২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের লড়াই ছিল না। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন। সেই উত্তাল সময় পেরিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সবশেষ ফেব্রুয়ারিতে একটি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে পুনরায় রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। অনেকেরই ধারণা ছিল, ভোটের বাক্সে ব্যালট ফেলার মাধ্যমেই গণতন্ত্রের পূর্ণ মুক্তি ঘটবে। কিন্তু দিনশেষে আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র মানেই কেবল নির্বাচন নয়। এটি একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এবং দৈনন্দিন শাসন ও সেবা কার্যক্রমের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতির অবিরত, অবিচ্ছেদ্য চর্চা।
বস্তুত একটি গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে রূপান্তর করার কাজটি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই দীর্ঘ যাত্রায় মাত্র তিন মাস সময় খুব সামান্য। তবে এই স্বল্প সময়ের কার্যক্রমগুলো পর্যবেক্ষণ করলে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।
সরকারের প্রথম এই তিন মাসকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে একটি উল্লেখযোগ্য ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি ছিল বড় পরীক্ষা— রাজপথের আন্দোলনকে তারা সংসদীয় ভাষায় রূপান্তর করতে পারে কিনা। সব মিলিয়ে, চরম ভঙ্গুর একটি পরিস্থিতি সামলে প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক চর্চার পথে শান্তিপূর্ণ যাত্রা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নতুন বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা নিঃসন্দেহে সরকারের বড় অর্জন।
সরকারের সাফল্যের অন্যতম একটি দিক হলো— নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বা খাল খনন কর্মসূচির মতো জনবান্ধব প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক উদ্যোগ নিয়েছে। এই কর্মসূচির চূড়ান্ত সাফল্য নিয়ে এখনই মন্তব্য করার সময় না হলেও, একটি রাজনৈতিক দল যে তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পালনে কমিটেড থাকে—এই বার্তাটি জনগণের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তবে এটিও অনস্বীকার্য যে, সরকার রাজনৈতিক উত্তরণে যতটা গতিশীলতা দেখিয়েছে, কাঠামোগত সংস্কার, অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা ও দৈনন্দিন প্রশাসনের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই ধীরগতির পরিচয় দিয়েছে।
নতুন সরকার গঠনের পর সংসদীয় রাজনীতির দিকে তাকালে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। সংসদে এবার কিছুটা বৈচিত্র্য আছে। বিরোধী দলের সারিতে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতারাও রয়েছেন। অতীতে আমাদের সংসদে বিরোধী দল বলতে এক ধরনের ‘নিশ্চুপ’ দর্শক দেখা যেত, যারা কেবল নামেই বিরোধী ছিল। অনেকে বলতেন ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’। এখন সেই জায়গাটি কি আসলেই বদলেছে? সংসদের প্রথম অধিবেশনে কয়েক দিন বেশ উত্তাপ ছড়ানো বিতর্ক দেখা গেছে সত্য। তবে সংসদীয় চর্চায় কাগজে-কলমে পরিবর্তন আসলেও, সরকার ও বিরোধী দল মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে সংসদ এখনও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। সংসদের অন্যতম কাজ হলো নির্বাহী বিভাগ তথা সরকারকে জবাদিহির আওতায় আনা। তার প্রধানতম মাধ্যম হলো মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কিন্তু প্রথম অধিবেশনে সুযোগ থাকলেও আমরা দেখলাম কমিটিগুলো গঠিত হলো না। বস্তুত সংসদে জবাবদিহির প্রকৃত সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে শক্তিশালী বিরোধী দলের কোনও বিকল্প নেই। সংসদে অর্থপূর্ণ বিতর্ক করার প্রধান বাধা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। সরকারি দল এই অনুচ্ছেদ সংশোধনসহ সংবিধানের অন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার ব্যাপারে ‘ধীরে চল’ নীতি নিয়েছে বলে মনে হয়, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে তাদের প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। অথচ আমরা দেখছি, সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনটি অনুমোদন দেয়া হল না। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সুসংহত করার একটি বড় সুযোগ ছিল, যা সরকার হাতছাড়া করেছে। এছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেরিট বা যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অতীত রেওয়াজ আবার ফিরে এসেছে। দলীয় অনুগত অধ্যাপকদের হাতে প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া প্রমাণ করে যে, সরকার গণতান্ত্রিক ও পেশাদার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় খুব একটা আন্তরিক নয়। জনপ্রশাসন বা বেসরকারি আমলাতন্ত্রেও একই ধরনের দলীয়করণের ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এগুলো গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য সুখবর না।
গণতন্ত্রের ভিত্তি যে তৃণমূলে, সেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হলে উন্নয়ন ও সেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করলে স্থানীয় সমস্যার সমাধান স্থানীয় পর্যায়েই হয়, যা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ কমায়। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকার কিছুটা তোড়জোড় শুরু করার চিহ্ন স্পষ্ট হচ্ছে বটে কিন্তু একটি নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার জন্য যেমন সংগঠিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তা এখনও দৃশ্যমান না। স্থানীয় সরকারের প্রাণ হলো নির্বাচন, আর তাকে এড়িয়ে চললে গণতন্ত্র কখনোই তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে শুরুতে স্বস্তি থাকলেও এখন নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থার ভয়ের জায়গাটা কমলেও, এখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর চাপ বেড়েছে। নারী, ভিন্ন জীবন-যাত্রা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে অনলাইনে এবং শারীরিকভাবে ‘লিঞ্চিং’ বা মব ভায়োলেন্স বা সংগঠিত সহিংসতার মতো ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে অশালীন আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। অসহিষ্ণু এই সংস্কৃতি একটি গণতান্ত্রিক ও সহনশীল সমাজ গড়ার পথে বড় বাধা।
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কাজের মূল্যায়ন করতে গেলে একটি ব্যর্থতা বেশ স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল যে, নতুন রাজনৈতিক সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং জীবনযাত্রার মান স্থিতিশীল হবে। অথচ বাজার সিন্ডিকেট এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগগুলো কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। এটি এমন একটি ইস্যু ছিল, যা খুব সহজেই জনবান্ধব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল। এই ব্যর্থতা মানুষের মনে প্রথম ধাক্কাটা দিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সরকার সাফল্য দেখাতে পারেনি। হামের মতো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় যে দ্রুত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা চোখে পড়েনি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতা এবং সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট।
একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসা মানেই মানুষের হারানো আস্থা ফিরে পাওয়া নয়। আস্থা অর্জিত হয় কাজের মাধ্যমে, প্রতিশ্রুতি পূরণের স্বচ্ছতায়। যদি সরকার কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে টিকে থাকাকেই বড় সাফল্য মনে করে, তবে সেই আস্থা স্থায়ী হবে না। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী ত্যাগের মূল উদ্দেশ্য ছিল— ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্র গড়তে হলে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, স্থানীয় সরকারের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। ভোটের দিন পেরিয়েছে, এখন আসল পরীক্ষা শুরু হয়েছে— সেবা ও সুশাসন দিয়ে গণতন্ত্রকে প্রতিদিনের নিয়মে পরিণত করার।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক