Image description

“আমাগো এইহানে আগুন দিছে, আপনারা এইসব লেখেন না কেন। ফেইসবুকে দেহেন।”

আগুনে পোড়া কড়াইল বস্তিতে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন আশরাফ নামের এক তরুণ। তার কণ্ঠে ক্ষোভ, চোখে সন্দেহ।

ঢাকার কোথাও কোনো বস্তিতে আগুন লাগলে প্রতিবারই ক্ষোভের কণ্ঠে এমন প্রশ্ন উচ্চারিত হয়। সেই উদ্ধৃতি জুড়ে দিয়ে পত্রিকায় লেখা হয়– ‘দুর্ঘটনা না নাশকতা?’

বস্তিতে আগুন লাগিয়ে মাস্তানেরা হা হা করে হাসছে; আর নায়ক ছুটে এসে লোকজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন–এমন দৃশ্য একসময় ঢাকাই সিনেমায় অহরহ দেখা যেত।

তফাৎটা হল, সিনেমায় যেরকম ভিলেনদের আগুন দিতে দেখা যায়, আগুনের বাস্তব ঘটনাগুলোর পর নানা তদন্তেও তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

বাস্তব ঢাকায় বস্তিবাসী সব হারানোর ধাক্কা সামলে সন্দেহ আর অবিশ্বাস সঙ্গী করেই আবার ঘর তোলে পরের আগুন পর্যন্ত টিকে থাকার আশায়।

বছরের পর বছর ধরে বস্তি পোড়ার ঘটনা খবরের শিরোনাম হয়। মানুষের দুর্ভোগের চিত্র থাকে একইরকম।

আগুনের কারণ হিসেবে কখনো শর্ট সার্কিট, কখনো গ্যাস লিকের কথা সরকারিভাবে বলা হলেও বস্তিগুলোতে পানি, বিদ্যুৎ আর গ্যাসের চোরাই লাইন বন্ধ হয় না।

দখল করা ঘরের ভাড়া আর এসব চোরাই লাইনের বন্দোবস্তে কোটি টাকার চাঁদাবাজি চলে। সেই টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে স্থানীয় অপরাধী আর রাজনৈতিক নেতাদের দ্বন্দ্বে বস্তিতে আগুন দেওয়ার অভিযোগও শোনা যায়।

১৮ বছর আগে বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বস্তিতে আগুন (আরসন) দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। আবার প্রতিটি ঘটনার পর ‘উচ্ছেদের জন্য বস্তিতে আগুন দেওয়ার’ সন্দেহের কথা বলাবলি হয়।

সবশেষ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানী লাগোয়া কড়াইল বস্তির আগুনে দেড় হাজারের মতো ঘর পুড়ে যাওয়ার তথ্য দিয়েছে ফায়ার সর্ভিস। সেখানে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও সর্বস্ব হারানো মানুষের ক্ষোভ আর বেদনার গল্পগুলো যেন আগের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি।

নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগুন?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে থেকেই ঢাকায় বস্তি গড়ে ওঠে মূলত কাজের খোঁজে আসা ভাগ্যান্বেষী মানুষকে জায়গা করে দিতে। এছাড়া নদী ভাঙন, ঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সব হারানো মানুষ এ শহরে এসে কম টাকার বস্তিতে ঠাঁই নেয়। ঢাকার বস্তিতে আগুন লাগার ইতিহাস বস্তির ইতিহাসের মতই পুরনো।

বিশ্ব ব্যাংকের ২০০৭ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটি, যেখানে প্রতি বছর (এস্টিমেটেড) তিন থেকে চার লাখ নতুন অভিবাসী যুক্ত হয় যারা মূলত গবিব।

‘ঢাকা: ইমপ্রুভিং লিভিং কন্ডিশন ফর দ্যা আরবান পুওর’ নামের ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বস্তিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সেই গবেষণার অংশ হিসেবে চারটি বস্তিতে অপরাধ ও সহিংসতা নিয়ে সমীক্ষা চালানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে ৯৩ শতাংশ বলেছেন, তারা সারা বছরই অপরাধ ও সহিংসতার কারণে ক্ষতির শিকার হয়েছেন। উত্তরদাতারা ৩৩টি ভিন্ন ধরনের অপরাধেরও কথাও বলেছেন, যেগুলো বস্তিতে ঘটে।

চাঁদা আদায়, মাস্তান-প্ররোচিত সহিংসতা, মাদক ও মদের ব্যবসা, জমি দখল, জুয়া, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা, বস্তিতে অগ্নিসংযোগ, খুন ও অপহরণ এবং পারিবারিক সহিংসতার মত অপরাধ সেখানে সাধারণ ঘটনা।

ওই জরিপে অংশ নেওয়া ঢাকার শহীদনগর, রায়েরবাজার, পল্লবী ও মোহাম্মদপুর বস্তির ৪৪ শতাংশ বাসিন্দা বলেছেন, বস্তিতে আগুন লাগানো হয় ‘নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য’।

