বাংলাদেশ বিষয়ক বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সোশাল মিডিয়া এক্টিভিটিকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তসলিমা নাসরিনের বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টের বরাতে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে আসছে কলকাতা এবং দিল্লী ভিত্তিক বহু সংবাদমাধ্যম। এক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, তসলিমার পোস্ট করা ভুয়া খবর কোন ধরনের যাচাই বাছাই ছাড়াই প্রকাশ করা হয়।
দ্য ডিসেন্ট তসলিমা নাসরিনের বরাতে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচারিত বেশ কয়েকটি ভুয়া খবরের সংকলন করেছে এই প্রতিবেদনে।
ড. ইউনূসের সাথে যৌথভাবে তসলিমার নোবেল পাওয়ার অসত্য দাবি
গত ২৪ নভেম্বর তসলিমা নাসরিন তার ফেসবুক এবং এক্স অ্যাাকাউন্ট আলাদা পোস্টে দাবি করেন, ২০০৬ সালে শান্তিতে ঘোষিত নোবেল পুরষ্কারটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে যৌথভাবে পান তসলিমা বেগম নামে গ্রামীণ ব্যাংকের এক কর্মী।
তসলিমা তা পোস্টে লিখেছেন, “মোঃ ইউনুস এবং তসলিমা বেগম যৌথভাবে পেয়েছিলেন শান্তির নোবেল পুরস্কার। অর্থাৎ নোবেলের এক হাফ পেয়েছিলেন ইউনুস, আরেক হাফ পেয়েছিলেন তসলিমা। আধা নোবেলের মালিক হয়েও পুরো নোবেলের সম্মান বছরের পর বছর ধরে একাই ভোগ করেছেন ইউনুস। নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে আরও নানা রকম পুরস্কারে তাঁকে ভূষিত করা হয়। কাউকে তিনি মনে করিয়ে দেননি যে তিনি একা নন, তাঁর সঙ্গে একজন নারীও পেয়েছিলেন নোবেল। তিনি হাপিস করে দিয়েছেন তাঁর নোবেলের সঙ্গিনীকে। মানুষ ভুলেই গিয়েছে তসলিমা বেগমের কথা। শুনেছি তসলিমা বেগমকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছেন ইউনুস।“
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চরম পুরুষতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে তসলিমা নাসরিন লিখেন, “পুরুষ যখন নারীবিদ্বেষী এবং চরম পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী, তখন নারীর প্রতিভাকে তারা যে করেই হোক আড়াল করতে চায়, আর নিজের যৎসামান্য প্রতিভাকেও ঢোল বাজিয়ে জানিয়ে দেয়। এই ষড়যন্ত্রে ইউনুস খুবই পারদর্শী।“
ফেসবুকে তসলিমা নাসরিনের পোস্ট দেখুন এখানে এবং এক্স এ পোস্ট দেখুন এখানে।
এরপরই একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম তসলিমা নাসরিনের পোস্টের বরাত দিয়ে ড. ইউনুস নোবেল পুরস্কার পেয়ে ‘প্রতারণা’ করেছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
কলকাতা২৪, এইদিন, এবং দৈনিক আনন্দবার্তা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এই বক্তব্যটি এরপর ভারতের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকেও প্রচার করতে থাকেন। এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
দাবিটি কতটুকু সত্য?
নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল রেকর্ড নিশ্চিত করে যে, ২০০৬ সালের শান্তি পুরস্কার যৌথভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে দেওয়া হয়েছিল। তসলিমা বেগমকে এই পুরষ্কার দেয়া হয়নি। তবে গ্রামীণ ব্যাংকের একন প্রতিনিধি হিসাবে পদক গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন।
The Nobel Prize Organization এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ২০০৬ সালে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “The Norwegian Nobel Committee has decided to award the Nobel Peace Prize for 2006, divided into two equal parts, to Muhammad Yunus and Grameen Bank for their efforts to create economic and social development from below……….And congratulations to you, Mosammat Taslima Begum, who will receive the prize on behalf of Grameen Bank.”
অর্থাৎ, ড ইউনূস এবং তসলিমা বেগম কে নয় বরং ড ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। এবং তসলিমা বেগম গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন।
নোবেল প্রাইজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে একই বছর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে উল্লেখ করা হয়, “Mosammat Taslima Begum, representing Grameen Bank, receiving the Nobel Prize medal and diploma during the Nobel Peace Prize Award Ceremony at the Oslo City Hall in Norway, 10 December 2006.”
