ইসলামী রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসে তিনি শহীদ জিয়ার পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা, ইসলামী শক্তির প্রতি তার অবস্থান এবং বিভিন্ন সংকটসমূহ তার আপোষহীন নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করেছেন।
আজ শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, শহীদ জিয়ার শাহাদাতের পরে চেপে বসা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার মধ্য দিয়েই বেগম খালেদা জিয়ার উত্থান। গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের দেশনেত্রী। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তাদের দোসররা বাদে সকলেই তাকে এভাবে সম্বোধন করতেন। এ দেশের ইসলামী আন্দোলন ও আলেম-উলামার সাথে তার ইতিবাচক সম্পর্ক ছিল। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা, ফ্যাসিবাদের তল্পিবাহকরা দেশপ্রেমিক ও ইসলামী শক্তিকে মৌলবাদ, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, পাকিস্তানপন্থী এবং স্বাধীনতা বিরোধীসহ নানান ট্যাগ দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া বরাবরই এসব ট্যাগ ডিনাউন্স করেছেন এবং অনুধাবন করেছিলেন দিল্লির তাবেদাররা যাদের স্বাধীনতা বিরোধী বলে, তারাই দেশের প্রকৃত কল্যাণকামী।
ডাকসুর জিএস লেখেন, হাসিনাশাহীর পতন নিশ্চিত করতে বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলন শুরু করেন। বিভাগে বিভাগে মহাসমাবেশ হতো, লাখো মানুষের স্রোত বলে দিতো— স্বৈরাচারের পতনের সময় নিকটবর্তী। একই সময়ে নদীর উজানে ভারতের বাঁধ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে মহাসমাবেশ করতে থাকে খালেদা জিয়ার প্রধান জোটসঙ্গী জামায়াত। নিজেদের পতন ঠেকাতে ও দেশপ্রেমিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করতে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নিজামী-সাঈদী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও অন্যান্যদের গ্রেফতার ও ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করছিল হাসিনা। সে সময় কারাবন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে বেগম জিয়া সুস্পষ্ট বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি হীনবল ও হীনম্মন্য ছিলেন না, ছিলেন আপোষহীন। ভিনদেশী শক্তির চোখে ‘সাধু’ সাজতে বস্তাপচা ন্যারেটিভ গ্রহণ করেননি তিনি। সত্যই ছিল তার আপোষহীন রাজনীতির উৎস শক্তি।
‘ইসলামবিরোধী পলিসি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল হাসিনা। ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করতে শাহবাগে খুনের মঞ্চ বসিয়েছিল শাহবাগীরা। বিভিন্ন ব্লগের ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার ও লেখকদের উদ্যোগে হওয়া এ মঞ্চ খালেদা জিয়া প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরিবর্তে সমর্থন করেছিলেন শাপলার জাগরণকে।’
তিনি লেখেন, বেগম জিয়া ইসলামী ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের উপর হওয়া গুম, খুন, নির্যাতন ও অন্যায় গ্রেফতারের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। সাবেক শিবির সভাপতি দেলওয়ার হোসাইনের মুক্তি দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন। সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সারাদেশে গণহত্যা চালায় আওয়ামীলীগ। যেটাকে বেগম খালেদা জিয়া ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেন। একইভাবে, বেগম জিয়ার ঘোষিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও কর্মসূচিতে ছাত্রশিবিরের জনশক্তিরাই সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলনের যে পথ বেছে নিয়েছিলেন উল্লেখ্য করে ফরহাদ লেখেন, সেই পথে বিএনপির একটা সুনির্দিষ্ট অংশ শেষ পর্যন্ত থাকতে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকে দলত্যাগ করেছেন, অনেকে নিষ্ক্রিয় থেকেছেন। এজন্য খালেদা জিয়া নিজেও তার নামে দেওয়া ‘খালেদা জিয়ার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ স্লোগানে একবার বিরক্তিও প্রকাশ করেছিলেন। তার এ বিরক্তিপ্রকাশ দলের ঐসব নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ছিল, যারা হাসিনার পতন আন্দোলনে খালেদা জিয়ার সাথে পূর্ণ মাত্রায় সক্রিয় থাকেননি। খালেদা জিয়া দূরদর্শী, তিনি সম্ভবত বিষয়টা বুঝেছিলেন।
‘সে সময় যদি বিএনপি বেগম জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত উত্তাল সে আন্দোলনে পূর্ণমাত্রায় অংশ নিতে সমর্থ হতো, তাহলে ফ্যাসিবাদ হয়ত ২০১৩-১৪ সালেই বিদায় হতো। দেশে ফিরতে পারতেন বেগম জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান। দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেটা হয়নি। বরং ম্যাডাম জিয়াকে জেলে থাকতে হয়েছে বছরের পর বছর। এ দেশের ইসলামী আন্দোলন এবং মুসলমানদের আবেগ-অনুভূতির সাথে বেগম জিয়ার সম্পর্ক ছিল ইতিবাচক। সেদিক থেকে আমরা বলতে পারি, বেগম খালেদা জিয়ার পথচলা আমাদের সবার জন্যই অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় এটারই সাক্ষ্য দেবে।
বেগম খালেদা জিয়ার উপর নিপীড়ন হয়েছে, জুলুম করা হয়েছে। হাসিনা তাকে নির্দয়ের মতো জোরপূর্বক বাড়িছাড়া করেছে। বেগম জিয়ার কান্না ও অশ্রু সবাইকে কাদিয়েছিল সেদিন। তাকে বছরের পর বছর চিকিৎসাহীন অবস্থায় কারাগারে বন্দী রেখেছে। কি নির্মম ও নির্দয় অত্যাচার!’
বেগম খালেদা জিয়া সুস্থতা কমনা করে তিনি আরও লেখেন, আল্লাহর কী ইচ্ছা! যে হাসিনা বেগম জিয়াকে বাড়িছাড়া করেছে, চিকিৎসাহীন রেখেছে, সেই হাসিনা আজ দেশছাড়া। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এসবই সম্ভব হয়েছে ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে। সম্ভবত এর মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে সবচেয়ে বড় উপহারটা এ দেশের ছাত্র-জনতাই দিতে পেরেছে। জালিম হাসিনার পতন নিশ্চিত করে, তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে। বেগম খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে উঠুন, এ প্রত্যাশা। দেশের স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের স্বার্থে তাকে খুবই প্রয়োজন। আল্লাহ! আপনি তাঁকে সুস্থ করে দিন। আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখার তাওফিক দিন। আমিন।