জাতীয় পার্টি (জাপা) একসময় দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। বড় দুই দলের ক্ষমতার সমীকরণেও অনেক ক্ষেত্রে দলটির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ সখ্য, বিতর্কিত নির্বাচনগুলোয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্বসংকট ও বারবার ভাঙনের ধাক্কায় সেই অবস্থান এখন গেছে হারিয়ে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি কোনো আসন পায়নি; এমনকি দলটির রংপুরের মতো ঘাঁটিতেও প্রভাব ভেঙে পড়েছে। ফলে জাতীয় পার্টির সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দলটি আবার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জাতীয় পার্টির সাবেক ও বর্তমান নেতাদের অনেকে মনে করেন, ভোট এবং মাঠের রাজনীতিতে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। কারণ, দলটির নিজস্ব কোনো কর্মিবাহিনী নেই। সমর্থকগোষ্ঠীও বিভিন্ন দলে ভিড়ে গেছে। নতুন করে দলকে দাঁড় করানোর মতো নেতৃত্বও নেই। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় পার্টিকে এখন ছোট দলের কাতারেই দেখা হচ্ছে।
১৯৯১ সালে দেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরের অবস্থানে ছিল জাতীয় পার্টি। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটি সংসদে উল্লেখযোগ্য আসন পায়। পরে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে বা আওয়ামী লীগের কৃপায় জাতীয় পার্টি সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে। কিন্তু সেই অবস্থান এবার পুরোপুরি বদলে গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০০ আসনে প্রার্থী দিয়েও দলটি কোনো আসন পায়নি; কোনো প্রার্থী মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও আসতে পারেননি।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের দায়, সাংগঠনিক ভাঙন, নেতৃত্বসংকট ও ভোটব্যাংকের ক্ষয়—সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টি এখন অস্তিত্বসংকটে। দলটি আবার ভোটের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
জাতীয় পার্টির এই বিপর্যয় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে রংপুরে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের আবেগ দীর্ঘদিন রংপুর অঞ্চলে দলটিকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় হয়েছেন। একসময় যে অঞ্চলে জাতীয় পার্টি ছিল প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, সেখানে দলটির প্রার্থী এখন নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীও নন। এই ফলাফল দেখিয়েছে, জাতীয় পার্টির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকও আর আগের মতো অটুট নেই।
সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি গঠন করেন। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হলেও দল হিসেবে জাতীয় পার্টি টিকে যায়। সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের পরও দলটি ভোটের রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণে প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেই বাস্তবতা পাল্টে গেছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান যে দলটিকে রাজনীতি থেকে মুছে দিতে পারেনি, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সেই দলের পতনের সাক্ষী হয়ে গেছে।
জাতীয় পার্টির বর্তমান বিপর্যয়ের বড় কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক সখ্যকে সামনে আনছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং দলটির বর্তমান ও সাবেক নেতাদের অনেকে। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা দলটিকে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির সমর্থন ছিল। এরপর ২০০৮ সালে মহাজোটের অংশ হওয়া এবং পরে বিতর্কিত তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা, ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে সংসদে থাকা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় পার্টি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে।
প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
—শামীম হায়দার পাটোয়ারী, মহাসচিব, জাতীয় পার্টি
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের দায়ের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করেছে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বসংকট ও বারবার ভাঙন। এরশাদের জীবদ্দশাতেই দলটির নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। ২০১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সেই সংকট আরও প্রকট হয়। রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের বিরোধ, পরে শীর্ষ নেতাদের একাংশের দলত্যাগ এবং আলাদা জাতীয় পার্টি গঠনের চেষ্টা—এসব ঘটনায় দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগেও জাতীয় পার্টিতে বড় ধরনের ভাঙন দেখা যায়। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদের মতো নেতারা আলাদা অবস্থান নেন। লাঙ্গল প্রতীক কোন অংশ পাবে, তা নিয়েও আইনি জটিলতা তৈরি হয়। ফলে ভোটের মাঠে নামার আগেই জাতীয় পার্টির কর্মী–সমর্থকদের মধ্যে ছড়ায় বিভ্রান্তি। এই বিভক্তি এবার দলটির নির্বাচনী বিপর্যয়কে আরও গভীর করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ৩৫টি, ভোট প্রায় ১২ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে আসন কমে ৩২টি হলেও ভোটের হার বেড়ে হয় ১৬ শতাংশ। ২০০১ সালে আসন পায় ১৪টি, ভোট নেমে আসে ৭ শতাংশে। ২০০৮ সালে আসন পায় ২৮টি, ভোটের হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ।