দেখুন এখানে।
অর্থাৎ, তসলিমা বেগমকে নয় বরং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এর ফ্যাক্ট চেক বিষয়ক পেজ CA Press Wing Fact এ দাবি কে খণ্ডন করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেখুনঃ
দেখুন এখানে।
তসলিমা নাসরিনের একই পোস্টে আরেকটি অসত্য তথ্য রয়েছে। সেটি হল, তিনি দাবি করেছেন তসলিমা বেগমকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপসারিত করা হয়েছিল।
কিন্তু কর্পোরেট নথি এবং সমসাময়িক প্রতিবেদনগুলি ঘেঁটে দেখা যায়, তসলিমা বেগম ২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত একজন নির্বাচিত বোর্ড সদস্য হিসাবে তার পুরো চার বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেছিলেন।
তসলিমা বেগমকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ডেইলি স্টার। সেখানে বলা হয়েছে,”After that she was selected as a representative at a regional level and area level over time and was eventually nominated as a Member of the Grameen Bank's Board of Directors. She served as a Board Member for four years (2005 to 2009).”
দেখুন এখানে।
কিন্তু এসব অসত্য দাবি তসলিমা নাসরিনের বরাতে কোন ধরনের যাচাই বাছাই ছাড়াই ভারতীয় মিডিয়া প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে জিহাদের ডাক সংক্রান্ত ভুয়া ভিডিও
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তসলিমা নাসরিন তার ফেসবুকে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করেন, “বাংলাদেশের যশোরে জিহাদের ডাক। দলে দলে জিহাদে যোগ দিন। জিহাদিস্তান থেকেই শুরু হবে খেলাফতের আন্দোলন।”
দেখুন এখানে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মুখ ঢাকা পোশাক পরে মঞ্চের উপর থেকে ভাষণ দিচ্ছে এক ব্যক্তি এবং তার পাশে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরও দুজন।
তসলিমা নাসরিনের পোস্টের পর ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস, রিপাবলিক বাংলা এবং টিভি৯ বাংলা একই দাবিতে সংবাদ প্রকাশ করে।

কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়, আলোচিত দাবিটি সত্য নয়। ভিডিওটি যশোরের জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার এবং সেটি কোনও জঙ্গি সংগঠনের ভিডিও নয়। বরং সেটি একটি ‘যেমন খুশি সাজো প্রতিযোগিতা’র ভিডিও।
যমুনা টিভির প্রতিবেদনে পুলিশের বরাতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বন্দুক দুটি ককশিট ও কাঠ দিয়ে বানানো। হামাস বা আইসিস বা কোন জঙ্গি তৎপরতা নয়, এটা মাদ্রাসা ছাত্রদের অভিনয়ের মাধ্যমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ দেখানো হয়েছে।
প্রতিযোগিতার ভিডিওটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ালে, ফেসবুকে এসে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যশোর জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রধান মুফতি লুৎফুর রহমান ফারুকি। তিনি জানিয়েছেন যে, ভিডিওটি ‘যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতা’র একটি অংশ। মঞ্চের উপর থেকে আরবি ভাষায় যা বলা হয়েছে, সেখানে জঙ্গিবাদের কোনও কথা হয়নি। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। ভিডিওটির সঙ্গে জঙ্গিবাদের কোনও যোগ নেই। ছাত্রদের হাতে যে অস্ত্র দেখতে পাওয়া গিয়েছে, সেটা সত্যি নয়। বরং শোলার তৈরি।
এ সংক্রান্ত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে জড়িয়ে ভুয়া দাবি
এর আগে ২০২৪ এর ৫ অক্টোবর এক ফেসবুক পোস্টে বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি সংবাদের স্ক্রিনশট সংযুক্ত করে তসলিমা নাসরিন দাবি করেন, উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সাথে যুক্ত এবং তিনি ২০১৯ সালে জঙ্গীবাদের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
দেখুন এখানে।
একই দাবি প্রচার করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম গুলোও। দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৯ সালে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের নেতা অভিযোগে আটক হওয়া মাহফুজ নামের ব্যক্তি এবং উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ভিন্ন দুইজন ব্যক্তি।
২০১৯ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে “Hizb ut-Tahrir leader Mahfuz placed on fresh remand” শিরোনামে প্রকাশিত হওয়া উক্ত প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের নেতা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজকে ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের একটি আদালত সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে ৮ দিনের রিমান্ড দেয়। এর আগে মাহফুজসহ আরো ১৪ জনকে ৩ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, উক্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ আল মাহফুজের কোনো ছবি বা বিশদ পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।
