Image description
 

জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ভারতের দিল্লিতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কয়েক দিন আগে ঘোষিত এই রায়ে তিনটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়টি ঘোষিত হওয়ার পর দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন করেছেন, দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা একজন নেতা কীভাবে এত নাটকীয় পতনের মুখোমুখি হলেন? কীভাবে তার শক্ত হাতে নির্মিত ক্ষমতার কাঠামো এত দ্রুত ভেঙে পড়ল? বাস্তবতা হলো, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে জমে ওঠা কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির পরিণতি।
শেখ হাসিনার শাসনকাল ছিল চরম ক্ষমতাকেন্দ্রিক। তিনি শুধু সরকারের প্রধান ছিলেন না, একই সঙ্গে ছিলেন দলের সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন- সবই তার ইচ্ছানির্ভর হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে; বিরোধী দলের কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। প্রতিযোগিতাহীন রাজনৈতিক পরিবেশ দমননীতিকে এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত করে। ফলে একদিকে ক্ষমতা যত কেন্দ্রীভূত হয়েছে, অন্যদিকে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে।
তার শাসনামলে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় স্বার্থপরতার প্রবণতা ছিল স্পষ্ট। উন্নয়ন প্রকল্প, রাষ্ট্রীয় সুবিধা কিংবা বড় বড় সরকারি কাজ প্রায়ই দলীয় ঘনিষ্ঠ মহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হ্রাস পায় এবং একচেটিয়া ক্ষমতা কাঠামো তৈরি হয়। প্রশাসনের বড় অংশ দলীয় আনুগত্যের ওপর নির্ভর করে চলে- যার ফলে দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের ন্যায্য প্রাপ্যতা ক্ষুণ্ন হয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিনির্ভর নীতির চাপে হয় বিপথগামী।
গণতান্ত্রিক কাঠামোর সংকটও তার শাসনামলে প্রকট হয়ে ওঠে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিক নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির শিকার হন। নির্বাচনি ব্যবস্থায় অনিয়ম, বিরোধী মত দমনের প্রচেষ্টা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার রাজনৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করে। এমন পরিবেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং নাগরিক সমাজের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কতা সত্ত্বেও এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন চলতে থাকে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতেও শেখ হাসিনার ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। প্রতিবেশী ভারতের দৃঢ় সমর্থন তাকে ক্ষমতায় স্থিতিশীলতা এনে দিলেও, দেশের মধ্যে এটি গোপন ক্ষোভ তৈরি করে। সমালোচকদের মতে, পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে দুর্বল করেছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য এমন নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগ শেখ হাসিনার শাসনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি রাষ্ট্রীয় শক্তির কঠোর প্রতিক্রিয়া শুধু অনেক প্রাণহানি ঘটায়নি, বরং সরকারের নৈতিক ভিত্তিকে চূর্ণ করেছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগ ওঠে। সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকারের দাবি নিয়ে রাজপথে নামলেও তাদের ওপর অযাচিত সহিংসতা চালানো হয়। এক ঘটনা দেশের ভেতরে ও বাইরে তার প্রতি আস্থার ভিত্তিকে আরও দুর্বল করে।
সর্বোপরি, বর্তমান পরিস্থিতি শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার যৌক্তিক প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা কোনো নেতাই অটুট নয়- যদি তিনি গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতি থেকে বিচ্যুত হন। ক্ষমতার পাশে আইনের শাসন না থাকলে পতন অনিবার্য। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও জনগণের চোখে সেই বিচারের পরিণতি আরও কঠোর হয়ে ধরা দেয়। শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান তাই শুধু আইনি বিচার নয়, বরং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার নৈতিক পরিণতিও বটে।
নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের জন্য এ অভিজ্ঞতা এক গভীর শিক্ষা। ক্ষমতা ধরে রাখা নয়, বরং দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ আর ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্বই রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে। রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করলে তা শেষ পর্যন্ত শাসকের বিরুদ্ধে ফিরে আসে- শেখ হাসিনার ঘটনা এরই প্রমাণ। রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এক সতর্ক সংকেত- শক্তি যত বড়ই হোক, তার ব্যবহারে সংযম ও জবাবদিহি না থাকলে সেই শক্তিই ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠে।
অবশেষে, শেখ হাসিনার পরিণতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ন্যায়ের চেতনা ও জনগণের প্রত্যাশা স্থায়ী। রাষ্ট্র পরিচালনায় নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ অনুপস্থিত থাকলে ক্ষমতার প্রাচীর যত উঁচু হোক, তা একদিন ভেঙে পড়ে। সাম্প্রতিক এই ঘটনা ভবিষ্যৎ রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং নেতৃত্বের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

 

সাঈদ বারী


লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক