নয়। কারণ জনগণ উনাদের আদর্শিক জায়গায় দেখতে চায়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা দুর্নীতির এমন একটা অবস্থায় পৌঁছে গেছি, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন ব্যাপার। ফলে যারাই ক্ষমতার কাঠামোতে থাকে তারাই এ ধরনের কাজ করেন। এটা আমাদের একটা অপসংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা জনগণের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয় বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক।
ড. ওমর ফারুক আরও বলেন, আদালতের রায় এবং স্বর্ণের খোঁজ পাওয়ার ঘটনায় দলগতভাবে অবশ্যই একটা প্রভাব ফেলে এবং নেতিবাচক বার্তা দেয়। এতে নেতাকর্মীদের মনোভাব দুর্বল হয়ে যায়। আদর্শিক জায়গা থেকে সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে স্বাভাবিকভাবে এটা নেতাকর্মীদের জন্য অস্বস্তিকর। এ কারণে যারা রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা দলীয় প্রধান প্রত্যেকেরই উচিত এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ থাকা। আর এটা শুধু শেখ হাসিনা বা তার সরকারের ক্ষেত্রে নয়, ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে তারাও যেন এটা মেনে চলেন।
শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের ৮৩২ ভরি স্বর্ণের খোঁজ পাওয়ার ঘটনায় দেশের রাজনীতিতেও আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ সভপতি শেখ হাসিনা কথায় কথায় বলতেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। তার কোনো সম্পদ নেই। সম্পদের দরকারও নেই। কিন্তু সেই শেখ হাসিনাই ভল্টে এত স্বর্ণ লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন! আর তাছাড়া স্বর্ণ থাকলে সেটি আয়কর ফাইলে তিনি দেখাননি কেন সে প্রশ্নও উঠছে। তাছাড়া দুর্নীতি প্রসঙ্গ উঠলেই শেখ হাসিনা কথায় কথায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নামে বিষোদগার করতেন। তাহলে নিজে তিনি কেন সতর্ক থাকলেন না, সেই প্রশ্নও উঠছে। বলা হচ্ছে, তিনি নিজে এবং তার পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের বেশির ভাগই ৫ আগস্টের আগে-পরে নির্বিঘ্নে দেশ ছাড়তে পারলেও বিপদে ফেলে গেছেন তৃণমূল নেতাকর্মীদের।
সূত্রগুলো জানাচ্ছে, শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে এমনিতেই নেতিবাচক আলোচনা ছিল। এরপর স্বর্ণ ও প্লট দুর্নীতির বিষয়টি সামনে আসায় দলকে আরও বেকায়দায় ফেলেছে।
সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন-ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছেন যে, উনার (শেখ হাসিনার) হলফনামা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে তার প্রার্থিতাই থাকত না। এমন পরিস্থিতিতে, আগে যে দাবি করা হতো- শেখ হাসিনার কিছু নেই, তার কোনো লোভ নেই; সে বিষয়টি রাজনীতিতে আর গ্রহণযোগ্য থাকছে না। কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের খোঁজ এবং সরকারি প্লট বরাদ্দে অনিয়মের মামলায় সাজার বিষয়টি কিছুতেই ঢাকা যাবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা যুগান্তরকে বলেন, এভাবে আর কতদিন চলবে জানি না। এখনো দলের হাইকমান্ড থেকে কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা নেই। মাঝেমধ্যে ‘খামখেয়ালি দু-চারটি কর্মসূচির’ কারণে উলটো বিপদ বাড়ছে। এর সঙ্গে দলীয় সভাপতির বিরুদ্ধে একের পর এক মামলার রায় এবং নানা নেতিবাচক ঘটনা সামনে আসছে। ফলে এখন দলের হাল কে ধরবে, আর দলই বা কী নিয়ে রাজনীতি করবে তা গভীর চিন্তার বিষয় বলে জানান ওই নেতা।