পরবর্তী অনুসন্ধানে মূলধারার সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টার ও বিডিনিউজ২৪ এর ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে সংবাদ পাওয়া যায়। জানা যায়, চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের মহানগর প্রধানসহ ১৫ জনকে সে সময় গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। গ্রেফতারকৃত আবদুল্লাহ আল মাহফুজের বয়স ৩০ বছর এবং তিনি নোভারটিস ফার্মাসিউটিক্যালসের চট্টগ্রামের টেরিটরি ম্যানেজার। তিনি হিযবুতের চট্টগ্রাম শাখার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা বলেও জানায় পুলিশ। গ্রেফতারকৃত সদস্যদের ছবিও উক্ত সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রচার করা হয়েছে। তবে, ছবিতে প্রদর্শিত আটককৃত সদস্যদের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলমকে দেখা যায়নি।
এ সংক্রান্ত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
’জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধের ভুয়া খবর
অন্য আরেকটি পোস্টে তসলিমা নাসরিন একটি ফেসবুক পোস্ট (আর্কাইভ) দিয়ে দাবি করেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য কে সূত্র ধরে ভারতীয় গণমাধ্যমে উক্ত দাবিতে প্রচারিত প্রতিবেদন দেখুন আজতক বাংলা (ইউটিউব), হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধ করা হয়নি বরং ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে দেওয়া রায়কে স্থগিত করার বিষয়কে উক্ত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
বিডিনিউজ২৪ এর ওয়েবসাইটে গত ১০ ডিসেম্বর “জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগানের রায় স্থগিত” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২ ডিসেম্বর জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণা করে হাই কোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন করলে গত ১০ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে শুনানি শেষে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণা করে হাই কোর্টের দেওয়া রায় স্থগিত করে আপিল বিভাগ।
সুতরাং, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান জাতীয় স্লোগান হিসেবে দেওয়া রায় স্থগিত করার বিষয়টিকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধ করার দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা অসত্য।
এ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
বাংলাদেশে মেয়েদের বাজারে যাওয়া নিষিদ্ধের ভুয়া দাবি
২০২৪ এর ৩ ডিসেম্বর এক ফেসবুক পোস্টে তসলিমা নাসরিন দাবি করেন, বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গায় মেয়েদের বাজারে যাওয়া নিষেধ জানিয়ে ফতোয়া জারি হয়েছে।
দেখুন এখানে।
এরপর একই দাবি করেন বিজেপির বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। দেখুন এখানে এবং এখানে।
এ সংক্রান্ত ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখুন আজতক বাংলা (ইউটিউব), রিপাবলিক বাংলা (ইউটিউব), টিভি৯ বাংলা (ইউটিউব), জি২৪ ঘন্টা (ইউটিউব), ক্যালকাটা নিউজ (ইউটিউব), আর প্লাস (ইউটিউব), নিউজ এক্স।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গায় মেয়েদের বাজারে যাওয়ায় নিষেধ জানিয়ে ফতোয়া জারির দাবিটি সঠিক নয় বরং, গওহরডাঙ্গা মাদরাসার ৮৯তম মাহফিলে অস্থায়ী দোকানপাটে মহিলা প্রবেশ প্রসঙ্গে মাইকিংয়ের একটি ভিডিওর খন্ডিত অংশ দিয়ে আলোচিত দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।
দেখুন এখানে।
এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
জঙ্গি সংগঠনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ভুয়া খবর
‘সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯’ অনুযায়ী গণঅভ্যুত্থানের পর ২৩ অক্টোবর ২০২৪ এ আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর তসলিমা নাসরিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স এ দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস হিযবুত তাহ্রীর এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নিষিদ্ধের আদেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিযবুত তাহ্রীর এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নিষিদ্ধের আদেশ প্রত্যাহার করেনি বরং কোনো প্রকার তথ্যসূত্র ছাড়াই আলোচিত দাবিটি ইন্টারনেটে প্রচার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে ৯ সেপ্টেম্বর তারিখে “হিজবুত তাহরীরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হিযবুত তাহরিরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানায় সংগঠনটির নেতারা।
তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস হিযবুত তাহ্রীর এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন এমন দাবির সপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য তথ্যপ্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
ভিন্ন ব্যক্তিকে চিন্ময়ের আইনজীবী দাবিতে ভুয়া খবর
২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরদিন ২৬ নভেম্বর পুলিশ তাকে চট্টগ্রাম ষষ্ঠ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শরীফুল ইসলামের আদালতে হাজির করলে তিনি আদালতে জামিন আবেদন করেন। তবে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এরপর ০৩ ডিসেম্বর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের শুনানি থাকলেও তার পক্ষে আইনজীবী উপস্থিত না থাকায় তা পিছিয়ে ০২ জানুয়ারি ধার্য করে আদালত।
এরই প্রেক্ষিতে, তসলিমা নাসরিন তার এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, “চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবীকে মেরে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর কেউ যেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ডিফেন্ড না করে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।“
দেখুন এখানে
ইসকনের কলকাতা শাখার সহ-সভাপতি রাধারমণ দাস তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে একই দাবিতে ভিন্ন ব্যক্তির ছবি যুক্ত করে একটি পোস্ট করেন।
পোস্টে হাসপাতালে চিকিৎসারত এক আহত ব্যক্তির একটি ছবি যুক্ত করে তিনি দাবি করেন, ছবির আহত ব্যক্তির নাম রমেন রায়। তিনি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী। মুসলিমরা রমেন রায়ের বাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং তার ওপর হামলা করেছে। সে এখন আইসিইউতে আছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ছবির আহত ব্যক্তি তথা রমেন রায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী নন বরং, আহত রমেন রায় আইনজীবী হলেও তিনি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মামলার সাথে সম্পৃক্ত নন৷ প্রকৃতপক্ষে, গত ২৫ নভেম্বর শাহবাগে চিন্ময়কে গ্রেফতারের প্রতিবাদে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কর্মসূচিতে দুর্বৃত্তদের হামলায় রমেন রায় আহত হন। তবে তার বাড়ি ভাঙচুরের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেখুন এখানে।
এ সংক্রান্ত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
লুট হওয়া অস্ত্র এক বছর পর মসজিদ থেকে উদ্ধারের ভুয়া দাবি
মসজিদে সারি করে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র। সেগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। কয়েকজন গাড়িতে তুলতে ব্যস্ত। এমন একাধিক ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে আলোচিত লেখক তসলিমা নাসরিন দাবি করেছেন, সেগুলো জঙ্গিরা লুট করে মসজিদে রেখেছেন।
তিনি দাবি করেন, “গত বছরের জুলাই আগস্ট মাসে থানার পুলিশদের জবাই করে জঙ্গিরা থানা লুট করে অস্ত্র এনে মসজিদে রেখেছে। এসব উদ্ধার হলো এক বছর পর। এক বছরে বাড়ি বাড়ি এত যে চুরি ডাকাতি ছিনতাই হলো, ওসবে তো এসব অস্ত্রই সম্ভবত ব্যবহার হয়েছে।“
দেখুন এখানে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অস্ত্রগুলো সাম্প্রতিক সময়ে নয়, গণ অভ্যুত্থানের পরপরই ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট খিলগাঁওয়ের স্থানীয় এলাকাবাসীর সহায়তায় উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ কাজে সহযোগিতা করে খিলগাঁও ঈমানবাগ জামে মসজিদের ইমাম ও মুসল্লিরা।
এ সংক্রান্ত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
পুরোনো অপ্রাসঙ্গিক ভিডিওকে গোপালগঞ্জে হত্যা বলে প্রচার
১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত ৪ জন নিহত হন।
তসলিমা নাসরিন তাঁর প্রোফাইল থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কালো গেঞ্জি ও প্যান্ট পরিহিত এক তরুণকে পুলিশ ও এপিবিএন এর সদস্য আটক করে মারধর করছেন। ভিডিও আরেক অংশ দেখা যায়, একই রকম কালো গেঞ্জি ও প্যান্ট পরিহিত এক ব্যক্তির লাশ একটি ভ্যান গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছেন তার স্বজনরা।

এই ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, পুলিশের হাতে আটক এবং ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া লাশটি একই ব্যক্তির যার নাম রমজান কাজী (১৮)। এবং আরও দাবি করা হচ্ছে যে, পুলিশ তাকে আটক অবস্থায় গুলি করে হত্যা করেছে।
দেখুন এখানে।
কিন্তু একাধিক সংবাদমাধ্যমে খবর ও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, পুলিশের আটক করা ব্যক্তি এবং ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া লাশ এক ব্যক্তি নন।
এ সংক্রান্ত ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন দেখুন এখানে।