অবশ্য জাতীয় পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব ভোটের ফলাফলকে দলটির প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন বলে মানতে চায় না। দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারীর দাবি—২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রতিক্রিয়া আছে, বারবার ভাঙনেও দল দুর্বল হয়েছে। তবে গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে সংসদে জায়গা না দেওয়ার একটি পরিকল্পনা ছিল বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

জাতীয় পার্টির বড় অংশের নেতৃত্ব এখন দিচ্ছেন জি এম কাদের
আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হওয়ার মূল্য
এরশাদের পতনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসন দেশ-বিদেশে একনায়কতান্ত্রিক ও নিপীড়নমূলক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পুরোটা সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে লেজুড়বৃত্তি করেছে জাপা। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে অংশ নিয়েছে। পরে দলটির কিছু নেতা সরকারের মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়ে সুবিধা নিয়েছেন। আবার দলটি প্রধান বিরোধী দলের আসনেও বসেছে। কিন্তু সরকারকে জবাবদিহি করার চেষ্টা করেনি।
জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই।
— মুজিবুল হক চুন্নু, সাবেক মহাসচিব, জাতীয় পার্টি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্যান্য বিরোধী দলের মতো ২০১৪ ও ২০২৪ সালের ‘পাতানো’ নির্বাচন জাতীয় পার্টি বর্জন করলে আওয়ামী লীগ সরকারের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেত। ২০১৪ সালে এরশাদ কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন। তিনি হঠাৎ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর এক দিনের ঝটিকা সফরে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং। তিনি এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনে অংশ নিতে প্রবলভাবে অনুরোধ করেন। এরশাদ রাজি না হওয়ায় পরে গোয়েন্দা সংস্থা এরশাদকে তুলে নিয়ে যায় এবং নির্বাচন পর্যন্ত তাঁকে সিএমএইচে ভর্তি রাখে। এরপর জাতীয় পার্টির ওপর শেখ হাসিনা সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়ে যায়। দলটি কাকে মনোনয়ন দেবে, কিছু ক্ষেত্রে সেটাও ঠিক করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বা গোয়েন্দা সংস্থা। এসব কারণে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টিকেও অনেকটা আওয়ামী লীগের মতোই ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
জাতীয় পার্টির নেতাদের অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দিয়ে জাতীয় পার্টি ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ হিসেবে জাতীয় পার্টি চাপে ছিল। আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে পরিচিত হলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভোটাররাও এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির পাশে থাকেননি—এমন মূল্যায়নও আছে দলটির ভেতরে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার সখ্য নতুন বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ১৯৮৬ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের দেওয়া নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও আওয়ামী লীগ অংশ নিয়েছিল। তখন থেকেই জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফেরে জাতীয় পার্টির সমর্থনে। ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনেও আওয়ামী লীগের সঙ্গী ছিল জাতীয় পার্টি। ২০০৮ সালে দুই দল সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং জাতীয় পার্টি সরকারে অংশীদার হয়।
ভোটের ইতিহাসে নিম্নমুখী ধারা
জাতীয় পার্টির নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দলটি ৩৫টি আসন পায়, ভোট পায় প্রায় ১২ শতাংশ। ওই নির্বাচনে এরশাদ কারাগারে থেকেও রংপুর অঞ্চলের পাঁচটি আসনে জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসনসংখ্যা ছিল ৩২, ভোটের হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। ওই সময় আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে।
২০০১ সালে জাতীয় পার্টির আসন কমে দাঁড়ায় ১৪টি, ভোটের হার নেমে আসে ৭ শতাংশে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ হিসেবে নির্বাচন করে দলটি ২৮টি আসন পায়; ভোটের হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। ওই নির্বাচনে এক প্রার্থীর সর্বোচ্চ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নিয়ম চালু হয় এবং এরশাদ ঢাকা ও রংপুরে দাঁড়িয়ে তিনটিতেই জয়ী হন।

২০১৩ সালে এক বৈঠকে শেখ হাসিনার সঙ্গে এইচ এম এরশাদফাইল ছবি: পিআইডি
এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি, জামায়াতসহ তখনকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। অধিকাংশ আসনে ভোট ছাড়াই (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যায়। একতরফা ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসন পেয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয়। একই সঙ্গে সরকারের মন্ত্রিসভায়ও যুক্ত হন দলটির নেতারা।