প্রায় চার দশক ধরে ঢাকায় অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন পারভেজ খান। বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক এই সভাপতি বলেন, “বস্তির আগুনের একটা বড় কারণ হচ্ছে দখল বা পাল্টা দখল। বিশেষ করে দেখা গেছে সরকার বদলের সময় এই ধরনের ঘটনাগুলো বেশি ঘটে।

“বস্তির আগুনের ক্ষেত্রে এটাই কমন ট্রেন্ড। দেখবেন যে, এখন যে ঘরগুলো পুড়েছে সেগুলো একজন বা একটি পক্ষের দখলে ছিল, পোড়া জায়গায় আর তারা ঘর তুলতে পারবে না। সেখানে ঘর তুলবে নতুন কোনো পক্ষ।”

নিজের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, “মনে করেন একজনের দখলে ২০০ ঘর আছে। সেই ঘরের ভাড়ার নাম করে এই বাজারে তিন থেকে চার হাজার টাকা তোলা হয় প্রতি মাসে। পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ব্যবহারের নাম করে আলাদা টাকা নেওয়া হয়।

“এখন হিসাব করেন কত টাকা ওঠে। তার ওপর বস্তিতে মাদক ব্যবসাসহ যে কোনো অপরাধ করা অনেক সহজ, অপরাধীদের জন্য গা ঢাকা দেওয়া সহজ। এজন্যে বহু বছর ধরেই ঢাকার বস্তিগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা অপরাধী চক্র।”

আগুনের বাস্তবতা যেভাবে সিনেমায়

আশি কিংবা নব্বই দশকে ঢাকার এফডিসিকেন্দ্রিক সিনেমায় বস্তির আগুন ছিল একটি স্বাভাবিক চিত্রায়ন। আগুন না থাকলেও ঘর ভেঙে দেওয়া, বস্তির জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের জন্য জবরদস্তি তখনকার সিনেমার নিয়মিত উপজীব্য ছিল।

বাংলা সিনেমায় কী করে বস্তির আগুনের ঘটনাগুলো ঠাঁই পেত জানতে চাইলে চলচ্চিত্র পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টু বলেন, “বাস্তবতা থেকে নিয়ে আর কিছুটা কল্পনার মিশেলেই তো সিনেমার কাহিনী দাঁড়ায়। আমাদের সিনেমায় যাদু-মন্ত্রের ঘটনাগুলো ছাড়া বেশিরভাগ উপকরণই বাস্তবতা থেকে নেওয়ার চেষ্টা ছিল।”

আগুনের ঘটানগুলো কল্পনা না বাস্তবতা থেকে গল্পে ঢোকানো হয়েছে জানতে চাইলে এই প্রবীণ পরিচালক বলেন, “বস্তিতে আগুন লাগে। কখনো সেখানে বড়লোকেরা আগুন লাগিয়ে দেয়, জায়গা খালি করার জন্য। গরিবেরা আরও গরিব হয়–হ্যান্ড টু মাউথ যাকে বলে।

“আবার কখনো চুলার আগুন বা অন্য কোনভাবে আগুন লাগে। এইসব দৃশ্যই দেখানো হয়েছে আমাদের সিনেমায়। গল্পকারেরা এগুলো ঢোকাতেন, আমরাও সেভাবেই বানাতাম। কিছু হয়তো বাস্তবতা থেকে নিয়েই গল্পে ঢোকানো হত, আবার গল্পের প্রয়োজনেও অনেক ঘটনা বানানো হত।”

কড়াইল থেকে ধারাবি

শুধু কী দেশের বস্তিতেই আগুন লাগে? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে দেখতে হল মুম্বাইয়ের ধারাবি বস্তির আগুন লাগার ইতিহাস।

অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলো ঘেঁটে দেখা গেল ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের মধ্যেই চারবার আগুন লেগেছে এই বস্তির বিভিন্ন অংশে। ৫৯০ একর জায়গা জুড়ে থাকা ধারাবিতে এখন ১০ লাখের মত মানুষের বসবাস, সেটি পেয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বড় বস্তির তকমা।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ২০১৬ সালের একটি প্রতিবেদনে পাকিস্তানের করাচি শহরের ‘ওরাঙ্গি টাউন’কেও অন্যতম বৃহৎ বস্তির আখ্যা দিয়েছে। ওরাঙ্গি টাউনে বসবাস করছে ২৪ লাখ মানুষ।

পাকিস্তানের অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলো ঘেঁটে ওরাঙ্গি টাউনে আগুনের প্রচুর খবর মিলল।২০২৩ সাল থেকে অন্তত তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সেখানে খবর হয়েছে, সেসব ঘটনায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

সবশেষ ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ২ নভেম্বর। ডেইলি টাইমসের রিপোর্ট বলছে, ওই আগুনে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। দুই বছর আগে ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি ওরাঙ্গি টাউনে আগুনে পুড়ে তিনটি শিশুর মৃত্যুর খবর দেয় আরেক পত্রিকা ডন।

কড়াইল দখলের ইতিহাস

বেসরকারি সংস্থা ব্রাকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় একশ একর জায়গা জুড়ে থাকা কড়াইলের জনসংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি।

২০২০ সালের নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব আরবান অ্যান্ড সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ (ভলিউম ১৪, নং ১১) কড়াইল বস্তির উপর ‘সানজিদা আহমেদ সিনথিয়া’র একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।

‘অ্যানালাইসিস অব আরবান স্লাম: কেস স্টাডি অন কড়াইল স্লাম, ঢাকা' শীর্ষক ওই গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের শাসনামলে তৎকালীন ‘টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ড (টিএন্ডটি)’ এর জন্য বিরাট একটি জায়গা বরাদ্দ করা হয়। শর্ত ছিল জমিটি শুধু টিএন্ডটি ব্যবহার করবে।

১৯৯০ সালে ওই শর্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ৯০ একর জায়গা গণপূর্ত বিভাগকে (পিডব্লিউডি) বরাদ্দ দেওয়া হলে জমির মূল মালিকরা (যাদের কাছ থেকে অধিগ্রহণ হয়েছিল) চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করে দেন। তারা জমিটি ফেরৎ চান।

এরপর আইনি জটিলতায় সেখানে আর কিছু করা হয়নি। মূলত তখন থেকেই টিএন্ডটির কর্মী, অপরাধ চক্রের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ (ওয়ার্ড কাউন্সিলর) প্রভাবশালীরা জমির নানা অংশ দখল করে ঘর তুলে ভাড়া দিতে শুরু করে।

আশপাশে কাজের অনেক সুযোগ থাকায় ভিড় বাড়তে থাকে নিম্ন আয়ের মানুষের, বস্তির কলেবরও বাড়তে থাকে।

ঢাকার কড়াইল বস্তির মূলত দুটি অংশ–বউ বাজার আর জামাই বাজার। মঙ্গলবার যে অংশটি পুড়েছে, সেটি বউ বাজার। ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডে এই বস্তির অবস্থান।

বিগত আওয়ামী লীগের সময় জুড়ে ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর থাকা মফিজউদ্দিন ও মো. নাসিরের লোকেরা এই বস্তির চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির চোরাই লাইন নিয়ে দেওয়ার নামে চাঁদাবাজি হয়েছে। ময়লা পরিষ্কারের নামেও সেখানে চাঁদাবাজি হয়েছে।

বউবাজার উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ছিল মাওলানা আব্দুস সোবহান। তার নামেও চাঁদাবাজী হত বলে জানাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা।

আগের দখলদাররা এখন সব পলাতক, তাদের ফোনও বন্ধ। এখন কারা বস্তির দখল নিতে চায়–সে বিষয়ে কিছু বলছেন না স্থানীয়রা।

 

 

নানা সন্দেহ

বুধবার পুড়ে যাওয়া ঘরের সামনে কথা হয় বনানী ক্লাবের নিরাপত্তা কর্মী আব্দুল মালেকের সঙ্গে। মালেক বলছিলেন, তিনি যে ছোট ঘরটিতে থাকতেন তার ভাড়া দিতে হত চার হাজার টাকা। ফ্রিজ ব্যবহার করলে দিতে হয় অতিরিক্ত পাঁচশ টাকা।

কাকে এই টাকা দিতে হয়? মালেক বলেন, “বাড়িওয়ালা আছে। তারাই সব দেখে।”

আসমা বেগম নামের এক নারী কাঁদছিলেন ঘর হারিয়ে। গত বছর এনজিও থেকে ঋণ তুলে আড়াই লাখ টাকায় তিনি একটি ঘর কিনেছিলেন। এখন আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর সেই ঘরের মালিকানা তিনি পাবেন না বলে অনেকে তাকে বলেছেন। সেই শোক আর কিস্তির টাকা পরিশোধের চাপের কথা বললেন আসমা।

এক বড়িওয়ালা বলেন, বস্তিটি সরকারি জমির ওপর গড়ে উঠলেও সেখানকার ঘরগুলোর মালিকানা রয়েছে। বর্তমানে এককেটি ঘরের হাতবদলের দর দুই থেকে আড়াই লাখ।

এই টাকার উল্লেখযোগ্য অংশ পান তারা, যাদের ‘দখলে’ থাকে বস্তি। আবার ঘর ভাড়া, পানির বিল, বিদ্যুতের বিল, ময়লার বিলের নামে পৃথক টাকা নেয় চক্রটি।

