জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে গণভোট একটি; যদিও এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো বিতর্ক চলছে। বিএনপিসহ বেশ কিছু দলের দাবি ছিল, জাতীয় নির্বাচনের পর গণভোট হোক। জামায়াতে ইসলামী বলেছিল, সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট হতে হবে। সরকার দুই পক্ষের মধ্যে আপসরফা হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং গত সপ্তাহে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারিও করেছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণভোটে একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার–সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’; (হ্যাঁ/না):
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার, সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।
(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
এখানে প্রশ্ন চারটি। উত্তর একটি। আপনি সমর্থন করলে চারটিকেই করতে হবে। আর সমর্থন না করলে চারটির বিষয়েই ‘না’ ভোট দিতে হবে। এই চার প্রশ্নের মধ্যে স্ববিরোধিতাও আছে। শেষ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যদি ওপরে বর্ণিত প্রথম তিন অনুচ্ছেদ সাংঘর্ষিক হয়, তখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
বিএনপির বক্তব্য হলো, জুলাই সনদে বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলের আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্টের উল্লেখ ছিল। কিন্তু জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে সাংবিধানিক আদেশ দেওয়া হয়েছে, তাতে সেই আপত্তির কথা নেই। ফলে এর দায় তারা নেবে না। দায় অন্তর্বর্তী সরকারকেই নিতে হবে।
জুলাই সনদ সইয়ের পরও যে সাংবিধানিক আদেশ ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতের বিস্তর ফারাক আছে, সেটা স্পষ্ট। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী দলের নেতারা গণভোটকে সফল করতে প্রচার চালাচ্ছে। তারা মনে করেন, গণভোটের সাফল্যের ওপরই গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। কিন্তু বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলো তা মনে করে না।
২৭ নভেম্বর ডেইলি স্টার-এর শিরোনাম ছিল ‘পোলস স্ট্রাডিজ: রেফারেন্ডাম নট বিএনপি’স মাইন্ড’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘নির্বাচনী কৌশল : বিএনপির মনে রেফারেন্ডাম নেই’। প্রতিবেদনের মোদ্দাকথা হলো, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোট বিএনপির অগ্রাধিকার তালিকায় নিচের দিকে রয়েছে এবং দলটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—কোনোটির পক্ষে প্রচারে নামার পরিকল্পনাও করছে না।
বিএনপি যদি এ বিষয়ে পুরোপুরি নিস্পৃহ থাকে, গণভোটের ফলাফলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাঁরা কাউকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতেও বলবেন না, ‘না’ ভোট দিতেও বলবেন না। ফলে অনেক ভোটার গণভোটের ব্যালট নিতে আগ্রহ দেখাতে না–ও পারেন। তাঁরা সংসদ নির্বাচনে পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বাড়ি চলে যাবেন।
আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা গণভোটের পক্ষে থাকবেন, এটা ভাবার কারণ নেই।
এ পটভূমিতে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অনুসারী সব দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও খুব আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট হলে ভোটার উপস্থিতি আরও কম হতো। এখন ভোটার উপস্থিতি বাড়লেও তারা সবাই গণভোটে অংশ নেবেন—এ নিশ্চয়তা নেই। বিএনপির মনে গণভোট নেই। কেবল জামায়াত, এনসিপি ও তাদের সহযোগীরাই চাইলেই ভোটারদের গণভোটের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারবে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তিনটি গণভোট হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুটির চরিত্র মোটামুটি এক। সংবিধান স্থগিত করে ক্ষমতায় আসা দুই সামরিক শাসকই নিজেদের শাসনকে বৈধতা দিতে গণভোটের আয়োজন করেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে আর এরশাদ ১৯৮৫ সালে। এই দুটি গণভোটে খুব কমসংখ্যক লোক উপস্থিত থাকলেও দেখানো হয়েছে যথাক্রমে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ ও ৭২ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথমটিতে ‘হ্যাঁ’ পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ ও দ্বিতীয়টিতে ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
দুটি গণভোটই করা হয়েছিল প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে, প্রচারও চালানো হয়েছিল তাদের মাধ্যমে। ১৯৭৭ সালে প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী জিয়াউদ্দিন চৌধুরী গণভোটের আজগুবি চিত্র তুলে ধরে লিখেছেন, ‘জিয়াউর রহমানের অতি উৎসাহী বুদ্ধিদাতা ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে হোক, আর যে কারণেই হোক, গণভোটের ঘোষিত ফলাফলে এই ভোটার উপস্থিতি ও “হ্যাঁ” ভোটের অবিশ্বাস্য উচ্চ হার দেশে-বিদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।’ (প্রথম আলো, ৬ জানুয়ারি ২০১৯) জিয়াউদ্দিন চৌধুরী প্রথম গণভোটের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় গণভোট দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। এরশাদ তাঁকে দেশে ফিরতে দেননি। দ্বিতীয় গণভোটও ছিল প্রহসন।
তৃতীয় গণভোট হয় ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি–শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রী–শাসিত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার আইন পাস হওয়ার পর। এই গণভোটে ভোট পড়ে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে, অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এই হার ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন ভোটার ‘না’ ভোট দেন। ‘না’ ভোটের হার ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এই গণভোটে ভোটার উপস্থিতি কম হলেও এটা ছিল স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য। জাতীয় পার্টি সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে মেনে নেয়। যদি ধরে নিই তাদের সমর্থকেরা ‘না’ ভোট দিয়েছেন, তাহলেও এবারের গণভোট নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ আছে বৈকি।
একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে ভোটারদের আগ্রহ থাকবে সংসদের প্রতি। প্রার্থীরাও বিজয় নিশ্চিত করতে ভোটারদের নিজের পক্ষে টানতে চাইবেন। সেখানে গণভোটের কথা ভোটারদের মনে কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
বিএনপি যদি এ বিষয়ে পুরোপুরি নিস্পৃহ থাকে, গণভোটের ফলাফলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাঁরা কাউকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতেও বলবেন না, ‘না’ ভোট দিতেও বলবেন না। ফলে অনেক ভোটার গণভোটের ব্যালট নিতে আগ্রহ দেখাতে না–ও পারেন। তাঁরা সংসদ নির্বাচনে পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিয়ে বাড়ি চলে যাবেন।
কত শতাংশ ভোটার উপস্থিত থাকলে গণভোট বৈধতা পাবে, তা নির্দিষ্ট করা নেই। ‘না’–এর চেয়ে ‘হ্যাঁ’ বেশি পেলেই গণভোট আইনি বৈধতা পাবে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতি গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের সমর্থন না থাকলে আইনি পরীক্ষায় উতরে গেলেও নৈতিকতার প্রশ্ন থেকেই যাবে।

● সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি
* মতামত লেখকের নিজস্ব
[২৯ নভেম্বর ২০২৫ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা ‘গণভোটে বিএনপির মন নেই, ভোটারদের থাকবে?’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]