Image description

জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশে লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্টে বিপুল পরিমাণ লুট হওয়া অস্ত্র ও সীমান্তপথে অস্ত্র ঢোকা অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে, যা নির্বাচনী সহিংসতা ও ভোটের পরিবেশকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা। এখন এসব অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দুই দফায় উপহার ঘোষণা করেও খোয়া যাওয়া অস্ত্রের ফেরত পাওয়ার পরিমাণ খুবই কম। চলতি মাসসহ গত জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে আবারও পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।

গত ৫ নভেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের পাঠানো ওই বার্তায় বলা হয়েছে, এলএমজি উদ্ধারে পাঁচ লাখ টাকা, এসএমজি উদ্ধারে দেড় লাখ টাকা, চায়না রাইফেল এক লাখ টাকা এবং পিস্তল ও শটগান উদ্ধারে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। প্রতিটি গুলির জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে ৫০০ টাকা।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় গত বছরের ৫ আগস্টের আগে-পরে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে, নির্বাচনের আগেই লুট হওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার করা হবে। এ সময় অস্ত্র উদ্ধারে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে সরকারিভাবে পুরস্কারের ঘোষণা করেন তিনি।

‘গত বছর ৫ আগস্টের পর দেশের ৬৬৪টি থানার মধ্যে ৪৬০ থানা ও ১১৪টি ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র লুট হয়। এ ছাড়া ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৯০টি। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৬৩টি। এ ছাড়া গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ১১২টি। এখনো উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭২০টি।’

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সময় সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ করা, অতীতে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা এবং অপরাধী চক্রকে দমন করার ওপর জোর দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

এদিকে নির্বাচনি প্রচারে চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহসহ গুলিবিদ্ধ হন বেশ কয়েকজন। এ সময় গুলিতে একজন মারা গেছেন।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় দিনের বেলায় গুলি করে হত্যা করা হয় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাইফ মামুনকে। এর আগে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলে বিএনপির দুই পক্ষের বিরোধের জেরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘটছে অস্ত্রবাজি ও গুলির ঘটনা।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘দেশব্যাপী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে লুট হওয়া অনেক অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান। বাকি অস্ত্রগুলো উদ্ধারেও কাজ করছে পুলিশসহ যৌথ বাহিনী।’

অপরাধ-বিশ্লেষক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থতা নির্বাচনে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। প্রভাবশালীরা অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাদের হয়ে সন্ত্রাসীরা নাশকতা চালাতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে সংঘাত ও সহিংসতা। এতে ভোটের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সরকারের চেষ্টার পরও সব গুলি-অস্ত্র উদ্ধার যথাযথ হয়নি। লুট হওয়া অস্ত্রগুলো সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এ অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহার হওয়ার অনেক আশঙ্কা রয়েছে।

অবৈধ অস্ত্রের একটি বড় অংশ সীমান্তপথ দিয়ে দেশে প্রবেশ করে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। পাশাপাশি পুলিশ ও থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো অপরাধীদের হাতে রয়েছে, যা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাস সামনে রেখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র ব্যবহার করে দুর্বৃত্তরা নির্বাচনে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চাপের মধ্যে রাখতে পারে। এসব অস্ত্র আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং পৃথকভাবে যৌথ বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। কিছু উদ্ধারও হচ্ছে। সীমান্তপথে অস্ত্রের অনুপ্রবেশ বন্ধেও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, গত বছর ৫ আগস্টের পর দেশের ৬৬৪টি থানার মধ্যে ৪৬০ থানা ও ১১৪টি ফাঁড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র লুট হয়। এ ছাড়া ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৯০টি। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৬৩টি। এ ছাড়া গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ১১২টি। এখনো উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭২০টি।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ‘লুট হওয়া অস্ত্র আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। এসব অস্ত্র পড়ে থাকে না, একাধিক হাত ইতোমধ্যে বদল হয়েছে। সন্ত্রাসীদের কাছে এত দিন পৌঁছে গেছে। এখনো সময় আছে, এসব অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরি।’

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এসব অস্ত্র কয়েকবার হাত বদল হয়েছে। ফলে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারে। চলে গেছে অপরাধীদের হাতে। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে। যদিও উদ্ধার করা কঠিন।