বস্তির দখলের পাশাপাশি উচ্ছেদ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নানা প্রচার প্রভাবিত করেছে বস্তিবাসীকে। নানা সন্দেহ আর প্রশ্ন দানা বেঁধেছে তাদের মনে।

আগুন ‘লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে’—এমন সন্দেহের কথা বলেছেন অনেক বস্তিবাসী। আর সন্দেহের উৎস হিসেবে বলেছন ফেইসবুকে দেখা ‘তথ্যকে’। নিজে চোখে সন্দেহজনক কিছু দেখেছেন—এমন কথা কেউ বলেননি।

আব্দুল মতিন নামে বয়োজ্যেষ্ঠ এক ব্যক্তি বললেন, “এইখানে নাকি মার্কেট করব, হেইজন্যি উচ্ছেদ করতে আগুন লাগাই দিছে। আমাগেরে ভালোভাবে কইলেই তো আমরা চইল্যা যাইতাম।”

 

এবার আগুন লাগার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছিল, সরকার ওখানে ‘হাইটেক পার্ক’ তৈরি করতে চায়।

তবে সরকারের এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেই জানিয়ে দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সরকারী ফাইজ তৈয়্যব আহমেদ এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, এসব ‘গুজব সরকারকে বিব্রত করার অপচেষ্টা’।

তিনি লেখেন, “কড়াইল বস্তিতে হাইটেক পার্ক নির্মাণসংক্রান্ত একটি অনভিপ্রেত প্রস্তাব আমাদের নজরে এসেছে। হাজার হাজার মানুষ যখন অসহায় ও গৃহহীন, তখন এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে সফটওয়্যার খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানাই।

“আগে থেকেই এই ধরনের প্রস্তাবনা মৌখিক ও লিখিতভাবে দিয়ে আসছেন কেউ কেউ। সংগতকারণেই সরকার এসব প্রস্তাবনা আমলে নেয়নি। বর্তমানে কড়াইল বস্তির জায়গায় যে-কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।”

তৈয়্যব লিখেছেন, “সরকারের পরিকল্পনার সাথে আদৌ সংশ্লিষ্ট নয়, এমন বক্তব্য প্রদানে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই। বিশেষভাবে হাজার হাজার মানুষ যখন আগুনে বিপর্যস্ত হয়ে নিরাপত্তাহীন অসহায় পরিস্থিতিতে রয়েছে, তখন হাই-টেক পার্ক স্থাপনের আজগুবি বিষয় সামনে এনে সরকারকে বিব্রতকরার এমন অপচেষ্টার নিন্দা জানাই।”

 

ফিরে দেখা ‘বস্তির আগুন’

গবেষক সানজিদা আহমেদ সিনথিয়া’র ওই প্রবন্ধে ১৯৯৬ সালের এক জরিপকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ওই সময়ে ঢাকা শহরে ৩ হাজার ৭টি বস্তি ও ছোট অনুনোমদিত আবাসন (স্কোয়াটার ক্লাস্টার) পাওয়া গিয়েছিল। তখন ঢাকার ১৬ লাখ মানুষ বস্তিতে থাকত। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বাংলাদেশ সরকার ও সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ যৌথভাবে ওই জরিপ চালিয়েছিল।

ওই জরিপের হিসেবের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে ধারণা পাওয়া যায়, গত ৩০ বছরে ঢাকার বস্তি কমেছে অর্ধেকের বেশি। বিগত একযুগে বিভিন্ন এলাকায় বস্তিতে আগুনের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনেক বস্তিতে আগুনের পর সেখানে আর বস্তি গড়ে ওঠেনি; নতুন কোন স্থাপনা হয়েছে।

২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ‘আগারগাঁও বাজার বস্তি’তে আগুন লেগে পুড়ে যায় কয়েকশ ঘর। গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) দুই একর জায়গার ওপর গড়ে উঠেছিল বস্তিটি।

সেই সময়কার শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নূর হোসেন রাখিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “যেখানে আগুন লেগেছে সেটা পিডব্লিউডির জমি। এখানে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অফিস হবার কথা ছিল।”

বস্তির বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার জন্য কয়েক দফা নোটিস দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

ওই অগ্নিকাণ্ডের পর সেখানে আর বস্তি গড়ে ওঠেনি। সেখানে এখন দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বিটিআরসি) সুরম্য ভবন।

একই রকম ঘটনা ঘটে ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আগারগাঁও ইসলামি ফাউন্ডেশনের পাশের একটি বস্তিতে। ওই আগুনে একটি শিশুর মৃত্যু হয়।

ওই আগুনের পর জায়গাটিতে আর বস্তি হয়নি। সেখানে শুরু হয় স্থাপনা তৈরির কাজ। ওই জায়গায় এখন প্রশস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে পর্যটন ভবনসহ বেশ কয়েকটি সরকারি দপ্তর।