২০১৮ সালে ‘রাতের ভোট’খ্যাত বিতর্কিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভাগে পড়ে ২২টি আসন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির আসন ছিল ১১টি, ভোটের হার প্রায় ৩ শতাংশ।
অনেক বছর পর দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি কোনো আসনে জিততে পারেনি। রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী—এই অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির যে শক্ত অবস্থান ছিল, সেই ভিত্তিও ধসে পড়েছে।
ভাঙনে ক্ষয়ে গেছে সংগঠন
জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে ভাঙন নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে দলটির একটি অংশ বেরিয়ে জাতীয় পার্টি—জেপি গঠন করে। এরশাদের একসময়ের মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে ২০০০ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি—বিজেপি। এরপরও বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পার্টি থেকে নেতা-কর্মীরা বেরিয়ে নতুন দল বা পৃথক ধারা গঠন করেছেন।
সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দলটির ভেতরে বড় ধরনের ভাঙন দেখা যায়। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদের মতো নেতারা আলাদা জাতীয় পার্টি ঘোষণা করেন। অতীতে জাতীয় পার্টি ছেড়ে যাওয়া নেতাদের নিয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট—এনডিএফ নামেও একটি জোট গঠন করা হয়। যদিও প্রতীক জটিলতার কারণে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবে এ ঘটনাগুলো দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করে। লাঙ্গল প্রতীক জাতীয় পার্টির কোন অংশ পাবে, তা নিয়েও এখনো মামলা চলছে।
দলের শীর্ষ পর্যায়ের এই বিভক্তি কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, সংগঠনও দুর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, নেতৃত্বসংকট ও ভাঙনের এই ধারাবাহিকতা দলটির নির্বাচনী বিপর্যয়কে আরও গভীর করেছে।

২০২২ সালে গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরফাইল ছবি: বাসস
এইচ এম এরশাদ ২০১৯ সালে মারা যান। তাঁর জীবদ্দশাতেই জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল। এরশাদ তখন স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ছোট ভাই জি এম কাদেরের সঙ্গে সমন্বয় করে দল চালাতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেই সমন্বয় আর থাকেনি। রওশন এরশাদ অসুস্থ হলেও তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির আরেকটি ধারা রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির জি এম কাদেরকেই মূল নেতা হিসেবে কাছে টেনেছিল আওয়ামী লীগ। ফলে রওশন অনেকটা আড়ালে চলে যান।
বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে ছাড়া মূল জাতীয় পার্টিতে সারা দেশে পরিচিতি রয়েছে, এমন নেতা নেই। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী নিজেও গাইবান্ধা–১ আসনে জয়ী হতে পারেননি। ওই আসনে তিনি ৩৪ হাজারের কাছাকাছি ভোট পান; জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মাজেদুর রহমান পান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট। বিএনপির খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী ৩৭ হাজার ৯৯৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন।
গত নির্বাচনের আগে দল ছেড়ে যাওয়া নেতারা জি এম কাদেরের নেতৃত্বে ফিরে আসবেন, এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে আদালতের রায়ে লাঙ্গল প্রতীক জি এম কাদের পক্ষ পেলেও তারা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারবে, এমনটা মনে করছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
দলটির সাবেক মহাসচিব এবং নতুন জাপার নির্বাহী চেয়ারম্যান মুজিবুল হক চুন্নু প্রথম আলোকে বলেন, জি এম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই।
মুজিবুল হক চুন্নু স্বীকার করেন যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে অপশাসনের অংশ না হলে জাতীয় পার্টি আজকে সংকটে পড়ত না। প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকতে পারলে আরও শক্তিশালী হতে পারত। তিনি দাবি করেন, দলের সব অংশকে একত্র করে শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে
জুলাই অভ্যুত্থানের পর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক দফা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। একই সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু দল জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবিও তোলে। দলীয় চেয়ারম্যান জি এম কাদেরসহ দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য ও নেতাদের কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হয়েছেন। এসব ঘটনা দলটির রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল করে দেয়।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে। কিন্তু সেখানে জাতীয় পার্টির কোনো অংশই ডাক পায়নি। জুলাই সনদের আলোকে সংস্কার বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যেসব বৈঠক করে; সেখানেও জাতীয় পার্টি ছিল না। নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমেও দলটির প্রচার আগের তুলনায় গুরুত্ব হারায়।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের দায়, সাংগঠনিক ভাঙন, নেতৃত্বসংকট ও ভোটব্যাংকের ক্ষয়—সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টি এখন অস্তিত্বসংকটে। দলটি আবার ভোটের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।